কবি নজরুলের রচনাবলী তৎকালীন সময়ে ভারতবর্ষে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল : মাইনুল ইসলাম মানিক

চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমির পরিচালক মাইনুল ইসলাম মানিক বলেন, ‘কবি নজরুলের রচনাবলী তৎকালীন সময়ে ভারতবর্ষে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। লেখনির মাধ্যমে তিনি বিশ্বে এখনও বিদ্রোহী কবি,সাম্যের কবি হিসেবেই পরিচিত। সাম্য ও মানবতার বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে তাঁর কবিতায়,গানে ও সঙ্গীতে। তাঁর লেখা প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল চাঁদপুরের কৃতিসন্তান সওগাত সম্পাদক নাসিরউদ্দীনের পত্রিকায়। তখন তিনি সৈনিক হিসেবে করাচি ছিলেন। তাঁর বিদ্রোহী কবিতার পাশাপাশি দাঁড় করানোর মত বাংলা ভাষায় দ্বিতীয়টি নেই। ’

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ বেলা ১২ টায় নজরুল গবেষণা পরিষদ, চাঁদপুরের আয়োজনে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত‘জাতীয় কবি কাজী নজরুলের কর্মময় জীবন ও বাংলা সাহিত্যে অবদান শীর্ষক’ পুরাণ বাজার মধুসূদন উচ্চ বিদ্যালয়ে ১০ ম শ্রেণির শিক্ষার্থী সমন্বয়ে আলোচনা ও কুইজ প্রতিযোগতা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও প্রধান আলোচক হিসেবে উপরোক্ত বক্তব্য প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে সিনিয়র শিক্ষক মো.ওহিদুর রহমান (চলতি দায়িত্ব) এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভাটির উপস্থাপনায় ছিলেন কবি মুহাম্মদ হানিফ,নির্বাহী সদস্য ও প্রোগ্রামার নজরুল গবেষণা পরিষদ।

বক্তাগণ আলোচনায় আরো বলেন, ‘ ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের কোনো এক রাতে ৩-৪ সি, তালতলা, কলকাতা-১৪ লেনের বাড়ির নিচ তলায় দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ঘরে বসে শেষ রাতে নিবিড় পরিবেশে তিনি ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি রচনা করেন। বিদ্রোহী কবিতার প্রথম শ্রোতা তাঁর বন্ধু কমরেড মুজ্জাফর আহমেদ।

তিনি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি ও একজন বাঙালি কবি । একটি বিদ্রোহী কবিতা লিখেই বিদ্রোহীকবি এবং পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি। দেশপ্রেম, মহত্ব, মানুষত্ববোধ, মানুষের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা জাগ্রত করা তাঁর লেখনিতে পাওয়া গেছে। পরাধীনতার শৃংখলে আবদ্ধ থেকে পরাধীনতার বিরুদ্ধে লেখনি,বৃটিশ শাসকদের হুমকি-দমকি উপেক্ষা করেও ক্ষুরদার লেখনি অব্যাহত রাখা, প্রেম-প্রণয়-ভালোবাসায় বিচ্ছেদ, জেল জরিমানা,অর্থভৈববের প্রাচূতাহীন জীবন, দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে থেকেই জীবন-যাপন,প্রথমজীবনে নার্গিসের প্রেমের বিরহ-বেদনা,প্রেয়সী ও পরে স্ত্রী প্রমীলার পক্ষাঘাতজনিত অসুস্থতায় কবিকে সাময়িক বিচলিত হওয়া,সন্তান ও মাতৃবিয়োগেও থেমে যাননি তিনি। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম অগ্রণী বাঙালী কবি,ঔপন্যাসিক,নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও দার্শনিক যিনি বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকা রাখার পাশাপাশি প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্যসর্বাধিক পরিচিত।

১৯২০ সাল হতে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত তাঁর সব রচনা সামগ্রীর সঠিক হিসেব পাওয়া না গেলেও ২ হাজার ৮শ গান, ৯শ কবিত, ১শ টি প্রবন্ধ ৫৫ ডি গ্রন্থ.২৫টি নাটক,১৮টি গল্প, ১শ ৯৪ গজল ও ইসলামী গান ও ৪শ ৫০টি শ্যামা সঙ্গীত রচনা করেন। ১৯৪৩ সাল থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাকরুদ্ধ ছিলেন। তাঁর স্ত্রী প্রমীলা ১৯৩৯ সালে অসুস্থ হন এবং ১৯৬২ সালে ৩০ জুন মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সমাধিস্থল কবির জন্মস্থান চুরুলিয়ায়।

বাংলা ভাষার সাহিত্য গগনে আর কোনো বাংলা ভাষার কবি বা সাহিত্যিক ২০-২১ বছরের এ অল্প সময়ে এতগুলো রচনাবলী কেউ রেখে যান নি । তিনি বাংলা সাহিত্য,কবিতায় সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ দু’বাংলাতেই তাঁর কবিতা,গান ও গজলে সমানভাবে সমাদৃত। তাঁর কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাকে বিদ্রোহী রি’নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাঁর কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার এবং সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা মননে,মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি একাধারে কবি,সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। অগ্নিবীণা হাতে তাঁর প্রবেশ,ধূমকেতুর মতো তাঁর প্রকাশনা। যেমন লেখাতে তিনি বিদ্রোহী,তেমনই জীবনের সব কাজেই “বিদ্রোহী কবি” হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ। তিনি চাঁদপুরসহ ২৩ বার বাংলাদেশে আসেন। তিনি ছিলেন আমাদের কুমিল্লার জামাই। ’

স্বাগত বক্তব্য উপস্থাপন করেন মো.মোশারেফ হোসেন, সভাপতি,নজরুল গবেষণা পরিষদ। বিশেষ অতিথি ও আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন কবি আশিক বিন রহিম পরিচালক, (গ্রন্থকার,সেমিনার ও শিশু সাহিত্য), সাহিত্য একাডেমি। আলোচক ও কুইজ প্রতিযোগিতা উপস্থাপনা করেন আবদুল গনি,সাধারণ সম্পাদক,নজরুল গবেষণা পরিষদ,চাঁদপুর।

বক্তব্য রাখেন সিনিয়র শিক্ষক মো.হোসাইন । অনুষ্ঠান সভাপতি মহোদয়ের সমাপনি বক্তব্য শেষে কুইজ উপস্থাপন এবং পুরস্কার বিতরণ করা হয় ।

নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এ জি