সন্ধ্যার পিক আওয়ারে চাহিদা বাড়লে বিদ্যুৎ থাকে না—পরিস্থিতি এখন এটুকুতে সীমাবদ্ধ নেই। দেশজুড়ে লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করেছে। মধ্যরাতের পরও দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে গৃহস্থালি কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদন।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, তালিকাভুক্ত ১৪৩টির মধ্যে অন্তত ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানির সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি গ্যাসভিত্তিক, ৩৩টি তরল জ্বালানিভিত্তিক ও দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে গত ২২ জুলাই দুর্ঘটনার পর পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ ১৭ শতাংশের বেশি কমে গেছে। ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
গত সপ্তাহে দৈনিক গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৮২ মেগাওয়াট (মেগাওয়াট), আগের সপ্তাহে যা ছিল ৩২০ মেগাওয়াট।
ঘণ্টাভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, ১ আগস্ট বিদ্যুতের ঘাটতি ২ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। রোববার ভোরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়—ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট।
গতকাল দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ ঘাটতি ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি ছিল।
দীর্ঘস্থায়ী এই ঘাটতির কারণে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে বিভিন্ন এলাকায় পালাক্রমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে। গ্রীষ্মজুড়ে যে স্বল্প সময়ের লোডশেডিং ছিল, তার বদলে এখন দিনে-রাতে নির্দিষ্ট বিরতিতে গ্রাহকদের বারবার দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ এলাকায়, বিতরণ কোম্পানিগুলোকে যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ সীমিত রাখতে হচ্ছে।
ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার একটি চালকলের মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, গতকাল অন্তত সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না।
‘কর্মচারীদের আরেকটি দিন অলস বসে কাটাতে হয়েছে। বিদ্যুৎ আমাদের উৎপাদনের প্রধান উৎস। গ্রীষ্মকালে দুই-তিন ঘণ্টার লোডশেডিং স্বাভাবিক ঘটনা ছিল, কিন্তু গত কয়েক দিনে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে,’ বলেন তিনি।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় কৃষক ও সেচনির্ভর ব্যবসার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।
কুমিল্লার মাছচাষি রহমত উল্লাহ জানান, মধ্যরাতের পর তিনি পাম্প চালাতে পারলেও বেশির ভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না।
তিনি আরও বলেন, ‘একটি পুকুরের পানি দ্রুত সেচে ফেলা জরুরি। সাধারণত এক রাতেই কাজটি হয়ে যায়। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে গত তিন রাত ধরে পাম্প চালাতে হচ্ছে।’
সেচে ফেলার পর মাছ ধরার জন্য শ্রমিকদের পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পুরো কাজ বিলম্বিত হয়েছে, জানান তিনি।
শিল্পখাতেও এই সংকটের চাপ স্পষ্ট।
আগে থেকেই গ্যাসের চাপের কম ছিল। এই সমস্যার মধ্যে কারখানাগুলোকে এখন বিদ্যুৎ সংকটও সামাল দিতে হচ্ছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে, উৎপাদনসূচি পরিবর্তন করতে কিংবা লোডশেডিংয়ের সময় ডিজেলচালিত জেনারেটর চালাতে বাধ্য হচ্ছে।
রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট মানে উৎপাদন সময়ের ক্ষতি ও ব্যয় বৃদ্ধি। এমন এক সময়ে এই সংকট, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় যখন উদ্যোক্তারা আগে থেকেই চাপে রয়েছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দোকান, রেস্তোরাঁ, ওয়ার্কশপসহ বিদ্যুৎনির্ভর অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনশীল সময় হারাচ্ছে।
পিজিসিবির তথ্য অনুসারে, দেশের আটটি বিভাগেই লোডশেডিং চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ঢাকা বিভাগে। সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ সংকটে পড়েছে।
বেশি ঘাটতির তালিকায় রয়েছে ময়মনসিংহ, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর।
বিদ্যুতের ঘাটতি কমাতে ব্যয়বহুল উৎসের দিকে যেতে হচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি)।
পিডিবির উৎপাদনবিষয়ক সদস্য জহুরুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে আগে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ হতো, বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ আগের ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি থেকে কমে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট থেকে কমে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।
তিনি জানান, গ্যাস সংকটে বিদ্যুতের এই ঘাটতি পূরণে পিডিবি এখন ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেষ্টা করছে।
পরিস্থিতি এতটাই সংকটাপন্ন যে, চাহিদার সর্বোচ্চ সময়ে (পিক আওয়ার) পিডিবিকে ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রও চালাতে হচ্ছে।
জহুরুল বলেন, ‘আমাদের ডিজেলচালিত খুব বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র নেই—সৈয়দপুর ও খুলনায় কেবল দুটি রয়েছে। সেগুলোও চালাতে হচ্ছে। যা আছে, সবই আমরা চালাচ্ছি। উচ্চ ব্যয়ের কারণে সাধারণত ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো হয় না।’
এদিকে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লাভিত্তিক পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায় অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে। এসএস পাওয়ার, রামপাল ও পটুয়াখালীসহ আরও কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লার সংকট বা রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
জহুরুল বলেন, ‘কয়লা সরবরাহে কিছু সমস্যা রয়েছে এবং সীমিত আকারে সরবরাহ চলছে।’ তার ভাষ্য, সবচেয়ে বেশি চাপ বাড়িয়েছে গ্যাস ও তরল জ্বালানির সংকট।
এর প্রভাব সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। গতকাল বিকেল ৫টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ২০১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। এই সময়ে চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৬৪ মেগাওয়াট। ফলে ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি থেকে যায়।
পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় ছিল ৭ টাকা ৭১ পয়সা। সাম্প্রতিক অন্য দিনগুলোতে এটি ছিল প্রায় ৫ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৬ টাকা ৫০ পয়সার মধ্যে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা বলেন, আগামী ১০ আগস্টের পর ক্ষতিগ্রস্ত ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটের (এফএসআরইউ) অর্ধেক অংশ পুনরায় চালু করতে পারলে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে।
‘তবে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হতে আরও কিছু সময় লাগবে,’ যোগ করেন তিনি। (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার)
চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/
৩ আগস্ট ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur