সদ্য প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ভরাডুবির নেপথ্যে রয়েছে দক্ষ ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের তীব্র সংকট। বাংলাদেশ শিক্ষা-তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় মোট গণিত শিক্ষকের সংখ্যা ৬৪ হাজার ১৪৭। এরমধ্যে বিষয়টিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী আছেন মাত্র ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাত্ গণিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ছাড়াই শিক্ষার্থীদের বিষয়টি শেখাচ্ছেন ৮৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষক। অধিকাংশ শিক্ষকদের কাছে গণিত দুর্বোধ্য। তাদের গণিত শেখানোর পদ্ধতি মুখস্থনির্ভর। শিক্ষার্থীরা মুখস্থ গণিতের থেকে কিছুটা হেরফের হলেই ভুল করে বসে। আর উত্তর মেলাতে পারে না। একই চিত্র উঠে এসেছে ইংরেজি বিষয়ের ক্ষেত্রেও। মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় মোট ইংরেজি শিক্ষকের সংখ্যা ৬০ হাজার ৮৫৭ জন। তাদের মধ্যে ইংরেজিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী মাত্র ৯ হাজার ৩৭৬ জন বা ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। বর্তমানে যারা ইংরেজি পড়াচ্ছেন তাদের মধ্যে ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশের অন্য বিষয়ে ডিগ্রিধারী।
শিক্ষাবিদরা বলেন, মাধ্যমিকে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতি একটি বড় সমস্যা। বিশেষ করে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকের তীব্র অভাব রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে অন্য বিষয়ের ডিগ্রিধারী শিক্ষকরা এসব ক্লাস নেন, যার ফলে দীর্ঘ সময়ের শিখন ঘাটতির মুখে পড়ে শিক্ষার্থীদের ভীত দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার মান অর্জিত না হওয়ার প্রভাব এবার এসএসসির ফলাফলে দেখা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে যেহেতু দক্ষতার অভাব রয়েছে, তাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা দক্ষতা অর্জন করতে চায় তাদের প্রাইভেট-কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর যাদের কোচিংয়ের পেছনে অর্থ ব্যয়ের সামর্থ্য নেই তারা পিছিয়ে যাচ্ছে।
নবম ও দশম শ্রেণিতে আলাদা শিক্ষাক্রমে পাঠদান: ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম পাশের হার দেখা গেল এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায়। এ ফলকে কেউ কেউ বিপর্যয় বললেও সরকার বা শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা দেখছেন ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে। গত দেড় যুগের ফলকে ‘ফুলিয়ে-ফাপিয়ে’ দেখানো হয়েছে দাবি করে সরকারের ভাষ্য, এবার ‘মন খুলে’ নম্বর দেওয়ার প্রবণতা ছিল না। তবে ইংরেজি ও গণিতের মতো আবশ্যিক বিষয়ে খারাপ করাকেও পাশর হার কমে যাওয়ার একটি কারণ হিসেবে সামনে আনছেন তারা। অন্যদিকে শিক্ষকরা মনে করছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বদলে যাওয়া পরিস্থিতি, নবম ও দশম শ্রেণিতে আলাদা শিক্ষাক্রমে পাঠদান, পরীক্ষাকেন্দ্রে নজরদারি বাড়ানো এবং ডিভাইস আসক্তির মতো বিষয় এবার পাশের হার কমে যাওয়ার পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। ‘অযাচিত’ নম্বর না দেওয়ার যে ঘোষণা শিক্ষামন্ত্রী দিয়েছিলেন, তার প্রভাবও ফলে কিছুটা পড়েছে বলে মনে করছেন কয়েক জন শিক্ষক। এবার পরীক্ষায় বসেছিলেন মাধ্যমিকের সোয়া ১৮ লাখ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পাশ করেন ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। ২০০১ সালে যখন এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গ্রেডিং পদ্ধতি চালু হয়, তখন সর্বোচ্চ গ্রেড জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৭৬ জন। দুই যুগেরও কম সময়ের মধ্যে সেই সংখ্যা হাজার গুণ বেড়ে ২০২২ সালে ঠেকে সর্বোচ্চ চূড়ায়, ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জনে। গত চার বছর ধরে ক্রমাগত কমছে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা, চলতি বছর যা নেমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জনে। এটি শীর্ষ সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেকেরও কম।
সব জায়গায় প্রয়োজন, তারপরও পিছিয়ে: রাজধানীর দুটি স্কুলের চার জন ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষক ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, উচ্চ শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরিতে ভালো করার জন্য ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জনের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। একইভাবে একাডেমিক ও পেশাগত পর্যায়ে সমানভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে গণিতও। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে শুরু করে চাকরির পরীক্ষা পর্যন্ত প্রায় সবখানেই এ দুই বিষয়ের ওপরই জোর দেওয়া হয় সবচেয়ে বেশি। যদিও দক্ষতা অর্জনের দিক থেকে এ দুটি বিষয়েই সবচেয়ে পিছিয়ে দেশের শিক্ষার্থীরা। এজন্য তারা দায়ী করেন দক্ষ শিক্ষকের অভাবকে। শিক্ষকদের সিংহভাগ শিক্ষাগত পর্যায়ে যথাযথ পারদর্শিতা অর্জন ছাড়াই শিক্ষার্থীদের এ দু বিষয়ে পড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ তাদের।
এখনো এইচএসসি পাশ শিক্ষক ইংরেজি পড়াচ্ছেন: মাধ্যমিক স্তরের এমপিওভুক্ত বা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বাধ্যতামূলক। তবে দেশের কিছু নন-এমপিওভুক্ত নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন বা পুরোনো কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অতীতে নিয়োগ পাওয়া কিছু শিক্ষক এখনো উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন।
১২ আগস্ট ২০২৬
এ জি
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur