এক বুক আশা আর দুশ্চিন্তার দোলাচল নিয়ে সোমবার সকালে কুমিল্লার এক পশুর হাটে এসেছিলেন এক সাধারণ খামারি। সঙ্গে ছিল তাঁর অতি আদরের, নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করা এক বিশাল আকৃতির গরু। ১৭ থেকে ১৮ মণের এই শান্ত অবলা প্রাণীটি শুধু তাঁর গোয়ালের পশুই ছিল না, ছিল দীর্ঘদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি আর বহু স্বপ্নের প্রতীক। আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বিশাল আকৃতির এই গরুটির দাম তিনি হেঁকেছিলেন ৭ লাখ টাকা।
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার পাচকিত্তা এলাকার বাহেরচর গ্রাম থেকে বিক্রির উদ্দেশ্যে গরুটি নিয়ে আসা হয়েছিল স্থানীয় বাজারে। সকাল থেকেই হাটুরেদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এটি। বাজারের অন্য সব গরুর চেয়ে এর আকার, উচ্চতা আর রাজকীয় শারীরিক গঠন ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। হাটে আসা শত শত মানুষ গরুটিকে একনজর দেখতে ভিড় জমায়। কেউ কেউ তার পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করে দিচ্ছিল, কেউবা আবার বিস্ময়ভরা চোখে মুঠোফোনে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই ভিড়ের মাঝে গরুর মালিক হৃদয় খান খুঁজছিলেন এমন একজনকে, যিনি তাঁর এই যত্নে বড় করা প্রাণীটির কদর বুঝবেন।
দিন গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। হাটের কোলাহল বাড়ল, কিন্তু খামারির মনের ভেতরের শূন্যতা যেন আরও ঘনীভূত হতে থাকল। উৎসুক জনতার ভিড় থাকলেও, ৭ লাখ টাকার বিশাল অংকের কথা শুনে কোনো ক্রেতাই কেনার সাহস দেখাননি। এমনকি কেউ একজন এগিয়ে এসে একটু দর কষাকষি করবেন, সেই সান্ত্বনাটুকুও পাননি তিনি।
বাহেরচর গ্রামের খামারি হৃদয় খান আক্ষেপ করে বলেন, “সকাল থেকে একটা আশায় বসে ছিলাম। কত মানুষ আসলো, দেখলো, ছবি তুললো। কিন্তু কেউ একটা বারের জন্যও দামাদামি করতে এগিয়ে আসলো না। এতো সাধের গরুটা কেউ নিতে পারলো না, এই কষ্ট বোঝানো যাবে না।”
বিকেলের সূর্য যখন পশ্চিমে হেলে পড়ছিল, তখন হাটের অন্য সব ছোট-মাঝারি গরু বিক্রি হয়ে একে একে খালি হয়ে যাচ্ছিল। অথচ সবার নজর কাড়া সেই বিশাল গরুটি এক কোণে দাঁড়িয়ে শান্ত চোখে তাকিয়ে ছিল তার মালিকের দিকে। দিনশেষে কোনো ক্রেতা না পেয়ে, এক বুক হতাশা আর ক্লান্ত শরীর নিয়ে গরুটি আবারও বাড়ির চেনা গোয়ালেই ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হন তিনি।
স্থানীয় মানুষেরা জানান, বড় গরুর প্রতি ক্রেতাদের একটা অন্যরকম মোহ বা আকর্ষণ সবসময়ই থাকে। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের সীমিত ক্রয়ক্ষমতার কারণে শখ আর সাধ্যের মধ্যে এক বিশাল দেয়াল তৈরি হয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের পক্ষে এককভাবে এতো বড় অঙ্কের টাকা খরচ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বড় গরু হাটে নিয়ে আসার পেছনে খামারিদের যেমন বিশাল খরচ থাকে, তেমনি অবিক্রীত থাকলে তাদের লোকসানের বোঝাও ভারী হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল একটি গরু বিক্রি না হওয়ার গল্প নয়, এটি বর্তমান বাজার বাস্তবতার এক নির্মম চিত্র। খামারিদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর ভালোবাসার একটা আর্থিক মূল্য অবশ্যই আছে, তবে ক্রেতাদের পকেটের অবস্থার কথা চিন্তা করে যদি দামের সামঞ্জস্য না রাখা হয়, তবে এমন মন খারাপ করা দৃশ্য আরও দেখতে হতে পারে। হৃদয় খানের মতো হাজারো খামারি এখন তাকিয়ে আছেন ঈদের শেষ মুহূর্তের বাজারগুলোর দিকে। তারা আশা করছেন, হয়তো কোনো সহৃদয় ক্রেতার সাধ্য আর খামারির স্বপ্নের একটা সুন্দর মিলন ঘটবে, আর দিনশেষে হাসিমুখে বাড়ি ফিরবেন তারা।
=> জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল, কুমিল্লা: ২৬ মে ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur