শিশুর প্রথম অধিকার ও আল্লাহর অনন্য নিয়ামত মাতৃদুগ্ধ
প্রতি বছর ১-৭ আগস্ট বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ (World Breastfeeding Week)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ (UNICEF) এবং ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর ব্রেস্টফিডিং অ্যাকশন (WABA)-এর উদ্যোগে পালিত এ সপ্তাহের মূল উদ্দেশ্য হলো মাতৃদুগ্ধপানের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, মায়েদের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি নবজাতকের সুস্থ জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলা।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান মাতৃদুগ্ধকে শিশুর “প্রথম টিকা” হিসেবে অভিহিত করে। কারণ জন্মের পর মায়ের বুকের দুধে থাকা অ্যান্টিবডি, রোগপ্রতিরোধী উপাদান ও প্রাকৃতিক পুষ্টি শিশুকে বহু সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়। বিস্ময়কর বিষয় হলো, চৌদ্দশ বছরেরও বেশি আগে পবিত্র কুরআন ও মহানবী (সা.) মাতৃদুগ্ধপানের গুরুত্ব সম্পর্কে এমন নির্দেশনা দিয়েছেন, যা আজকের বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইসলামে সন্তানের খাদ্য, পরিচর্যা ও সুস্থ বিকাশকে ইবাদতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাই মাতৃদুগ্ধ শুধু একটি খাদ্য নয়; এটি সন্তানের প্রতি মায়ের দায়িত্ব, পিতার সহযোগিতার ক্ষেত্র এবং পরিবারের সম্মিলিত আমানত।
কুরআনে মাতৃদুগ্ধপানের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে—এটি তাদের জন্য, যারা স্তন্যপানকাল পূর্ণ করতে চায়।”(সূরা আল-বাকারা:২৩৩) এই আয়াতে দুই বছর পর্যন্ত স্তন্যপান করানোর সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। একই সঙ্গে সন্তানের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পিতার ওপর অর্পণ করা হয়েছে, যাতে মা নিশ্চিন্তে শিশুকে লালন-পালন করতে পারেন। অর্থাৎ মাতৃদুগ্ধপান শুধু মায়ের একক দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার ও সমাজেরও দায়িত্ব।
আরও একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন— “আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তার দুধ ছাড়াতে সময় লাগে দুই বছর।” (সূরা লুকমান:১৪) এছাড়া সূরা আল-আহকাফ:১৫) -এ গর্ভধারণ ও দুধ ছাড়ানোর সময়কাল উল্লেখ করে মাতৃত্বের ত্যাগ ও মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে। এসব আয়াত প্রমাণ করে, ইসলাম মাতৃত্ব ও মাতৃদুগ্ধকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করে।
হাদিসে মাতৃত্ব ও শিশুর অধিকার
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)এই হাদিসের আলোকে সন্তানের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা মা-বাবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আরেকটি হাদিসে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেন, আমার উত্তম ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? রাসুল (সা.) তিনবার বলেন, “তোমার মা।” এরপর বলেন, “তোমার বাবা।”(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
মায়ের এই মর্যাদা তাঁর ত্যাগ, গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান ও স্তন্যদানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে মাতৃদুগ্ধের অনন্যতা
মাতৃদুগ্ধ এমন একটি প্রাকৃতিক খাদ্য, যা শিশুর বয়স অনুযায়ী নিজেই পরিবর্তিত হয়। জন্মের পর প্রথম যে ঘন হলুদাভ দুধ বের হয়, তাকে কলোস্ট্রাম বলা হয়। এটি ইমিউনোগ্লোবুলিন, শ্বেত রক্তকণিকা, ভিটামিন এ ও রোগপ্রতিরোধী উপাদানে সমৃদ্ধ। অনেক পরিবার ভুল ধারণার কারণে এই দুধ ফেলে দেয়, অথচ এটিই নবজাতকের সবচেয়ে মূল্যবান খাদ্য।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের পরামর্শ অনুযায়ী— * জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ দিতে হবে।
* প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র মাতৃদুগ্ধই যথেষ্ট; পানি বা অন্য কোনো খাবারের প্রয়োজন নেই।
* ছয় মাস পর পুষ্টিকর সম্পূরক খাবার শুরু করলেও দুই বছর বা তার বেশি সময় পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধ চালিয়ে যাওয়া উচিত।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সঠিকভাবে মাতৃদুগ্ধপান নিশ্চিত করা গেলে প্রতি বছর ৮ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
বর্তমানে বিশ্বে মাত্র প্রায় ৪৮ শতাংশ শিশু জীবনের প্রথম ছয় মাস একচেটিয়াভাবে মাতৃদুগ্ধ পায়। বাংলাদেশে এ হার প্রায় ৬৫ শতাংশ, যা ইতিবাচক হলেও শতভাগ সচেতনতা এখনও গড়ে ওঠেনি।
শিশুর জন্য উপকারিতা মাতৃদুগ্ধপানকারী শিশুরা সাধারণত—
* ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে কম আক্রান্ত হয়।
* অপুষ্টি ও রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি কম থাকে। অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
* মস্তিষ্কের বিকাশ ও স্মৃতিশক্তি উন্নত হয়। ভবিষ্যতে স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমে।
* অ্যালার্জি ও কিছু দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার সম্ভাবনা হ্রাস পায়। মায়ের জন্য স্বাস্থ্যগত সুফল
মাতৃদুগ্ধপান শিশুর পাশাপাশি মায়ের জন্যও বহুমুখী উপকারী।
* প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ কমায়।
* জরায়ুকে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।
* স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
* টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের সম্ভাবনা হ্রাস করে।
* প্রসব-পরবর্তী মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে।
* স্বাভাবিক ওজন ফিরে পেতে সাহায্য করে।
প্রচলিত ভুল ধারণা
এখনও সমাজে অনেকেই মনে করেন প্রথম হলুদ দুধ খাওয়ানো উচিত নয়, গরমে শিশুকে পানি দিতে হবে, অথবা সিজারিয়ানের পর কয়েক দিন বুকের দুধ দেওয়া যায় না। এসব ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সন্তান জন্মের পরপরই স্তন্যদান শুরু করা সম্ভব। সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেওয়াই উত্তম।
কর্মজীবী মায়েদের জন্য সহায়ক পরিবেশ জরুরি
অনেক মা চাকরিজীবী হওয়ায় পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি, স্তন্যদান কক্ষ এবং বুকের দুধ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধপান ব্যাহত হয়। ইসলাম পরিবারকে পারস্পরিক সহযোগিতার শিক্ষা দিয়েছে। তাই কর্মক্ষেত্রেও মাতৃদুগ্ধবান্ধব নীতি বাস্তবায়ন সময়ের দাবি।
পরিবারের দায়িত্ব
সন্তান লালন-পালন কেবল মায়ের একার কাজ নয়। বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি ও পরিবারের অন্য সদস্যদের উচিত মাকে বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাদ্য এবং মানসিক সমর্থন দেওয়া। কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী পিতার আর্থিক দায়িত্ব পালন এবং পরিবারের সহযোগিতাই শিশুর সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে পারে।
আমাদের করণীয়
বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক পালন নয়; এটি নবজাতকের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি বৈশ্বিক আন্দোলন। হাসপাতালগুলোতে জন্মের প্রথম ঘণ্টার মধ্যে স্তন্যদান নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয়ভাবে ফর্মুলা দুধের প্রচার নিরুৎসাহিত করা, মাতৃদুগ্ধবান্ধব কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা এবং পরিবারভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।
ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান উভয়ই একই বার্তা দেয়—মাতৃদুগ্ধই শিশুর সর্বোত্তম খাদ্য। তাই প্রতিটি মা যেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন,সে পরিবেশ সৃষ্টি করা আমাদের সবার নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২৬-এ আমাদের অঙ্গীকার হোক—জন্মের প্রথম ঘণ্টায় স্তন্যদান, প্রথম ছয় মাস একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ এবং দুই বছর বা তারও বেশি সময় পর্যন্ত স্তন্যদান অব্যাহত রাখা। একটি সুস্থ, মেধাবী ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলার সবচেয়ে সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর উপায় শুরু হয় মায়ের বুকের দুধ থেকেই।
লেখক:ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ,কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
বিশেষ প্রতিবেদন
২ আগস্ট ২০২৬
এ জি