Home / আন্তর্জাতিক / ভারতের হাইকমিশনারকে বহিষ্কার করে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থগিত করলো পাকিস্তান
imran khan pakistan

ভারতের হাইকমিশনারকে বহিষ্কার করে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থগিত করলো পাকিস্তান

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়ার বিরুদ্ধে ভারতেই শুরু হয়েছে প্রচন্ড বিরোধিতা-বিক্ষোভ। বুধবার (৭ আগস্ট) খোদ দিল্লিতে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছে ভারতের বাম রাজনীতিকরা। একই দিন বিক্ষোভ হয়েছে কলকাতায়ও।

এদিকে পাকিস্তানে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এনএসসি’র বৈঠকে ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং বাণিজ্য সম্পর্ক স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গতকাল প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সভাপতিত্বে বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পাকিস্তান ভারতের আকস্মিক সিদ্ধান্ত জাতিসঙ্ঘে উত্থাপনর এবং আগামী ১৫ আগস্টা কালো দিবস পালন ও ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস অধিকৃত কাশ্মীরের জনগণের সাথে সংহতি প্রকাশ করে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান বলেছেন, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বিরোধীয় জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলের উদ্বেগজনক ঘটনাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তুরস্ক। এরদোগান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং নরেন্দ্র মোদির সাথেও কথা বলবেন বলে জানান।

তবে নরেন্দ্র মোদি গতকাল তার ধারাবাহিক টুইটে মঙ্গলবার জম্মু-কাশ্মীরের আইন পাসের বিষয়টি স্মরণীয় অনুষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করেন। এটিকে তিনি গণতন্ত্রের স্বাধীনতা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আমি অভিবাদন জানাচ্ছি জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখের ভাই-বোনদের তাদের সাহস এবং স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তনের সক্ষমতার জন্য।

ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য স্থগিত : রাষ্ট্রদূত বহিষ্কার

পাকিস্তানের জাতীয় সুরক্ষা কমিটি (এনএসসি) ভারতের সাথে ক‚টনৈতিক সম্পর্ক হ্রাস করা এবং নয়াদিল্লির সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে ভারত থেকে হাইকমিশনারকে প্রত্যাহার ও ইসলামাবাদে ভারতের হাইকমিশনারকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অধিকৃত কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার ভারতের আকস্মিক সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সভাপতিত্বে গতকাল শীর্ষ সুরক্ষা সংস্থার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠকে পাকিস্তান-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পর্যালোচনা, বিষয়টি জাতিসংঘের কাছে উত্থাপন এবং কাশ্মীরিদের সাথে সংহতি জানিয়ে আসন্ন স্বাধীনতা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

বৈঠকের পর জারি করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে ‘প্রধানমন্ত্রী নৃশংস ভারতীয় বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা, নকশা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ফাঁস করার জন্য সমস্ত ক‚টনৈতিক চ্যানেলকে সক্রিয় করার নির্দেশ দিয়েছেন।’

বৈঠকে নয়াদিল্লি থেকে পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে ফিরিয়ে নেওয়ার এবং ভারতীয় হাইকমিশনারকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেশি এআরওয়াই নিউজকে বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রদূতরা আর নয়াদিল্লিতে থাকবেন না এবং তাদের প্রতিপক্ষদেরও এখান থেকে ফেরত পাঠানো হবে।’

পাকিস্তানের চরম সিদ্ধান্তের পর প্রশ্ন উঠছে, বাণিজ্যিক সম্পর্ক বন্ধ হলে ভারতে কী কী পণ্য আসবে না তার তালিকায় রয়েছে, ফল, সিমেন্ট, পেট্রোলিয়াম জাতীয় পণ্য, খনিজ এবং চামড়া সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আমদানি করা হয় পাকিস্তান থেকে। এছাড়া তুলা, কাচ জাতীয় পণ্যও পাকিস্তান থেকে আমদানি করে ভারত।

পুলওয়ামায় হামলার পরদিন পাকিস্তানের ‘মোস্ট ফেভারড নেশন’ অর্থাৎ সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের তকমা কেড়ে নেয় ভারত। পাশাপাশি পাকিস্তান থেকে আমদানিকৃত সব জিনিসের ওপর ২০০% আবগারি শুল্ক চাপিয়ে দেয় ভারত। ফলে বাণিজ্যিকভাবে পাকিস্তান আরো বেকায়দায় পড়েছিল। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিলের পর আবারো ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে চিড় ধরে। কয়েকদিন ধরেই উভয় দেশের নেতারাই উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করছেন। এরই মধ্যে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিল পাক সরকার।
কাশ্মীর কি ফিলিস্তিনের ‘গাজা ভূখন্ড’, মোদিকে প্রশ্ন বামপন্থীদের

কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে আসছে কাশ্মীরের মানুষ। কয়েকটি জায়গায় দফায় দফায় বিক্ষোভ ঘটেছে। পুলিশ-সেনা সদস্যদের লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া এবং পুলিশের সঙ্গে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ৩৭০ ধারা বাতিলের প্রতিবাদে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে এক বিক্ষোভকারী শাহাদাতবরণ করেছেন। পুলিশ এ খবর নিশ্চিত করেছে। এটি হচ্ছে ভারতীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রথম শহীদ। জম্মু-কাশ্মীর জুড়ে রাজনৈতিক নেতাসহ ১০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে ৬ জন বিক্ষোভকারী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রীনগরের এক পুলিশ অফিসারের দাবি করে, ‘তাড়া খেয়ে একজন বিক্ষোভকারী ঝিলম নদীতে ঝাঁপ দেয় এবং মারা যায়।’
এদিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ডেপুটি এডিটর মুজামিল জালিল শ্রীনগর থেকে দিল্লিতে ফিরে দাবি করেন, দুই বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার খবর জেনেছেন তিনি। তবে এ ঘটনা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

ভারতের বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো গতকাল বুধবার সকাল থেকে আর্টিকেল ৩৭০ এবং ৩৫এ নিয়ে রাস্তায় নেমেছে। এটি তাদের পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি। দিল্লির যন্তর মন্তরে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন, মোদি সরকার একসময় বলেছিল, কাশ্মীরে নির্বাচন করবে। কিন্তু কী হলো দেখা গেল। কাশ্মীরি নেতাদের গ্রেফতার করে সংসদে আর্টিকেল ৩৭০ এবং ৩৫এ আইনকে বাতিল করা হয়েছে। অবাক লাগছে, কাশ্মীর চাই। কাশ্মীরিদের চাই না। এখন মনে হচ্ছে সরকার ইসরাইলের ‘প্যালেস্টাইন’ ফর্মুলা নিয়েছে মোদি সরকার। কাশ্মীর কি ‘গাজা ভূখন্ড’ নাকি? প্রশ্ন ছুঁড়েছেন সীতারাম।

অন্যদিকে, গতকাল কলকাতায় মহম্মদ সেলিমসহ অন্যান্য বাম নেতাদের নেতৃত্বে আর্টিকাল ৩৭০ পক্ষে এবং কাশ্মীরকে দ্বিখন্ডিত করার বিপক্ষে মিছিল বার করেছে সিপিএম। ধর্মতলা থেকে এই মিছিল শুরু হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাত সোমবারই জানিয়েছিলেন মোদি সরকার ঠান্ডা মাথায় দেশের গণতন্ত্রকে খুন করেছে। দেশের ধর্ম নিরপেক্ষতার পক্ষে এই সরকার বিপদজ্জনক।

কাশ্মীরে একটি নতুন ভোর অপেক্ষা করছে : মোদি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মঙ্গলবার জম্মু-কাশ্মীরের আইন পাসের বিষয়টি স্মরণীয় অনুষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করেন। এটিকে তিনি গণতন্ত্রের স্বাধীনতা বলে উল্লেখ করেছেন। মোদি ধারাবাহিক টুইটে বলেন, আমি অভিবাদন জানাচ্ছি জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখের ভাই-বোনদের তাদের সাহস এবং স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তনের সক্ষমতার জন্য। বছরের পর বছর ধরে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে, কখনো জনগণের ক্ষমতায়ন নিয়ে ভাবেনি। জম্মু ও কাশ্মির এখন তাদের কবল থেকে মুক্ত। একটি নতুন ভোর, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে!

মোদি আরও দাবি করেন, তার সরকার কাশ্মীরের বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকা লাদাখকে ভারতের কেন্দ্রশাসিত এলাকা ঘোষণার জন্য সেখানকার জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করেছে।

কাশ্মীরের বিরোধ নিষ্পত্তি করতে চান এরদোগান
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান বলেছেন, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বিরোধীয় জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলের উদ্বেগজনক ঘটনাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তুরস্ক। মঙ্গলবার দেশটির রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত তুরস্কের ১১তম রাষ্ট্রদূত সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। এরদোগান বলেন, মঙ্গলবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে টেলিফোনে ফলপ্রসূ কথা হয়েছে। আঙ্কারা ওই অঞ্চলের উত্তেজনা নিরসনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও কথা বলতে চায়।
সউদী যুবরাজকে অবহিত করলেন ইমরান খান

কাশ্মীরের সাংবিধানিক বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা বাতিলের পর উদ্ভ‚ত পরিস্থিতি সউদী যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমানকে জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। মোহাম্মাদ বিন সালমানের কাছে কাশ্মীরের সা¤প্রতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে ইমরান খান বলেন, কাশ্মীর বিষয়ে ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের ফলে এ অঞ্চলে নিরাপত্তা ও শান্তি বিঘিœত হবে। ‘তাছাড়া এমন সিদ্ধান্ত উপমহাদেশের শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হবে।’

তবে ইমরান খানকে সউদী যুবরাজ কোনো বার্তা দিয়েছেন কি না সে বিষয়ে জিয়ো নিউজ কিছু জানায়নি।
কাশ্মীরের সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল অবৈধ : ওআইসি

বিজেপি সরকার কর্তৃক কাশ্মীরের সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিলের বিষয়টিকে ‘অবৈধ ও একতরফা’ আখ্যা দিয়ে এর নিন্দা জানিয়েছে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)। একই সঙ্গে জম্মু কাশ্মীরে নির্লজ্জভাবে যে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে তার নিন্দা জানিয়েছে সংস্থাটি। গত মঙ্গলবার ওআইসি সদরদপ্তর জেদ্দায় জরুরি বৈঠকে বসে তারা এ ঘটনার নিন্দা জানায়।

ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের অনুরোধে এই বৈঠকে বসেন কন্টাক্ট গ্রুপের সদস্যরা। ওআইসির অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল এএমবি সামির বাকর দিয়াবের সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাখদুম শাহ মাহমুদ কোরেশি এবং আজারবাইজান, নাইজার, সউদী আরব এবং তুরস্কের প্রতিনিধিরা এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে ওআইসির পক্ষে থেকে একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওআইসি জম্মু-কাশ্মীরের সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ জানাচ্ছে। অঞ্চলটিতে নির্লজ্জভাবে যে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে তার নিন্দা জানাচ্ছে ওআইসি।

ক্ষুব্ধ শোবিজ তারকারাও
কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে পাকিস্তানের শোবিজ অঙ্গনের তারকারাও মুখ খুলেছেন। কাশ্মীরি জনগণের সাংবিধানিক মর্যাদা কেড়ে নেয়ায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন তারা। পাকিস্তানি অভিনেতা শান শাহিদ টুইটারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গঙ্গাস্নানের একটি ছবি পোস্ট করে লেখেন, ‘গঙ্গায় স্নান করলেই কাশ্মীরে নিহত শহিদদের রক্ত ধুয়ে যাবে না’।

আরেক পাকিস্তানি পরিচালক এবং অভিনেতা হামজা আলি আব্বাসিও নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টে লেখেন, পাকিস্তানের প্রতিটি মানুষ আজ বিক্ষুব্ধ। মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত কাশ্মীরের সব রাজনৈতিক দলকে ভারতের বিরুদ্ধে এক করেছে। সূত্র : এএফপি, ইয়েসি শাফাক, ডন, জিও নিউজ, ইন্ডিয়া টুডে ও সংবাদ প্রতিদিন।

৮ আগস্ট ২০১৯