পৌরসভা থেকে সিটি : কুমিল্লার নাগরিক সেবার প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
প্রাচীন সমতট জনপদের প্রাণকেন্দ্র কুমিল্লা। ২০১১ সালের ১০ জুলাই কুমিল্লা পৌরসভা ও সদর দক্ষিণ পৌরসভাকে বিলুপ্ত করে ২৭টি ওয়ার্ডের সমন্বয়ে গঠিত হয় কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক)। আজ প্রায় দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও সিটির নাগরিক সুযোগ-সুবিধা এবং আধুনিকায়নের প্রশ্নে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে জনমনে।
পৌরসভা থেকে সিটিতে রূপান্তরের পর অবকাঠামোগত কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। শহরের প্রধান সড়কগুলোর প্রশস্তকরণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সড়ক বাতি হিসেবে ল্যাম্পপোস্ট স্থাপনের ফলে শহরের বাহ্যিক চাকচিক্য বেড়েছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতির শহর হিসেবে পরিচিত কুমিল্লায় বিনোদন কেন্দ্র ও পার্কগুলোর কিছুটা উন্নয়ন হলেও বর্ধিত ওয়ার্ডগুলোর (সদর দক্ষিণ অংশ) বাসিন্দাদের অভিযোগ—তারা এখনো সিটির পূর্ণ সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
শহরের আধুনিকায়ন নিয়ে সচেতন মহলে রয়েছে বিস্তর সমালোচনা। বিশেষ করে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট এবং বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা এখন কুমিল্লার মানুষের প্রধান মাথাব্যথা।
চলচ্চিত্র মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব খায়রুল আনাম রায়হান বলেন: “পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমরা কি পরিকল্পিত একটি শহর পেয়েছি? এখনো সামান্য বৃষ্টিতে চকবাজার, কান্দিরপাড় তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতা নিরসনে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও তার সুফল নাগরিকরা পাচ্ছে না। আমরা এমন এক আধুনিক কুমিল্লা চেয়েছিলাম যেখানে যানজটমুক্ত রাস্তা আর পরিচ্ছন্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকবে।”
একই সুরে কথা বললেন কুমিল্লা বাঁচাও মঞ্চের কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্য সচিব নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন: “কুমিল্লা শহরের প্রধান সংকট এখন যানজট। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল পুরো শহরকে স্থবির করে দিয়েছে। সিটি করপোরেশন হওয়ার পর নাগরিক ট্যাক্স বেড়েছে বহুগুণ, কিন্তু সেই তুলনায় সেবার মান বাড়েনি। ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং সুপরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।”
গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু, যিনি সম্প্রতি এই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি নাগরিক সমস্যার সমাধানে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
নাগরিক ভোগান্তি নিয়ে ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন: “আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জলাবদ্ধতা নিরসন এবং যানজট কমানোর ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা কিছু সমস্যা পেয়েছি, যা রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। তবে ড্রেনগুলো পরিষ্কার করা এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। নাগরিকদের ট্যাক্সের টাকা যেন তাদেরই কল্যাণে ব্যয় হয়, সেটি নিশ্চিত করাই আমার লক্ষ্য। আশা করছি দ্রুতই কুমিল্লার মানুষ একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন অনুভব করবেন।”
কুমিল্লার সাধারণ নাগরিকদের আশা ছিল সিটি করপোরেশন হওয়ার পর তারা একটি স্মার্ট ও বাসযোগ্য নগরী পাবেন। কিন্তু যানজট, জলাবদ্ধতা এবং মশার উপদ্রবের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো এখনো সমাধান না হওয়ায় জনমনে কিছুটা ক্ষোভ রয়ে গেছে। তবে বর্তমান প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে কুমিল্লা তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
-জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল, ২৯ এপ্রিল ২০২৬