চার কারণে এসএসসি-সমমান পরীক্ষায় ব্যাপক অনুপস্থিতি
প্রতি বছর এসএসসি, দাখিল ও সমমান পরীক্ষায় উপস্থিত হয় না বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। চলতি বছরেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। প্রতিদিন ১১টি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষায় ২৫-৩৫ হাজার পর্যন্ত অনুপস্থিতির ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে সবচেয়ে অনুপস্থিতি বেশি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষায়। কারিগরিতেও অনুপস্থিতির হার বেশি। দীর্ঘ ১০ বছরের শিক্ষা কার্যক্রম শেষে ফরম পূরণ করেও গুরুত্বপূর্ণ এই পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করার বিষয়টি বেশ উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অনুপস্থিতির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান বা প্রতিকার নিয়েও শিক্ষা বোর্ডগুলোর তেমন কোনো সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ করা যায়নি।
গত বছরের এসএসসি পরীক্ষার পর অবশ্য প্রথমবারের মতো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। ওই প্রতিবেদন ও অন্যান্য বোর্ড কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, প্রধানত চারটি কারণে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ব্যাপক অনুপস্থিতির ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে রয়েছে—মেয়েদের বিয়ে হওয়া, অসুস্থতা, পরীক্ষার ভালো প্রস্তুতির অভাব এবং পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে কর্মক্ষেত্রে ঢুকে যাওয়া উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া মাদরাসাসহ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়াতে অনেক দুর্বল ও অনাগ্রহী শিক্ষার্থীকেও ফরম পূরণে উদ্বুদ্ধ করা হয়, যাদের অনেকেই পরে পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকে বলে জানা গেছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির পরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বছর ১০ এপ্রিল শুরু হওয়া এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রথম দিনে ১১টি শিক্ষাবোর্ডে অনুপস্থিত ছিল ২৬ হাজার ৯২৮ জন। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অনুপস্থিতির সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৭৩৭। অন্যদিকে মাদরাসা বোর্ডের দাখিল পরীক্ষায় অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৬২৩। কারিগরি বোর্ডে এই সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৫৬৭।
এ বছর গত ২১ এপ্রিল শুরু হওয়া এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রথম দিনে ১১ শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে অনুপস্থিতি ছিল ২৫ হাজার ৪০৮ পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিতি দেখা গেছে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের দাখিল পরীক্ষায় ১১ হাজার ২১১ জন। কোরআন মজিদ ও তাজভিদ পরীক্ষায় মোট দুই লাখ ৫৪ হাজার ৯০৩ পরীক্ষার্থীর মধ্যে অংশগ্রহণ করে দুই লাখ ৪৩ হাজার ৬৯২ জন। এ বোর্ডে অনুপস্থিত ছিল ১১ হাজার ২১১ জন। আর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বাংলা-২ বিষয়ের পরীক্ষায় মোট এক লাখ ১৯ হাজার ২৫০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে অংশগ্রহণ করে এক লাখ ১৬ হাজার ৯৪৩ জন। অনুপস্থিতির সংখ্যা দুই হাজার ৩০৭। সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বাংলা (আবশ্যিক) প্রথম পত্র ও সহজ বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষায় ১১ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অংশ নেয় ১১ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন। এসব বোর্ডে মোট অনুপস্থিতির সংখ্যা ১১ হাজার ৮৯০। এ বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে।
এদিকে গত বছরের সর্বশেষ পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডে অনুপস্থিত ছিল ৩১ হাজার ৫৫ জন। এবারের গত ১২ মে অনুষ্ঠিত রসায়ন, পৌরনীতি ও নাগরিকতা এবং ব্যবসায় উদ্যোগ পরীক্ষায় অনুপস্থিতি ছিল ২৭ হাজার ৬৯৩ জন।
তবে গত ৩ মে এবারের গণিত পরীক্ষায় অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এদিন ১১টি শিক্ষাবোর্ড মিলিয়ে অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩৪ হাজার ৯৪৬। এর মধ্যে মাদরাসা বোর্ডের বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় অনুপস্থিতির সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৫৭৬।
দাখিল পরীক্ষায় ব্যাপকসংখ্যক পরীক্ষার্থীর অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মিঞা মো. নূরুল হক আমার দেশকে বলেন, এ বিষয়ে বোর্ডের পক্ষ থেকে কোনো জরিপ করা হয়নি। তবে আমরা যতটুকু জানি, তাতে অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর বেশির ভাগই মেয়ে। বিয়ে হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের অনেকে ফরম পূরণ করেও পরীক্ষায় অংশ নেয় না। বিয়ে হলেও মেয়েরা যাতে পড়ালেখা চালিয়ে যায়—সে বিষয়ে মোটিভেশন চালানো দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পরীক্ষায় অনুপস্থিতির ব্যাপারে তিনি আরো বলেন, আরেকটা কারণ হলো—দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রে ঢুকে যায়। আবার কিছু পরীক্ষার্থীর প্রস্তুতি না থাকায় তারা ফরম পূরণ করার পরও পরীক্ষা দিতে সাহস করে না।
২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑঅনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের অধিকাংশই মেয়ে শিক্ষার্থী, অনিয়মিত শিক্ষার্থীর চেয়ে নিয়মিত শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির হার অধিক। তা ছাড়া শহর অঞ্চলের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে পরীক্ষায় অনুপস্থিতির হার অনেক বেশি।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রায় ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী (৯৭ শতাংশ মেয়ে) বিয়ের (বাল্যবিয়ে) জন্য পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। বিয়ের কারণে অনুপস্থিতির ঘটনার ৮৭ শতাংশই গ্রামের। অসুস্থতার জন্য ২৫ শতাংশ পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল। প্রায় ১২ শতাংশ পরীক্ষার্থী ভালো প্রস্তুতির অভাবে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত ছিল। এছাড়া পারিবারিক অসচ্ছলতার জন্য কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়া বা বিদেশে চলে যাওয়ার কারণে পরীক্ষায় অনুপস্থিত আছে এমন পরীক্ষার্থীর হার প্রায় ১০ শতাংশ। অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মারা যাওয়া, পরিবারের কোনো সদস্যের অসুস্থতা, মৃত্যুসহ অন্যান্য কারণও রয়েছে।
অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ৫০ ভাগ শিক্ষার্থী পরবর্তী বছর পরীক্ষা দিতে চায়। বাকিরা আর পড়াশোনা করবে না।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এসএম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের কারণ অনুসন্ধানের কার্যক্রমটি ছিল প্রথম এবং এটি শুধু ঢাকা বোর্ডের প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে পরিচালনা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে অন্যান্য বোর্ডের ক্ষেত্রেও করা যেতে পারে। তা ছাড়া এই কার্যক্রমকে নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা গেলে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণ অনুধাবন ও করণীয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তা অবদান রাখবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।
ঢাকা বোর্ডের উদ্যোগে এবারও এ ধরনের অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে বলে আমার দেশকে জানান তিনি।
১৯ মে ২০২৬
এ জি