ভালোবাসার অনন্য এক বিরল ও করুণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের গৃহবধূ আকলিমা বেগম (২৬)। স্বামীকে বাঁচাতে নিজের শরীর থেকে একটি কিডনি দিয়েছিলেন নিঃসংকোচে। সফল অস্ত্রোপচার শেষে বাঁচার নতুন আশাও জেগেছিল। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে শেষ পর্যন্ত স্বামীকে আর রক্ষা করা সম্ভব হলো না।
সব ত্যাগ আর চেষ্টার পরও প্রিয়তম স্বামী দেলোয়ার হোসেনকে (৪২) হারিয়ে এখন শোকে বাকরুদ্ধ দুই কন্যাসন্তানের এই জননী। মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা উত্তর ইউনিয়নের দক্ষিণ রূপসা গ্রামের পাঠান বাড়িতে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রবাসফেরত দেলোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা দ্রুত কিডনি সংযোজনের তাগিদ দেন। স্বামীর এই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে নিজের একটি কিডনি স্বামীকে দিতে রাজি হন দুই সন্তানের জননী আকলিমা বেগম(২৬)।
পরবর্তীতে গত ১৪ আগস্ট ঢাকার শ্যামলীতে অবস্থিত সিকেডি হাসপাতালে চিকিৎসকদের সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আকলিমার কিডনি দেলোয়ারের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর প্রথম দুই দিন শারীরিক উন্নতির লক্ষণ দেখা গেলেও তৃতীয় দিন থেকে দেলোয়ারের শরীরে বহুমুখী ডায়াবেটিস ও রক্তচাপজনিত তীব্র জটিলতা দেখা দেয়। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে অবশেষে ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন দেলোয়ার।
এই দম্পতির ঘরে রয়েছে আফরিন জান্নাত ইরা (১১) ও আশুরা জাহান ইভা (৪) নামের দুই অবুঝ কন্যাসন্তান। বাবার অকালমৃত্যু আর অসুস্থ মায়ের আহাজারিতে পুরো পরিবারে এখন মাতম চলছে।
নিহতের বড় ভাই আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার ছোট ভাইয়ের বউ আকলিমা নিজের অঙ্গ বিসর্জন দিয়ে ভালোবাসার চরম দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে। ভাইয়ের মৃত্যুর খবর প্রথমে আমরা তাঁকে জানাতে চাইনি। কিন্তু শোকার্ত আকলিমা তা জানার পর থেকে এখন সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছে। তাঁর নিজের শরীরও এখন বেশ সংকটজনক।
আক্ষেপ আর কান্না জড়িত কণ্ঠে দেলোয়ারের বৃদ্ধা মা শামছুন্নাহার বলেন, নিজের কিডনি দিয়েও আমার ছেলেকে বাঁচাতে পারল না আকলিমা! এখন আমার এই নিরাশ্রয় পুত্রবধূ নিজেই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। দুটি অবুঝ এতিম শিশু আর অসুস্থ বৌটির চিকিৎসার জন্য বিত্তবানদের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি।
ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জহির হোসেন বলেন, আকলিমার এই আত্মত্যাগ চিরকাল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমরা যেমন তাঁর ভালোবাসার সাক্ষী হলাম, তেমনি এই করুণ বিয়োগান্তে পুরো এলাকা জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
প্রতিবেদক: শিমুল হাছান,
২২ আগস্ট ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur