‘বাঁচলে নদী, বাঁচবে দেশ—সবাই মিলে চেষ্টা করি, স্বপ্নের হাইমচর গড়ে তুলি’—এ স্লোগানকে সামনে রেখে চাঁদপুরের হাইমচরে ২০ আগস্টকে জাতীয়ভাবে ‘নদী ভাঙন প্রতিরোধ সংগ্রাম দিবস’ ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে মেঘনার ভয়াবহ ভাঙন থেকে হাইমচরকে রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং নদী ও ইলিশের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন বক্তারা।
শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেলে হাইমচর উপজেলার পাটওয়ারী মার্কেটের তেলির মোড়ে হাইমচর ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত সুধী ও আলোচনা সভায় এসব দাবি উঠে আসে।
হাইমচর ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের আয়োজনে আলহাজ্ব আবদুল হামিদ পাটওয়ারীর সভাপতিত্বে সভা সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
সভায় বক্তারা বলেন, মেঘনার ভাঙন হাইমচরের মানুষের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। প্রতিবছর নদীভাঙনে বসতভিটা, আবাদি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে অসংখ্য পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে হাইমচরের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সভাপতির বক্তব্যে আলহাজ্ব আবদুল হামিদ পাটওয়ারী বলেন, ‘হাইমচরের মানুষের কাছে নদী কেবল জীবন-জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের লড়াই। বছরের পর বছর মেঘনার সর্বগ্রাসী ভাঙনে হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন হয়েছে, হারিয়েছে আবাদি জমি ও সম্পদ।’
তিনি বলেন, ১৯৮৮ সালের ২০ আগস্ট নদীভাঙন থেকে হাইমচরকে রক্ষার দাবিতে আবদুল্লাহ সরকারের নেতৃত্বে হাইমচরের হাজার হাজার মানুষ ছয়টি লঞ্চযোগে ঢাকায় গিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কর্মসূচি পালন করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রাখতে ২০ আগস্টকে জাতীয়ভাবে ‘নদী ভাঙন প্রতিরোধ সংগ্রাম দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
আবদুল হামিদ পাটওয়ারী আরও বলেন, শুধু অস্থায়ীভাবে বালুর বস্তা ফেলে নদীভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। হাইমচরকে রক্ষায় টেকসই ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়ে প্রয়োজনে হাইমচরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আবারও ঢাকায় গিয়ে আন্দোলন করার ঘোষণা দেন তিনি।
সভায় বক্তারা হাইমচরের গাজীনগর, মধ্যচর ও ঈশানবালাসহ বিভিন্ন এলাকার নদীভাঙনের ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেন। তাদের অভিযোগ, মেঘনার প্রবল স্রোতের পাশাপাশি কোথাও কোথাও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তীর ও পরিবেশ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন তারা।
আলোচনায় নদী রক্ষার পাশাপাশি দেশের জাতীয় সম্পদ ইলিশ সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, মেঘনা নদী ইলিশের গুরুত্বপূর্ণ বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র। নদীর পরিবেশ ও স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ নষ্ট হলে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই নদী রক্ষার পাশাপাশি ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বক্তারা আরও বলেন, নদীভাঙন শুধু ভূখণ্ড হারানোর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, কৃষি, মৎস্য ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয় জড়িত। একটি পরিবার নদীগর্ভে বসতভিটা হারালে তাকে নতুন করে জীবন শুরু করতে হয়। ফলে নদীভাঙন প্রতিরোধকে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা হিসেবে না দেখে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সভায় আরও বক্তব্য দেন সংগঠক মোহাম্মদ আজিজ মিয়া, হাইমচর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ শহিদ উল্লাহ, সংগঠক মনজুরুল ইসলাম, প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন, সমাজসেবক মহসিন হোসেন কিশোর, খন্দকার আবুল কালাম আজাদ ও হামিদ পাটওয়ারী।
বক্তারা বলেন, নদী রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে নদীর তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আলোচনা সভায় স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এ সময় পাটওয়ারী মার্কেট চত্বর নদী রক্ষার দাবিতে মুখর হয়ে ওঠে।
বক্তারা বলেন, ‘সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ’ গড়তে হলে নদীকে বাঁচাতে হবে। নদী বাঁচলে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষিত থাকবে। তাই ২০ আগস্টকে জাতীয়ভাবে ‘নদী ভাঙন প্রতিরোধ সংগ্রাম দিবস’ ঘোষণার পাশাপাশি হাইমচরকে নদীভাঙনের কবল থেকে রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তারা।
মেঘনার করাল গ্রাস থেকে হাইমচরের জনপদ ও মানুষের বসতভিটা রক্ষায় এখন সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় নদীপাড়ের মানুষ।
প্রতিবেদক: মোঃ আলমগীর হোসেন (আসিফ)/
২২ আগস্ট ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur