Home / সারাদেশ / চোখের সামনেই পদ্মায় বিলীন তিনতলা বাড়ি
চোখের সামনেই পদ্মায় বিলীন তিনতলা বাড়ি

চোখের সামনেই পদ্মায় বিলীন তিনতলা বাড়ি

পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙনে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় শত শত ঘরবাড়ি ও বড় বড় স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে ৪ হাজারেরও বেশি পরিবার সহায় সম্বলহীন হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নে তিনতলা একটি ভবন ভেঙে পদ্মায় বিলীন হওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

শরীয়তপুর জেলায় প্রায় আড়াই লাখ মানুষের এই উপজেলাটিই এখন নদী ভাঙনের কারণে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়েছে। গত আড়াই মাস ধরে চলা নদী ভাঙন পুরো উপজেলার মানুষের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, বছরের পর বছর নদী শাসন বা খনন না করায় এবার পদ্মা নদীর ভাঙন অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অনেক দেরিতে নদী শাসনের প্রকল্প অনুমোদনের পর এর কাজ শুরু করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন নদীর স্রোত কমা বা ভাঙন বন্ধ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

পদ্মায় বিলীন হওয়া ভবনটিতে ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি ক্লিনিক ছিল। ভবনটির মালিকের ছেলে সোহেল হোসেন দেওয়ান জানান, দুই মাস আগে তাদের বসবাসের দোতলা বাড়ি প্রথমে নদীতে বিলীন হয়ে যায়। তখন তারা নদী থেকে ৩০০ মিটার দূরে তাদেরই একটি তিনতলা ভবনে উঠেছিলেন। সেটিও কয়েকদিন আগে নদীতে বিলীন হয়ে যায়। সর্বশেষ তাদের ক্লিনিকের ভবনটিও নদীগর্ভে বিলীন হলো।

সোহেল হোসেন দেওয়ান বলেন, ‘এখন তো আমাদের যে পরিস্থিতি, আগে আমরা দুই ডলা-ভাত ভালোভাবেই খেতাম। এখন আমাদের খাওয়া দাওয়াই মুশকিল হয়ে যাবে। পথের ভিখারি হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা আমাদের।’

নদী থেকে নিরাপদ দূরত্বে চারতলা বাড়ি করে তাতে ১২ বছর ধরে বসবাস করছিল একটি পরিবার। সেই পরিবারের রোকসানা বেগম বলেন, ‘বাড়ি-ঘর যা ছিল, সব শ্যাষ। আমার চারতলা বাড়ি ছিল, তাও শ্যাষ। অনেক কষ্ট করে বাড়ি-ঘর করছিলাম। এখন আমার কিছুই নাই। থাকার কোনো রাস্তা নাই। অনেক কষ্ট এখন।’

নড়িয়া উপজেলার বসবাসকারী বেশিরভাগ পরিবারের পুরুষ সদস্য বা কর্তারা কাজের জন্য ইটালি থাকেন বা থাকতেন। তাদের পাঠানো অর্থে পরিবারগুলো তিন বা চারতলা বাড়ি করেছে। গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সেখানে এই পরিবর্তন হয়েছে। এমন অনেক বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় সে সব পরিবারের জায়গা হয়েছে রাস্তার ধারে।

তাদের একজন আকলিমা বেগম জানান, এক রাতেই তাদের বসতবাড়ি নদীতে চলে যায়। এখন তারা রাস্তার ধারে টিনের ছাপড়া করে থাকেন।

আরেকজন নারী জোবেদা বেগম জানান, তিনি তার ঘরের কোনো জিনিসপত্র সরানোর সুযোগ পাননি। চোখের সামনে এক দশকের বসতভিটা নদীতে বিলীন হওয়ার দৃশ্য তিনি ভুলতে পারেন না।

শুধু বাড়ি-ঘর নয়, স্কুল ভবন, বাজারসহ অনেক স্থাপনাই পদ্মায় হারিয়ে গেছে। এখন পুরো উপজেলাটিই হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

নড়িয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমাদের উপজেলার পৌরসভার একটা অংশ তো নদীগর্ভে চলেই গেছে। এখন আমাদের খাদ্য গুদামেরও খুব কাছে নদী। আমার হেডকোয়ার্টার থেকে আধা কিলোমিটারের মধ্যে নদী। মূলফৎগঞ্জ নামের একটি বাজার আছে, এই বাজারের একাংশে এখন নদী। সেখানেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

স্থানীয়ভাবে নদীর ভাঙন প্রতিরোধ করার দাবিতে আন্দোলন গড়ে উঠেছে। সেই আন্দোলনের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ জানান, পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজের জেরে নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করছে বলে তারা ধারণা করছেন। সে কারণে এ বছর ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘অনেক আগে যখন ভাঙছে, একবার ভাঙলে তিন চার বছর আর ভাঙে নাই। শিমুলিয়াতে এখন একটা ডকইয়ার্ড করেছে। সেখানে আগে পুরোপুরি নদী ছিল। পদ্মা সেতুর জন্য ভরাট করে ওই ডকইয়ার্ডটা করেছে। সে জন্য ভাটির দিকে চর পড়েছে। ফলে নদী তার গতি পরিবর্তন করে নড়িয়া ও জাজিরার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে।’

তবে এমন বক্তব্য মানতে নারাজ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, ওই অঞ্চলে ভাঙন রোধে নদী শাসনের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন পেতে দুই বছর সময় লেগেছে। এখন তাৎক্ষণিকভাবে বালুর বস্তা ফেলে নদীর ভাঙন কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আর প্রকল্পের কাজ শুরু করার জন্য তারা ভাঙন বন্ধ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

(বিবিসি বাংলা)
বার্তা কক্ষ
৭ সেপেটম্বর,২০১৮

Leave a Reply