সারাদেশ

যেসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কারাগার থেকে বের হতে হবে আয়েশাকে

বরগুনায় রাস্তায় ফেলে প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলায় গ্রেফতার তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন। শর্তসাপেক্ষে জামিন পেলেও এখনই কারামুক্ত হতে পারছেন না মিন্নি। আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে তাকে বাড়িতে ফিরতে হবে।

মিন্নিকে কেন জামিন দেয়া হবে না- এমন রুলের শুনানি শেষে হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ বৃহস্পতিবার মিন্নিকে জামিন দেন।

যে দুই শর্তে মিন্নিকে আদালত জামিন দিয়েছেন, সেগুলো হচ্ছে- ১. জামিনে থাকাবস্থায় মিন্নি তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের জিম্মায় থাকবেন; ২. জামিনে থাকাবস্থায় তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। এই দুই শর্তের ব্যত্যয় ঘটলে মিন্নির জামিন বাতিল হবে বলে রায়ে উল্লেখ করেন হাইকোর্ট।

শর্ত মেনে জামিন পেলেও এখনই কারাগার থেকে মুক্তি মিলছে না মিন্নির। এ জন্য তার পক্ষে আরও কিছু আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

মিন্নির জামিনে মুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তার আইনজীবী জেডআই খান পান্না বলেন, ‘যদি সরকার আপিল না করে, তা হলে হাইকোর্টের আদেশ বরগুনার আদালতে পৌঁছানোর পর মিন্নি মুক্তি পাবেন। তাই আগামী সোমবারের (২ সেপ্টেম্বর) মধ্যে তার মুক্তি মিলবে বলে ধারণা করছি।’

হাইকোর্টে মিন্নির আরেক আইনজীবী আইনুন্নাহার সিদ্দিকা গণমাধ্যমকে বলেন, বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের দেয়া জামিনের রায় বের হওয়ার পর এটি বরগুনা আদালতে পাঠানো হবে। এর পর সেখানে জামিননামা দাখিল করা হবে। সেখান থেকে কারাগারে পাঠানো হবে আদেশটি। কারাকর্তৃপক্ষ আদেশ পাওয়ার প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সেরে তাকে মুক্তি দেবেন।

তিনি বলেন, এর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ যদি আপিল বিভাগে আবেদন করেন, আর আপিল বিভাগ যদি হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন তা হলে মিন্নির জামিনে মুক্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তবে হাইকোর্টের রায় বহাল থাকলে তো মুক্তিতে বাধা থাকবে না।

নিম্নআদালতে মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম মুক্তির বিষয়ে বলেন, হাইকোর্ট থেকে দেয়া মিন্নির জামিনের আদেশের কপি ডাকযোগে বরগুনার আদালতে পৌঁছাবে। সেখানে বরগুনার যে আদালতের কথা উল্লেখ থাকবে, সেই আদালতে মিন্নির জামিনের জন্য মিস কেসের মাধ্যমে বন্ড দাখিল করতে হবে। এর পর আইনানুগভাবে মিন্নির জামিনের আদেশ পৌঁছাবে বরগুনা কারাগারে। এর পর মিন্নি কারাগার থেকে মুক্তি পাবে।

তবে শুক্রবার ও পর দিন শনিবার আদালত ও ডাক যোগাযোগের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় হাইকোর্টের বিচারপতিদ্বয়ের স্বাক্ষরিত মিন্নির জামিন আদেশ সোমবারের আগে বরগুনা আদালতে পৌঁছাবে না।

মাহবুবুল বারী আসলাম আরও বলেন, হাইকোর্টের দেয়া জামিন আদেশের স্বাক্ষরিত একটি কপি ডাকযোগে বরগুনার আদালতে পাঠানোর পর আমরা আদালতে জামানতনামা দাখিলের আবেদন করবো। বিচারক জামানতনামা গ্রহণ করে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে রিলিজ অর্ডার পাঠানোর আদেশ দেবেন। রিলিজ অর্ডার পাওয়া মাত্রই মিন্নিকে মুক্তি দিতে বাধ্য থাকবে কারা কর্তৃপক্ষ।

কারাগার থেকে মিন্নির বের হতে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তার জামিনে মুক্তির আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ চাইলে আপিল করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে বিচারক মিন্নির জামিন আবেদন স্থগিত, বহাল ও বাতিল করতে পারবেন। সব কিছুই আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনার জেল সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘শুনেছি হাইকোর্ট মিন্নির জামিন দিয়েছেন। এ বিষয়ে আদালত থেকে আদেশের কপি পেলে আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নেব।’

এদিকে মিন্নির জামিনে মুক্তির আদেশের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে আপিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কোর্টের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারোয়ার হোসেন বাপ্পী।

বৃহস্পতিবার হাইকোর্টে মিন্নির জামিন আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেডআই খান পান্না, তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী মশিউর রহমান, মাক্কিয়া ফাতেমা, জামিউল হক ফয়সাল। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারোয়ার হোসেন বাপ্পী।

রায় শেষে মিন্নির আইনজীবী জেডআই খান পান্না আদালত চত্বরে গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে ব্রিফ করেন। তিনি জানান, এ মামলার অভিযোগপত্র দেয়ার আগেই মিন্নিকে নিয়ে পুলিশ সুপারের সংবাদ সম্মেলনের ব্যাপারেও আদালত নির্দেশনা দিয়েছেন। তাতে আদালত বলেছেন, গ্রেফতার ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা আইনসম্মত নয়। গ্রেফতার করা ব্যক্তি সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্রিফিং নিয়ে নীতিমালা তৈরির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

এর আগে ২০ আগস্ট হাইকোর্ট মিন্নিকে কেন জামিন দেয়া হবে না- এই মর্মে রুল জারি করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে কেস ডকেটসহ (সিডি) আদালতে তলব করেন। পাশাপাশি আদালতে জবানবন্দি দেয়ার পূর্বে মিন্নি দোষ স্বীকার করেছে মর্মে বরগুনার এসপির সংবাদ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যের ব্যাখ্যা চান আদালত। বুধবার আদালতের নির্দেশে বক্তব্যের লিখিত ব্যাখ্যা দেন এসপি।

পরে আদালত জামিন আদেশের জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন।

গত ২৬ জুন রিফাতকে বরগুনার রাস্তায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে আলোচনার সৃষ্টি হয়। পর দিন রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ ১২ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন, তাতে প্রধান সাক্ষী করা হয়েছিল মিন্নিকে। পরে মিন্নির শ্বশুর তার ছেলেকে হত্যায় পুত্রবধূর জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করলে ঘটনা নতুন দিকে মোড় নেয়।

গত ১৬ জুলাই মিন্নিকে বরগুনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদের পর এ মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

পর দিন আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠান। রিমান্ডের তৃতীয় দিন শেষে মিন্নিকে আদালতে হাজির করা হলে সেখানে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পুলিশ জানায়।

তার আগের দিনই পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘মিন্নি হত্যাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং হত্যা পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে হত্যা পরিকল্পনার সঙ্গে মিন্নির যুক্ত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।’

মিন্নি পরে জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেন জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে। মিন্নির বাবা অভিযোগ করে আসছেন, ‘নির্যাতন করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে’ মিন্নিকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে পুলিশ। এর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের হাত আছে বলেও তার দাবি।

বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালত এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মিন্নির জামিন আবেদন নাকচ হয়ে যাওয়ার পর গত ৫ আগস্ট হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন তার আইনজীবীরা।

Share