চাঁদপুর

সরু হয়ে আসছে চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী ডাকাতিয়া : হুমকিতে আঞ্চলিক নৌ-পথ

অবৈধভাবে দখল হওয়ায় ঐতিহ্য হারাতে বসেছে চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদী। দু’পাড়ে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় দিন দিন সরু হয়ে যাচ্ছে এর তীর। এতে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রবাহমান এই নদীটির গতিপথ। হুমকিতের পড়তে যাচ্ছে শতবর্ষী নৌ

তাই ডাকাতিয়াকে রক্ষার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীসহ পরিবেশ আন্দোলনকারীরা। অবশ্য, অবৈধ এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীটি রক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

মেঘনা মোহনা থেকে উৎপত্তি হয়ে চাঁদপুর জেলা শহরকে নতুনবাজার ও পুরাণবাজার নামে বিভাজন করেছে এই ডাকাতিয়া নদী। চৌধুরী ঘাট, ১০ নম্বর ঘাট এবং পুরানবাজার এলাকায় ঐতিহ্যবাহী এ নদীর তীর দখল করে অবৈধভাবে অসংখ্য দালান, দোকানপাটসহ নানা স্থাপনা গড়ে তুলেছে প্রভাবশালীরা।

এতে ৬শ’ থেকে ৮শ’ ফুট প্রস্থ এই নদী এখন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। সরু হয়ে যাওয়ায় শুষ্ক নয়, ভরা বর্ষা মৌসুমেও ডাকাতিয়ায় লঞ্চসহ নানা নৌ-যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

এ অবস্থায়, ডাকাতিয়ার গতি প্রবাহ এবং ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীসহ পরিবেশবিদরা।

তবে, বিষয়টি অস্বীকার করে বিআইডাব্লিউটিএ বলছে, অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। শিগগিরই তাদের নোটিশ দেয়া হবে।

কয়েক বছর আগেও ডাকাতিয়া নদী ছিলো খরস্রোতা। তে সে চিত্র এখন আর নেই। প্রভাবশালী মহলের যোগসাজসে চলছে দুইতীর ভরাট। আর সেখানে গড়ে ওঠেছে ইট ও বালু ব্যবসা।

এদিকে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে মাসোহারা (মাসিক ঘুষ) দিয়ে ব্যবসা করার কথা জানান ব্যবসায়ীরা।

বরাবরের মতোই বিষয়টি অস্বীকার করেছে চাঁদপুর বিআইডব্লিউটিএ। ডাকাতিয়া নদীতে বহুতল ভবনসহ দুইশ’রও বেশি ছোট বড় অবৈধ স্থাপনার তালিকা করা হয়েছে জানিয়ে বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা বলেন, শিগগিরই এসব স্থাপনার মালিকদের নোটিশ দেয়া হবে।

নদীর দুই তীর দখলের কারণে কমেছে প্রবাহ। ফলে উজানে প্লাবিত এলাকার পরিমান বাড়ছে। ডাকাতিয়া নদীর প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে স্থাপনা উচ্ছেদ করে খননের দাবি চাঁদপুরবাসীর।

অবৈধভাবে দখল হওয়ায় ঐতিহ্য হারাতে বসেছে চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদী। দু’পাড়ে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় দিন দিন সরু হয়ে যাচ্ছে নদীর তীর। এতে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রবহমান এই নদীটির গতিপথ। অবৈধ এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীটি রক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা ।

বন্দর কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক জানান, দখলদারদের একটি তালিকা এরইমধ্যে করা হয়েছে। তাদেরকে নোটিশ দেযার বিষয়টি চলমান প্রক্রিয়ায় রয়েছে। প্রসাশনের হিসেব মতে ডাকাতিয়ার পাড়ে দু’শতাধিক অবৈধ স্থাপনা রয়েছে।

ডাকাতিয়ার পরিচয় ও ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, ডাকাতিয়া নদী মেঘনার উপনদী। নদীটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লা জেলার বাগসারা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং পরবর্তীতে চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছ। নদীটি কুমিল্লা-লাকসাম চাঁদপুর হয়ে মেঘনা নদীতে মিশেছে। যা লক্ষ্মীপুরের হাজিমারা পর্যন্ত বিস্তৃত। দৈর্ঘ্য-২০৭ কিলোমিটার। মেঘনা নেয়াাখালীতে প্রবেশের পর ডাকাতিয়া নাম ধারণ করেছে। যার দক্ষিণের অংশ নোয়াখালী খাল হিসেবে প্রবাহিত।

চাঁদপুর থেকে এ ডাকাতিয়া নদী যোগ হয়েছে কুমিল্লার গোমতির সঙ্গে। গোমতি থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয় ফেনী নদীতে মিশেছে।

নামকরণের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, একসময় এ নদী দিয়ে মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেলায় প্রবেশ করতো। এই নদীতে তাদের মাধ্যমেই ডাকাতি হতো। ডাকাতির উপদ্রবের কারণে নদীটির নাম ডাকাতিয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তৎকালীন কলকাতাস্থ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাউন্সিলের পক্ষে কোর্ট অব ডিরেক্টর সভার কাছে ১৭৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ জানয়ারি পেশকৃত একটি চিঠির মাধ্যমে জলদস্যুদের উপদ্রবের চিত্র পাওয়া যায়।

ডাকাতিয়া নদীর নামকরণ নিয়ে লোকমুখে আরেকটি মতামতও শোনা যায়, একসময় ডাকাতিয়া নদী তীব্র খরস্রোতা ছিল। মেঘনার এ শাখা নদী ডাকাতিয়ায় মেঘনার উত্তাল রূপ ফুটে উঠত। ফলে ডাকাতিয়ার করালগ্রাসে নদীর দুই পাড়ের মানুষ সর্বস্ব হারাতো। ডাকাতিয়াা পাড়ি দিতে গিয়ে বহু মানুষের সলিল সমাধিও ঘটেছে। ডাকাতের মতো সর্বগ্রাসী বলেই এর নাম হয়েছে ডাকাতিয়া।

চাঁদপুর টাইমস রিপোর্ট
১৫ নভেম্বর, ২০১৮

Share