হাইমচরে লোডশেডিংয়ে জনজীবন চরম ভোগান্তি
চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে রাতের লোডশেডিং জনজীবনে চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রায় প্রতিদিনই রাত ১১টার পর বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে রাত ২টা, ৩টা কিংবা তারও পরে বিদ্যুৎ ফিরে আসে। ফলে গভীর রাতে অসহনীয় গরম, মশার উপদ্রব এবং নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, দিনে কিছু সময় লোডশেডিং হলেও রাতের বেলায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা সবচেয়ে বেশি কষ্টের। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে মানুষ যখন একটু স্বস্তিতে বিশ্রাম নিতে চান, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তাদের ঘুম ব্যাহত হয়। অনেকেই রাতভর জেগে থাকতে বাধ্য হন। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, অসুস্থ রোগী এবং গর্ভবতী নারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্তমানে গরমের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি। ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলে ঘরের ভেতর অসহনীয় পরিবেশ তৈরি হয়। অনেক পরিবার জানিয়েছে, গভীর রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর শিশুদের কান্না থামানো কঠিন হয়ে পড়ে। বৃদ্ধ ব্যক্তিরা শ্বাসকষ্ট ও অস্বস্তিতে ভোগেন। ফলে একটি পুরো পরিবার রাতভর দুর্ভোগের মধ্যে সময় কাটাতে বাধ্য হয়।
শিক্ষার্থীদের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেক শিক্ষার্থী রাতের সময় পড়াশোনা করতে অভ্যস্ত। কিন্তু রাত ১১টার পর বিদ্যুৎ চলে গেলে তাদের পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। যারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদের জন্য বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার কারণে অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করতে পারছে না।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগও কম নয়। অনেক ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ চলে গেলে ফ্রিজ, ফ্রিজার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। এতে ব্যবসায়িক ক্ষতির পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সংরক্ষণেও সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে আইসক্রিম, ঠান্ডা পানীয় ও হিমায়িত খাদ্য বিক্রেতারা বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হন।
ফ্রিল্যান্সার, অনলাইন উদ্যোক্তা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাও সমস্যায় পড়ছেন। বর্তমানে গ্রামীণ এলাকাতেও অনেক তরুণ অনলাইনে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। গভীর রাতে অনেক আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকলে ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল হয়ে যায় অথবা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে কাজের ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
স্থানীয়দের দাবি, লোডশেডিং যদি অনিবার্যও হয়, তবে অন্তত একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি থাকা উচিত। কারণ হঠাৎ করে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে মানুষ কোনো ধরনের প্রস্তুতি নিতে পারে না। অনেকেই অভিযোগ করেন, কখন বিদ্যুৎ যাবে আর কখন আসবে সে বিষয়ে কোনো পূর্বঘোষণা থাকে না। ফলে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয় সবাইকে।
এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, প্রতিদিন রাত ১১টার পর বিদ্যুৎ চলে যাওয়া যেন একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। অনেক সময় রাত ২টা কিংবা ৩টার আগে বিদ্যুৎ ফিরে আসে না। আবার কোনো কোনো দিন এর চেয়েও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে।
বিদ্যুৎ শুধু একটি সুবিধা নয়, আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অংশ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি—সবকিছুই বিদ্যুতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই নয়, সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পড়ে।
এ অবস্থায় হাইমচরের সচেতন নাগরিকরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তারা দ্রুত সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। প্রয়োজনে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, অবকাঠামোগত সংস্কার এবং নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
জনগণের প্রত্যাশা, হাইমচরের মানুষ যেন অন্তত রাতের বেলায় স্বস্তিতে ঘুমাতে পারেন, শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে পড়াশোনা করতে পারে এবং সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। তাই রাতের লোডশেডিং সমস্যা সমাধানে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
—আফতাবুল ইসলাম মেহেরাব, ২৫ জুন ২০২৬