জমে উঠেছে পিরোজপুরের নেছারাবাদের ভাসমান পেয়ারা বাজার। এই বাজারের পেয়ারা যাচ্ছে সারা দেশে। ন্যায্য দাম না পাওয়া, হিমাগার না থাকা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের অভাবে চাষিরা প্রতিবছর লোকসান গুনছেন। এমনকি পেয়ারা বিদেশে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাষিরা আগের মতো মুনাফা করতে পারছেন না। তাই পেয়ারা বিদেশে রপ্তানির সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন চাষিরা। অন্যদিকে হিমাগার না থাকায় প্রতিবছর নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার পেয়ারা। ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন চাষিরা। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ পেয়ারা বাগানকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর নেছারাবাদে ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক। পর্যটকদের পদচারণায় জমে উঠেছে পেয়ারার বাগানসহ গোটা অঞ্চল।
জানা গেছে, বিশ্বমানের পর্যটন সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত পিরোজপুরের নেছারাবাদ ও ঝালকাঠির সীমান্তবর্তী খালের মোহনায় গড়ে ওঠা ভাসমান পেয়ারা বাজার। এখানকার ঐতিহ্যবাহী পেয়ারা বাগানগুলো বর্তমানে বাংলাদেশের ইকো-ট্যুরিজম বা পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে বর্ষা মৌসুমে বিশেষ করে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এ অঞ্চলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় জমে উঠেছে।
জানা গেছে, বরিশাল বিভাগের নেছারাবাদের সীমানাসংলগ্ন বানারিপাড়া ও ঝালকাঠির সদর উপজেলার কুড়িয়ানা, আটঘর, গণপতিকাঠি, মাদ্রা, আতা, জামুয়া, জৌসার, মুসলিমপাড়া, শশীদ, আন্দাকুল, আদাবাড়ী, আদমকাঠি, জিন্দকাঠি, কাঠুরাকাঠি, ধলহার, ডুমুরিয়া, ভিমরুলী, শতদশকাঠি, বাউকাঠিসহ প্রায় ২৪টি গ্রামে প্রায় চার হাজার পেয়ারাচাষি রয়েছেন। এখানকার সুস্বাদু পেয়ারা সারা দেশের মানুষের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হতো। প্রতিবছরের মতো এবারো ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে ডিঙি ও পানসি নৌকায় ভিমরুলীর ভাসমান বাজারে দেশ-বিদেশি পর্যটক ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে।
বরিশাল বিভাগীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, তিনটি উপজেলায় ২৩টি গ্রামে ৮৭৮ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩ হাজার ২২০টি পেয়ারার বাগান রয়েছে। এসব বাগানের পরিচর্যা থেকে শুরু করে ফল বেচাকেনা পর্যন্ত প্রায় ১৬ হাজার শ্রমজীবী মানুষ জড়িত।
এখানকার চাষিরা বলছেন, তাদের অর্থ উপার্জনের প্রধান মাধ্যম পেয়ারা চাষ। তবে পেয়ারা বাগান পরিচর্যায় খরচ বেশি। তাই পেয়ারা ব্যবসায় টিকে থাকতে সহজ শর্তে ব্যাংকঋণের দাবি জানিয়েছেন চাষিরা।
চাষি বিনয় হালদার বলেন, ‘হিমাগারের অভাবে প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকার পেয়ারা নষ্ট হয়।’ কুড়িয়ানার বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষক কালীদাশ মণ্ডল বলেন, ‘আমার চারটি পেয়ারার বাগান রয়েছে। পেয়ারা মৌসুমে প্রায় তিন টন পেয়ারা উৎপাদন হয়। বর্তমানে প্রতি মণ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পাইকারি দামে বিক্রি করায় সীমিত লাভ হচ্ছে।’ পেয়ারা বাজারের আড়তদার আলম-গফুর বলেন, ‘মণপ্রতি ৫০০ টাকা পাইকারি দরে ভাসমান বাজার থেকে পেয়ারা কিনে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি করায় তেমন একটা লাভ হয় না।’
১৯৮৭ সালে ব্যাপক ফলনে সারা দেশের চাহিদা মিটিয়ে উন্নতমানের জেলি তৈরির কাঁচামাল হিসেবে পেয়ারা বিদেশে রপ্তানি শুরু হয়। কলম্বিয়া, পর্তুগাল, নেপাল, পাকিস্তান, চীন, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, বার্মা, ভুটান, আফগানিস্তান, আরব আমিরাত, মালদ্বীপ, বুলগেরিয়া, ইরাক, ইরান, ইংল্যান্ডসহ ১৭টি রাষ্ট্রে পেয়ারা রপ্তানি হতো। এতে বছরে প্রায় ৮০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হতো। পচনশীল এ ফলটি সংরক্ষণের জন্য হিমাগার না থাকা, কৃষি অধিদপ্তরের অসহযোগিতা ও কোভিড ১৯-এর প্রভাবসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে ২০২০ সালে পেয়ারা রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়।
নেছারাবাদ উপজেলা কৃষি অফিসার মাহাফুজুর রহমান বলেন, পেয়ারা সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে হিমাগার নির্মাণ করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাবর জানানো হবে।
চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/
৮ আগস্ট ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur