বর্তমানে সারাদেশে আতঙ্কের নাম আগুন

পুরান ঢাকার পর এবার আধুনিক ঢাকায়। বস্তি থেকে শুরু করে কেমিক্যাল গোডাউন, আধুনিক বহুতল ভবনে একের পর এক ঘটছে অগ্নিকাণ্ড। নিমতলীর ঘটনার ভয়াবহতায় সবাই স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল কিন্তু সতর্ক হয়নি। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে নেওয়া হয়নি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ। সমন্বিত কোনো তৎপরতাও দেখা যায়নি সেবা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে।
সে কারণেই গত মাসে ঘটে চুড়িহাট্টার ঘটনা। সেই চুড়িহাট্টার আগুনের ক্ষতি ও ক্ষত শুকিয়ে যাওয়ার আগেই বৃহস্পতিবার বনানীর এফআর টাওয়ারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা নিয়ে অসহায় নগরবাসীর প্রশ্ন, দেড় কোটি মানুষের নির্ভরতার এই নগরী কি নিত্য অবহেলায় আতঙ্কের জনপদ হয়ে উঠছে? সে প্রশ্নের উত্তর যাদের দেওয়ার কথা সেই সরকারি সেবা সংস্থা রাজউক, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিসই আজ আইনের প্রয়োগ না করা ও বেআইনি কর্মকাণ্ডে প্রশ্রয়ের অভিযোগে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে।

গতকাল(২৯ মার্চ )ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমও এফআর টাওয়ারের নকশা ও ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া রাজউক চেয়ারম্যান এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের খোঁজ চলছে বলে জানিয়েছেন। ১৮ তলা নির্মাণের জন্য প্ল্যান পাস নিয়ে ভবনটি কীভাবে ২৩ তলা হয়েছে সেটি একটি বড় প্রশ্ন। গতকাল পর্যন্ত ২৫ জনের প্রাণ কেড়ে নেওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের উৎস এবং দায় দায়িত্ব নিরূপণে এ পর্যন্ত পাঁচটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তাদের রিপোর্ট ও সুপারিশের পরই জানা যাবে অগ্নি দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটল এবং এমন অতর্কিত আগুন প্রতিরোধে কতটা উদাসীন ছিল এফআর টাওয়ারের মালিকরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তা শিথিলতার কোনো ফাঁক গলে আগুনের লেলিহান শিখা কোথায় ছড়িয়ে পড়বে তা আগে থেকে অনুমান করার উপায় নেই। তবে সচেতন হলে দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। এ জন্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও তার ইত্যাদি ব্যবহারের সময় পণ্যমান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। বাড়িঘর ও কলকারখানায় অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতিটি এলাকায় পানি সংগ্রহের পর্যাপ্ত উৎস থাকতে হবে। কোথাও আগুন লাগলে সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসকে জানালেও প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব।

ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির কারণে বড় অগ্নিকাণ্ড সবার দৃষ্টি কাড়লেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও আগুনের ঘটনা ঘটছে। সাধারণ মানুষের বক্তব্য, এই শহর ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। আগুনের মতো এ ধরনের দুর্যোগ, দুর্ঘটনা মোকাবিলার সক্ষমতা আমাদের নেই। আইন না মেনে প্রভাবশালীরা গড়ে তুলছে সুউচ্চ ভবন। কিন্তু সেসব ভবনের আগুন নেভানোর মতো যথেষ্ট সরঞ্জাম থাকছে না। বাসিন্দাদের নিরাপত্তার বিষয়টি ভবন মালিকদের কাছে সব সময়ই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

এফআর টাওয়ারের ঘটনার চারদিন আগেই গত শনিবার রাতে পুরান ঢাকায় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে প্রায় ২৫টি দোকান, কারখানা। লালবাগের জেএন সাহা রোডের ছয় নম্বর গলির মার্কেটের পাশেই ওই বাসা-বাড়ি। গলির আরেক পাশে স্কুল। বিভিন্ন দোকান। ভয়াবহ আগুনে দোকান, কারখানা পুড়ে প্রায় দুই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ ঘটনার অর্ধসপ্তাহ যেতেই বনানীতে ঘটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর সারা দেশে ১৯ হাজার ৬৪২টিরও বেশি অগ্নিকাণ্ড হয়। এতে কমপক্ষে ১৩০ জন নিহত ও ৬৬৪ জন আহত হয়। এসব অগ্নিকাণ্ডে সম্পদের ক্ষতি হয় ৪৩০ কোটি টাকার মতো। বেশিরভাগ আগুনের সূত্রপাত বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, চুলার আগুন, গ্যাস সিলিন্ডার, ছুড়ে দেওয়া জ্বলন্ত সিগারেট ইত্যাদি থেকে। প্রতিবছর গড়ে ১৯ হাজার আগুনের ঘটনা ঘটে। গত ১০ বছরে সারা দেশে ১ লাখ ৫০ হাজার ২১৫টি অগ্নিকাণ্ড হয়। এতে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজারের বেশি মানুষ।

আহত হয়েছেন প্রায় ১৩ হাজার মানুষ। ক্ষতির পরিমাণ সোয়া ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সংঘটিত অগ্নিকাণ্ড ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে। গত ১০ বছরে শিল্পে অগ্নিদুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতি হয় ২০১৫ সালে। ওই বছর এক হাজার ১৩টি আগুনের ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি হয় ৬৪৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা। ২০১৬ সালে দেশের সাত বিভাগে ২৫৮টি অগ্নিদুর্ঘটনায় ৩২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। এ ছাড়া ২০১৪ সালে ৯৬১টি অগ্নিদুর্ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৭৩ কোটি টাকা।

শিল্পে অগ্নিদুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির প্রায় ২৫ শতাংশই তৈরি পোশাক খাত ও শপিংমল সেক্টরে ১০ শতাংশের মতো ক্ষতি হয়। গত ১০ বছরে দেশের বস্তিগুলোয় ২ হাজার ২০০টির বেশি অগ্নিকাণ্ড হলেও একটিরও অভিযোগপত্র দিতে পারেনি পুলিশ। স্বাভাবিকভাবেই এসব অগ্নিকাণ্ডে কাউকে দায়ীও করা যায়নি। এর আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকার মতো। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, ২০১৩ সালে ঢাকার বিভিন্ন বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২৯টি। এতে ক্ষয়ক্ষতি হয় ৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকার। পরের বছর অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩-এ। ১২ জনের প্রাণহানির পাশাপাশি এতে ক্ষতি হয় ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকার। ২০১৫ সালে রাজধানীর বস্তিগুলোয় ৪৭টি অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয় তিনজন। আর ক্ষয়ক্ষতি হয় ১ কোটি ১১ লাখ টাকার।

পরের বছর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কিছুটা কমে ২৭ এ দাঁড়ায়। এতে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি নিহত হয় একজন। ২০১৭ সালে রাজধানীর বস্তিগুলোয় ৩২টি অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারায় একজন। পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা, গার্মেন্টসহ শ্রমঘন শিল্প কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি থাকে সবচেয়ে বেশি। বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন তৈরির কারণে রাজধানী জুড়েই গিঞ্জি স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনা নির্মাণে মালিকপক্ষ নিজেদের কোনো জায়গা না ছাড়ায় গায়ে গায়ে লেগে থাকছে ভবনগুলো।

ফলে, দুর্ঘটনায় উদ্ধারকার্য চালানো কিংবা ফায়ার সার্ভিসের সরঞ্জাম পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। বনানীর অগ্নিকাণ্ডেও পুরান ঢাকার মতোই একই ঘটনা ঘটেছে। ফলে, উদ্ধার কাজ বিলম্বিত হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহামেদ খান এ প্রতিবেদককে জানান, আগ্নিকা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য প্রতিটি ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখতে হবে।

সেগুলো নিয়মিত চালু রাখতে হবে। এছাড়া ফায়ার সার্ভিসের সংখ্যা এবং মহড়াও বাড়াতে হবে। গত ২০শে ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা মসজিদের সামনে বিস্ফোরণ থেকে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই আগুনে নারী-শিশুসহ ঘটনাস্থলেই কমপক্ষে ৭১ জনের মৃত্যু হয়। সেই দুর্ঘটনার রেশ না কাটতেই বনানীর এফআর টাওয়ারের অগ্নিকান্ডে উদ্বিগ্ন সারা দেশের মানুষ। এই অমানবিক মৃত্যুর ঘটনাকে গতকাল হত্যাকান্ড বলে অভিহিত করেছেন গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।


বার্তাকক্ষ
৩০ মার্চ ২০১৯

Share