Home / বিশেষ সংবাদ / জাতিসংঘে ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ
BANGABANDHU-

জাতিসংঘে ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ

১৯৭৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে বাংলাদেশ। এ অর্জন মূলত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টির ফসল। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে এটি বড় সাফল্য। বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ও সদস্যপদ অর্জনে জাতির পিতার নিরলস কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও সাফল্যগাথা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এর মাত্র ৮ দিন পর ২৫ সেপ্টেম্বর তৈরি হয় আরও একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বাংলায় এক যুগান্তকারী ভাষণ প্রদান করেন। এ ভাষণটি ছিল বিশ্বের অধিকার বঞ্চিত,নির্যাতিত এবং নিষ্পেষিত মানুষের ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠার ও বিশ্বশান্তির জন্য বলিষ্ঠ উচ্চারণ ও সাহসী পদক্ষেপ।

জাতিসংঘের সেক্রেটারিয়েট থেকে ইংরেজিতে ভাষণ দেওয়ার কথা বলা হলে বঙ্গবন্ধু আগেই জানিয়ে দেন তিনি বাংলায় ভাষণ দেবেন। মাতৃভাষার প্রতি দরদ ও মমত্ববোধ থেকে তিনি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও মুক্তি সংগ্রামে সমর্থনকারী দেশ ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ছিল শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মিলিত সংগ্রাম। তিনি জাতিসংঘের মহান আদর্শ, শান্তি ও ন্যায়বিচারের বাণীর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে বাংলার লাখো শহীদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণপূর্বক বিশ্বশান্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান জানান।

জাতির পিতা তার ভাষণে এশিয়া,আফ্রিকা ও ল্যাটিন অ্যামেরিকার লাখ লাখ মুক্তিকামী মানুষের লড়াই ও ত্যাগের উদাহরণ টেনে বলেন,অন্যায় এখনো চলছে এবং বর্ণবাদও পূর্ণমাত্রায় বিলুপ্ত হয়নি। জনগণের ন্যায়সংগত অধিকার ও বর্ণবাদের অবসান ঘটাতে নতুন বিশ্বব্যবস্থার আহ্বান জানান তিনি। তিনি ফিলিস্তিন,জিম্বাবুয়ে এবং নামিবিয়ার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও মুক্তিসংগ্রামের কথাও বলেন।

বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্যে একদিকে বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন অপর দিকে ক্ষুধায় আক্রান্ত দেশগুলোর জন্য জরুরি সহায়তার কথাও বলেছেন। তিনি অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে প্রতিটি মানুষের জন্য সুখী ও শ্রদ্ধাশীল জীবনের গ্যারান্টির তাগিদও দিয়েছেন।

অনাহার, দারিদ্র্য ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধভাবে ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানান। যে ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বের সমস্ত সম্পদ ও প্রযুক্তি জ্ঞানের ন্যায়সংগত বণ্টনের মাধ্যমে একটি জাতীর কল্যাণের দ্বার উন্মুক্ত হবে যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি সুখী ও সম্মানজনক জীবনের ন্যূনতম গ্যারান্টি পাবে।

অসীম সাহসী ও দৃঢ়চেতা বঙ্গবন্ধু তার ভাষণের বিরাট অংশজুড়ে একদিকে ফ্যাসিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী এবং বর্ণবাদীদের প্রতি সাবধানতার কথা বলেছেন,অপর দিকে শোষিত মানুষের অধিকার ও মুক্তির কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন,‘আমি জীবনকে ভালোবাসি তবে আমি মানুষের মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করতে ভয় পাই না’।

বঙ্গবন্ধু জনগণের অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানান এবং বাংলাদেশসহ আলজেরিয়া এবং ভিয়েতনামের নাম উল্লেখ করে বলেন, এ দেশগুলো অপশক্তির বিরুদ্ধে বিরাট বিজয় অর্জন করেছে। তিনি বলেন, চূড়ান্ত বিজয়ের ইতিহাস জনগণের পক্ষেই থাকে। তিনি সব ন্যায়সংগত জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং মুক্তিসংগ্রামের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেন। মানবিকতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত প্রয়াস গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তিনি রপ্তানিকারক ধনী দেশগুলোকে মোকাবিলায় গরিব দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদও প্রদান করেন।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে এদেশের হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সবার সম্মিলিত রক্তস্রোতে অর্জিত হয়েছে এদেশের মহান স্বাধীনতা। এ ভাষণেই অন্তর্নিহিত ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ও যুদ্ধের প্রস্তুতির নির্দেশনা।

পৃথিবীর ইতিহাসে আজ অবধি অলিখিত এত সুন্দর সুগঠিত অর্থবহ ভাষণ কেউ দিতে পারেনি। তাই তো এ ভাষণ বিশ্বঐতিহ্যের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত হয়েছে। জাতিসংঘে ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভাষণটি ছিল আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে অন্ত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ভাষণ।

সাম্রাজ্যবাদ,ফ্যাসিবাদ এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠায় মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তৃতীয় বিশ্বের সদ্য স্বাধীন দেশের নেতা হয়ে বঙ্গবন্ধু দরাজ কণ্ঠে দৃঢ়তার সঙ্গে যে আবেগময় ভাষণ দিয়েছিলেন সবাই তার প্রশংসা করেছেন।

জাতিসংঘের মহাসচিব কুর্ট ওয়াল্ড হেইম তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃৃতায় আমি সন্তুষ্ট ও আনন্দিত। এ ঐতিহাসিক সম্মেলনে সমাগত অতিথিরা এবং জাতিসংঘের ডেলিগেট বুলেটিন বঙ্গবন্ধুকে কিংবদন্তি নায়ক বলে আখ্যায়িত করে।

১৯৭৪ সালের বিরাজমান স্নায়ুযুদ্ধ ও উত্তর দক্ষিণ বিরাজমান পরিস্থিতি এবং বিশ্বে পরাশক্তির চলমান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অসীম সাহস নিয়ে ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু জোরালো কণ্ঠে বিশ্বের মেহনতি নির্যাতিত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বঞ্চিত মানুষের পক্ষে এ ভাষণ প্রদান করেন। বিশ্বশান্তি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘকে আরও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশের আহ্বান জানান।

জাতির পিতার পথ অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। জাতিসংঘের পরিবেশ,শান্তিরক্ষা,শিক্ষা-স্বাস্থ্য ইত্যাদি সব সেক্টরে বাংলাদেশ অনন্য ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশে আজ প্রথম স্থানে।

১৯৭৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ১৩৬তম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভ এবং ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুর মাতৃভাষা বাংলায় প্রদত্ত প্রজ্ঞাময় ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি জাতিকে পৃথিবীতে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২৫ সেপ্টেম্বর এ দিবসটি আজ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ঝঃধঃব ঈধষবহফধৎ-এ অভিবাসী দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুর বাংলায় প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণ আমাদের গর্বের ও ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে থাকবে চিরদিন।

লেখক : মো.নাসির উদ্দিন আহমেদ,সাবেক সচিব,২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

ইন্টারনেট কানেকশন নেই