Home / ফিচার / রেমিট্যান্সের নেপথ্যে নারী অভিবাসী শ্রমিকদের বাস্তবতা

রেমিট্যান্সের নেপথ্যে নারী অভিবাসী শ্রমিকদের বাস্তবতা

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেরও অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি হলো রেমিট্যান্স, যা মোট জিডিপির প্রায় ৬-৭%। পুরুষের পাশাপাশি প্রায় ৯ লাখ নারী বিদেশে কর্মরত আছে। বেশির ভাগই কাজ করেন গৃহকর্মী কিংবা গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, জর্ডান ও লেবাননই তাদের প্রধান গন্তব্য। আয়ের অংশের দিক থেকে পুরুষের তুলনায় বেশি রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসী বাংলাদেশী নারী শ্রমিকরা।

‘বাংলাদেশ থেকে শ্রম অভিবাসনের গতি-প্রকৃতি ২০১৫: সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক রামরুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন প্রবাসী পুরুষ তার আয়ের মাত্র ৫০ শতাংশ অর্থ দেশে পরিবারের কাছে পাঠান। পক্ষান্তরে একজন নারী প্রবাসী শ্রমিক পাঠান আয়ের ৯০ শতাংশ।

কিন্তু বর্তমানে এক নতুন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজের জন্য পাড়ি জমানো নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে মোট পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ২১২ জন নারী শ্রমিক বিদেশে গেলেও ২০২০-২০২৪ সাল পর্যন্ত সর্বশেষ পাঁচ বছরে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪৯ হাজার ৮০৯ জনে।

এর পেছনে মূল কারণ কর্মক্ষেত্রে নিপীড়ন, প্রতারণা ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতন; বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এমন পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন তারা। ফলে তারা বাধ্য হয়ে দেশে ফিরছেন দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে। অনেকসময় দেশে ফিরে শুধু নিথরদেহটি।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন দেশে গেছেন ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৪৯৩ নারী কর্মী এবং একই সময়ে দেশে এসেছে ৪১২ নারীর মরদেহ। এর মধ্যে আত্মহত্যার শিকার হয়েছেন ৮৪ অভিবাসী নারী। উদ্বেগজনক বিষয় হলো এসব আত্মহত্যার ৭৬ শতাংশ ঘটেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন সংস্থা-ওকাপ এর গবেষণা বলছে, নারী অভিবাসীদের প্রায় ৯৪ শতাংশই নানাভাবে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। ৭৯ শতাংশ ঠিকমতো বেতন পান না, আর নিয়মিত খাবারের অভাবে ভোগেন ৮০ শতাংশ নারী।

বিশ্লেষকের মতে, পর্যাপ্ত দক্ষ ও প্রশিক্ষিত না হওয়ায় বিদেশে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের নারী কর্মীরা। নারী অভিবাসনের সমস্যা সমাধানে লেবার উইংগুলোর সদিচ্ছার অভাব আছে বলেও জানান তারা। অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় দালালের ফাঁদে পড়ে প্রতারণার শিকার হন, দুর্ভোগ নেমে আসে তাদের জীবনে।

“অভিবাসী শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার সুরক্ষা বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশন (১৯৯০)” অনুযায়ী অভিবাসী নারী শ্রমিকদের বৈষম্যহীনতা, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা এবং আইনি সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কনভেনশনটি জোরপূর্বক শ্রম, মানব পাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুরক্ষারও নিশ্চয়তা দেয়।

কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, বাস্তবে নারী শ্রমিকের নিরাপত্তা আছে কোথায়??

গত কয়েক বছরের ক্রমাগত নারী শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় সরকারও কঠোর হয়েছে। নারী কর্মী পাঠানোর আগেই প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক, প্রশিক্ষণ সনদ ছাড়া না যেতে পারা এরকম অন্তত ১৪টি নিয়ম করেছে সরকার। এছাড়া সারাদেশে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে গৃহকর্ম পেশা ছাড়াও বেশী আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে গার্মেন্টস ট্রেডে ৩৭টি টিটিসিতে ছয় মাস মেয়াদী প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, কর্মীদের সুরক্ষার জন্য রিক্রটিং এজেন্সির কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা জামানত রাখা হয়।

বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) যৌথ উদ্যোগে ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে ডিজিটাল Overseas Employment Platform (OEP) চালু করেছে, যা নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, চাকরি যাচাই এবং অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। সম্প্রতি শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর (১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬) বলেন, বিদেশগামী শ্রমিকদের অতিরিক্ত ব্যয় কমাতে এবং দ্রুত ও মানবিক সেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। সরকার বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের কল্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণের কথাও ঘোষণা করেছে।

সোমবার (৮ জুন, ২০২৬) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদেও বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে বিরোধী দলীয় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, ‘২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন লাখের বেশি নারী শ্রমিক বিদেশে গেছেন। তাদের অনেকেই নিরাপত্তাহীনতা, বেতন বঞ্চনা ও চুক্তি লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন।’ এমনকি প্রায় ৯৪ শতাংশ নারী শ্রমিক যৌন নির্যাতনের শিকার হন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরু জানিয়েছেন, প্রবাসীদের অভিযোগ ও সেবা নিশ্চিত করতে ১৬১৩৫ নম্বরে টোল-ফ্রি হটলাইন চালু রয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সেফ হোম পরিচালনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে অ্যাজেন্সির বাইরে সরাসরি কর্মী পাঠানোর জন্য ‘অ্যাডভান্স পুল’ গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। এছাড়াও আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন ‘বিদেশে বাংলাদেশী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার দূতাবাসভিত্তিক সেবা জোরদার করেছে। একইসাথে আইনি সহায়তা, অভিযোগ নিষ্পত্তি ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে নানা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারী অভিবাসী শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। তাই তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবে অত্যাবশ্যকীয়। আশা করা যায়, সরকারি হস্তক্ষেপে নারী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র আরো নিরাপদ ও নারীবান্ধব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

লেখা: উম্মে ফাতিমা মিম, শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়