চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে পুলিশের নিয়মিত টহল চলাকালে ডাক শুনে পালাতে গিয়ে লতিফগঞ্জ মাদ্রাসার নৈশ্য প্রহরী তারেক আহত হয়েছেন।
বুধবার (১৫ এপ্রিল ২০২৬) দিবাগত রাত প্রায় ১টার দিকে উপজেলার গুপ্টি পশ্চিম ইউনিয়নের লতিফগঞ্জ ইসলামীয় ফাজিল মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে।
আহত নৈশ্য প্রহরী তারেক হোসেন(৩০) মাদ্রাসার পাশের চৌধুরী বাড়ির মৃত রফিকুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চুরির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় পুলিশ নিয়মিত টহল জোরদার করে। এরই অংশ হিসেবে ডিউটিরত এএসআই মাসুদ রানা সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে লতিফগঞ্জ মাদ্রাসার সামনে গিয়ে নৈশ্য প্রহরী তারেক হোসেনকে তলব করেন। তবে তিনি সেখানে উপস্থিত না থাকায় তার মোবাইলে যোগাযোগ করা হয়। পরে তারেক মাদ্রাসার গেটের ভেতরে এসে দাঁড়ালে পুলিশ তাকে গেট খুলতে বললে সে হঠাৎ দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় মাদ্রাসার পেছনের দেয়াল টপকাতে গিয়ে গেটের ধারালো লোহার শিকে তার হাত গুরুতরভাবে কেটে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায়ও তিনি দৌড়ে পাশের একটি বাড়ির আঙিনায় ঢুকে পড়ে। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শাহজাহান মিয়া জানান, রাত দেড়টার দিকে তারেক আমাকে ডাকলে আমি বাইরে এসে দেখি পুলিশ তাকে ধরে রেখেছে এবং তার হাত থেকে রক্ত ঝরছে। এসময় তারেক পানি খেতে চায়। আমি ঘর থেকে পানি এনে তাকে পানি খাওয়াই এবং একটি গামছা দিয়ে রক্তপাত বন্ধের চেষ্টা করি। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে মেডিকেল নিয়ে যায়। পরে জানতে পারলাম সে পালাতে গিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।
লতিফগঞ্জ বাজারের নৈশ প্রহরী আব্দুল মান্নান জানান, পুলিশ রাত্রিকালীন ডিউটি পালনকালে বাজারে আসে। আমিসহ পুলিশ সদস্যরা রাতে বাজারে এক সাথে চা খেয়েছি। পরে তারা মাদ্রাসার সামনে এসে নাইটগার্ড তারেককে ডাকাডাকি করে, তার সাড়াশব্দ না পেয়ে তার মোবাইলে ফোন দিয়ে ডেকে আনেন। এ সময় তাকে মাদ্রাসার গেট খোলার জন্য বললে, সে সকাল ৬টার আগে গেট খুলতে পারবে না বলে জানয় পুলিশকে। পরে পুলিশ দেয়াল ডিঙ্গিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে বলার সাথে সাথেই তারেক দৌড় দেয় এবং মাদ্রাসা পেছন দিয়ে দেয়াল ডিঙ্গিয়ে পালানোর সময় অসাবধানতা বশত তার হাত কেটে গুরুতর আহত হয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
স্থানীয় লোকজন জানান, তারেক মাদ্রাসার নাইটগার্ডের চাকরির আড়ালে এলাকায় মাদক ব্যবসা ও মাদক সেবন ছাড়াও চুরি, ছিনতাই, নারী কেলেঙ্কারিসহ সকল অপরাধের সাথে জড়িত রয়েছে। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে থানায় একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে উপজেলা শিক্ষা অফিসসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে একাধিক অভিযোগ দিয়েও কোন প্রতিকার পায়নি।
তারেক হোসেনের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। তাদের ঘরে তালা দেয়া অবস্থায় পাওয়া গেছে। তারেকের বক্তব্যের জন্য মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও
তার মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় বিএনপি নেতা ফারুক হোসেন বলেন, সে যদি অপরাধী না হোতা তাহলে পুলিশ রাতে মাদ্রাসার গেইট খুলতে বালায় পালাতো না। সে খুব খারাপ ছেলে। সে রাতে মাদ্রাসায় নৈশ্য প্রহরীর কাজের নামে নানান অপকর্মের সাথে জড়িত। তাকে একাধিকবার সতর্ক করলেও সে নিজেকে সুদরাতে পারেনি। আমরা তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাবো তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্য
কামরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, নৈশ্য পহরি তারেক অত্যন্ত নোংরা ও দুষ্টু প্রকৃতির ছেলে। এইরকম একটা বাজে ছেলে কি করে একটি সুনামধন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে এটা আমাদের বোধগম্য নয়। সে লম্পট ও মাদকের সাথে জড়িত। সে মাদ্রাসায় বসে মাদক সেবন করে। তাকে মাদ্রাসা থেকে অপসারণ করে মাদ্রাসা সুনাম রক্ষা করা উচিৎ।
নুহু চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, তারেক আমাদের বাড়ির ছেলে। সে মাদ্রাসার মানসম্মান নষ্ট করছে। সে এলাকায় বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িত। গতকাল রাতে কি হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি সকালে শুনেছি সে পুলিশ দেখে পালিতে গিয়ে আহত হয়েছে। সে মাদ্রাসায় বসে গাঁজা ও ইয়াবা সেবন করে এবং নারী কেলেঙ্কারির ও চুরির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক জানান, আমরা দূরবর্তী এলাকা থেকে এসে এখানে শিক্ষকতা করি। আমাদের মাদ্রাসার অধ্যক্ষ স্যার তার বিরুদ্ধে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে
একাধিক লিখিত অভিযোগ দিয়েও তার বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছেনা তা নিয়ে আমরা শংকিত।
মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা মো. আমীর হোসেন বলেন, তারেকের বিরুদ্ধে আগে থেকেই নানা অভিযোগ রয়েছে। তার বিভিন্ন অপকর্মের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ইতিপূর্বে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। সে অঙ্গীকারনামা দিয়েও তা রক্ষা করেনি। বরং ১৫ এপ্রিল গভীর রাতে পুলিশ দেখে পালাতে গিয়ে আহত হয়েছে। এরপর সকালে পুলিশ তার কক্ষ তল্লাশি করে একটি ধারালো অস্ত্র ও মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। আমি বিষয়টি নিয়ে মাদ্রাসার সভাপতি ও সংশ্লিষ্টদের অবগত করবো।
তিনি আরো জানান, নৈশ্য প্রহরী তারেক বিরুদ্ধে ফরিদগঞ্জ থানায় ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেও কোন প্রতিকার হয়নি। সে কয়েকবার অঙ্গীকার করেও সঠিক পথে আসেনি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মাসুদ আলম বলেন, পুলিশ দেখে পালাতে গিয়েই সে আহত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ আছে। গত কয়েক দিন পূর্বে এক প্রবাসীর স্ত্রীর গর থেকে তাকে স্থানীয় লোকজন আটক করেছে। তার বিরুদ্ধে চুরিও অভিযোগ রয়েছে। মাদ্রাসার পাশের বাড়ি হওয়ায় সে কাউকে পাত্তাও দেয় না। আমি যদি কোন ধরনের অপরাধি না হই তাহলে পুলিশ ডাকলে পালিয়ে যেতে হবে কেন।
মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা নৈশ্য প্রহরী তারেক বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন বলে, তারেক একটা লম্পট। সে আমাদের মাদ্রাসায় বসে মাদক সেবন করে। এলাকায় চুরি ছিনতাইয়ের সাথে জড়িত। তাকে আমাদের মাদ্রাসা থেকে অপসারণ করে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষা করতে হবে।
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ হেলাল উদ্দিন জানান, “পুলিশের টহল টিম তাকে তলব করলে সে পালানোর চেষ্টা করে এবং দেয়ালে টপকাতে গিয়ে আঘাত পেয়ে আহত হয়। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।”
তিনি আরো জানান, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চুরির ঘটনায় বলা হয়েছে সকাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নৈশ্য প্রহরীকে রাতে তলব করার জন্য। নৈশ্য প্রহরীর পুলিশ দেখে পালাতে গিয়েছে মানেই বুঝতে হবে সে কোননা কোন
অপরাধের সাথে জড়িত ছিল। তাইতো পুলিশ দেখেই দৌড়ে পালাতে গিয়েছে।
এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শুভাকাঙ্ক্ষীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এইরকম একটা খারাপ ছেলে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাকরি করে কি করে। তার বিরুদ্ধে এতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকতেন প্রমাণিত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কতৃপক্ষ কেন তাকে অপসারণ করছে না। এটা আমাদের বোধগম্য হয় না। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আমাদের সুনামধন্য প্রতিষ্ঠান। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার্থে তাকে মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার করার দাবি জানান তারা এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সাথে জড়িত থাকায় তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও করছেন।
প্রতিবেদক: শিমুল হাছান,
১৫ এপ্রিল ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur