কওমি মাদরাসা শিক্ষার সংকট ও উত্তরণের পথ
প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী কওমী মাদরাসায় ভর্তি হয়। অভিভাবকরা স্বপ্ন দেখেন—তাদের সন্তান বড় আলেম, হাফেজ হবে, দ্বীনের প্রচারে নিজেকে উৎসর্গ করবে। কিন্তু বাস্তবে মাদরাসা শিক্ষা নানাবিধ সংকটে জর্জরিত। এসব সংকট চিহ্নিত করে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করা জরুরি।
১. ভর্তি প্রক্রিয়ায় অভিভাবকদের প্রতি আচরণ
অনেক মাদরাসায় ভর্তির সময় অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষাবান্ধব আচরণ করা হয় না। কোথাও কোথাও আচরণ ভালো হলেও সংখ্যায় তা নগণ্য। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সম্মান ও সৌজন্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
২. আবাসন ও অবকাঠামো সংকট
শ্রেণিকক্ষ ও আবাসন: অনেক মাদরাসায় ক্লাসরুম ও আবাসন একই জায়গায়। পড়ার জন্য আলাদা চেয়ার-টেবিল নেই, ঘুমানোর জন্য খাট নেই—শিক্ষার্থীদের মেঝেতে থাকতে হয়। হাদিস বা কোরআন শিক্ষার পবিত্রতাকে পুঁজি করে এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশকে বহাল রাখা হয়।
পৃথকীকরণের প্রয়োজন: ক্লাসরুম ও আবাসন পৃথক করতে হবে। সুন্দর পড়ার পরিবেশ ছাড়া মনোযোগ ও স্বাস্থ্য দুটোই নষ্ট হয়।
নারী ও বালিকা মাদরাসা: এগুলোর আবাসন সংকট আরও তীব্র। অনেক মাদরাসা ঘরোয়া পরিবেশে চালানো হয়, যেখানে পর্যাপ্ত ক্লাসরুম নেই, থাকার স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থা নেই।
৩. পাঠ্যবই ও আলোক ব্যবস্থা
অনেক মাদরাসায় এখনো পুরোনো হাতে লেখা কিংবা সনাতন পদ্ধতির কিতাব ব্যবহার করা হয়। কম্পিউটার কম্পোজ ও আধুনিক ছাপানো কিতাবের ব্যবস্থা নেই। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য ফি কম রাখা ভালো দিক, কিন্তু কিতাবের গুণগত মান উন্নত না করায় চোখের ক্ষতি হয়। উপরন্তু আবাসিক হলে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় পড়ালেখা স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। ফলে শিক্ষার্থীরা হীনম্মন্যতায় ভোগে ও শারীরিকভাবে দুর্বল হয়।
৪. খাবারের ব্যবস্থা ও আর্থিক স্বচ্ছতা
অনেক মাদরাসা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত অর্থ নিলেও মানসম্মত খাবার দেয় না। লিল্লাহ বোর্ডিং ও টাকাওয়ালা শিক্ষার্থীদের একই রান্না করে গুণগত মান কমিয়ে দেওয়া হয়। অনৈতিকভাবে শিক্ষকদের খাবার শিক্ষার্থীদের টাকা থেকে করানো হয়। মাদরাসার সাধারণ তহবিল থেকে শিক্ষকদের খাবারের ব্যবস্থা করা উচিত। ধনী বা জাকাত দিতে সক্ষমদের লিল্লাহ বোর্ডিং থেকে খাবার দেওয়া উচিত নয়।
৫. প্রযুক্তি ব্যবহার ও যোগাযোগের অধিকার
মাদরাসায় মোবাইল ও প্রযুক্তি ব্যবহার সীমিত বা নিষিদ্ধ করা শিক্ষার জন্য ভালো হলেও অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা নেই। মাদরাসার পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময়ে কল করার সুবিধা রাখা দরকার।
৬. ছুটি ও পারিবারিক উৎসবে কঠোরতা
ছুটি ও পারিবারিক উৎসবে কড়াকড়ি করে সারা বছর পড়ালেখা চালিয়ে গেলে শিক্ষার্থীরা অনুপ্রেরণা হারায়, ডিপ্রেশন ও চাপে থাকে। প্রয়োজনীয় ছুটি ও বিনোদন শিক্ষার গতিশীলতা বাড়ায়।
৭. খেলাধুলা ও বিনোদনের অভাব
অধিকাংশ মাদরাসায় পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই, ভ্রমণ বা আনন্দঘন পরিবেশ নেই। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখাকে কৃতিত্ব মনে করলে শিক্ষার্থীরা হীনম্মন্য হয়ে বড় হয়, সমাজের সঙ্গে মিশতে পারে না। অথচ মাদরাসার মূল লক্ষ্য সমাজকে ইসলামের শিক্ষা দেওয়া।
৮. শিক্ষকদের বেতন ও বৈষম্য
শিক্ষকদের বেতন অপ্রতুল; সংসার চলে না। অথচ মাদরাসা কর্তৃপক্ষ নিজেরা মোটা বেতন ও সুবিধা নিয়ে সাধারণ শিক্ষকদের বঞ্চিত করে। পরিবারতন্ত্র বা রাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মাদরাসা দখল করে প্রবীণ ও যোগ্য শিক্ষকদের বিদায় করে অযোগ্য বন্ধু-বান্ধব নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে পড়ালেখার মান ক্ষুণ্ণ হয়, শিক্ষকদের মধ্যে মনোমালিন্য ও বৈষম্য বাড়ে।
৯. সিলেবাসের পুরোনো ধারা ও দক্ষতার অভাব
অনুবাদনির্ভর পদ্ধতি: এখনো পুরোনো পদ্ধতিতে শুধু অনুবাদনির্ভর পড়ালেখা চলে। সৃজনশীল ও চিন্তামূলক পড়ালেখা করানো যেতে পারে।
কর্মমুখী শিক্ষার অভাবে হতাশা: এক যুগ পড়ার পরও শিক্ষার্থীরা কোনো পেশাগত দক্ষতা অর্জন করে না। শিক্ষকতা বা ইমামতি ছাড়া বিকল্প নেই। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় যোগাযোগ দক্ষতা জন্মায় না, লজ্জাবোধ তৈরি হয়।
মাদরাসা থেকে আলিয়ায় পলায়ন: পরীক্ষা ও সনদের বাজারদর কম বলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা কওমী ছেড়ে আলিয়া মাদরাসায় যায়। কিন্তু সেখানেও সায়েন্স এড়িয়ে আর্টসে পড়ে, ফলে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়া সম্ভব নয়। বিসিএস ক্যাডার বা সরকারি চাকরির পথ বন্ধ থাকে।
১০. বক্তা ও প্রতারণার সংস্কৃতি
যেসব শিক্ষার্থী কিতাব ভালোভাবে পড়তে পারেনি, তারা ওয়াজ-মাহফিলের ধান্দায় থাকে। গভীর জ্ঞান ছাড়াই কেবল নবী রাসুলদের শানে মুখরোচক কিচ্ছা বলে সমাজে এক প্রকার বিভ্রান্তি তৈরি করে। অনেকে একাধিক বিয়ে করে তার ফজিলত প্রচার করে ব্যক্তিগত ফায়দা লোটে। এতে মাদরাসার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১১. পরীক্ষানির্ভরতা ও অপ্রাসঙ্গিক সনদ
শুধু পরীক্ষানির্ভর পড়ালেখা; সনদের বাস্তব মূল্য নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা চাকরিবাজারে টিকতে পারে না। অনেকেই হতাশ হয়ে মাদরাসা ছেড়ে দেয়।
উত্তরণের পথ: প্রস্তাবনা
১. আবাসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন: ক্লাসরুম ও আবাসন পৃথক করতে হবে। খেলার মাঠ ও বিনোদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সামর্থ্য না থাকলে দাওরায়ে হাদিস বা মাস্টার্স লেভেল চালু না করাই ভালো। নিজের বাড়িকে মাদরাসা বানানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
২. সিলেবাস সংস্কার ও কর্মমুখী শিক্ষা: একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিটি গঠন করে প্রতি বছর সিলেবাস পর্যালোচনা, সংযোজন ও বিয়োজন করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী দক্ষতা (স্কিল ডেভেলপমেন্ট) যুক্ত করতে হবে। বালিকা মাদরাসায় স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান, শিশু লালন-পালন ও গৃহ ব্যবস্থাপনা আলাদাভাবে সিলেবাসভুক্ত করতে হবে।
৩. মেন্টর ও মনোবল বৃদ্ধি: হতাশা দূর করতে প্রশিক্ষিত মেন্টর বা মুরব্বি নিযুক্ত করতে হবে, যারা স্বপ্ন দেখাবে ও প্রেরণা জোগাবে। অযোগ্য শিক্ষক যারা পড়ালেখার বাইরে জমির দালালি, হজ কাফেলা বা প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত, তাদের বিদায় করতে হবে।
৪. ভাষা ও মৌলিক দক্ষতা: মাতৃভাষা ও আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অনুবাদনির্ভর গাইডের বদলে মৌলিক কিতাব পাঠ চালু করতে হবে।
৫. প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা: মোবাইল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মাদরাসার পক্ষ থেকে অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে শিক্ষার্থীদের উজ্জীবিত করতে হবে; দেশ, জাতি ও রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে।
৬. শিক্ষকদের ন্যায্য বেতন ও স্বচ্ছতা: শিক্ষকদের বেতন যথাযথ ও নিয়মিত করতে হবে। মাদরাসার সাধারণ তহবিল থেকে শিক্ষকদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে; শিক্ষার্থীদের অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করা যাবে না।
৭. পরীক্ষার মান ও সনদের গ্রহণযোগ্যতা: শুধু পরীক্ষা নয়, যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করতে হবে। কওমী সনদের মূল্যায়ন বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ দরকার।
৮. অভিভাবক ও কর্তৃপক্ষের সচেতনতা: ভর্তির সময় অভিভাবকদের সঙ্গে শালীন আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। সীমিত আয়ের মধ্যেও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব।
উপসংহার
ইলমে দীন শুধু অর্থের জন্য নয়, এটি নূর ও চেতনা। এই আলো দিয়ে বিশ্বজয় সম্ভব। কিন্তু পুরোনো নিয়মে আটকে থাকলে মাদরাসা সমাজের কাছে আবেদন হারাবে। সুতরাং যারা মাদরাসা পরিচালনা করেন ও শিক্ষকতা করেন, তাদের দ্রুত সচেতন হতে হবে। যোগ্য আলেম তৈরি করতে পারলেই জাতি ও উম্মাহর কল্যাণ সম্ভব।
লেখক: শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক; পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট
২৮ এ পি ল ২ ০ ২ ৬
এ জি