চাঁদপুর জেলার সকল উপজেলাসহ দেশে মাদকের ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা চরম পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এখনই এর লাগাম টেনে শূন্যের কোঠায় না আনতে পারলে আমাদের তরুণ সমাজ ধ্বংসে পরিণত হচ্ছে। জেলার শহর-বন্দর,অলি-গলি, হাট-বাজার ও গ্রামের বাড়ি বাড়ি এর ছোবল পৌঁছে যাচ্ছে। মাদকের এ ভয়াবহতা একটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। যা যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮৩ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। ইয়াবা,ফেন্সিডিল এবং হেরোইন ছাড়াও আইস ক্রিস্টাল মেথ ও কোকেনের মতো প্রাণঘাতী মাদকের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। দিন দিন এর অবস্থার বিস্তার ঘটছে।উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর ন্যায় আমাদের দেশেও মাদকদ্রব্যের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের তরুণরা এখন ভয়াবহ মাদকাসক্তির শিকার।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি মাদকসেবী রয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি মাদকাসক্ত। প্রতিদিন গড়ে ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করে থাকেন তারা। এ হিসাব অনুযায়ী-মাসে তারা প্রায় ৬শ’ কোটি টাকার মাদক সেবন করেন।
দেশে ৩০ লাখ মাদক ব্যবসায়ী প্রতিদিন কমপক্ষে প্রায় দুইশ’ কোটি টাকার মাদক কেনা-বেচা করে থাকেন। দেশে ১০ % জন নারী মাদকাসক্ত। এদের মধ্যে তিন জন গৃহবধূ। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ ৭৭ লাখ ৬০ হাজার এবং নারী ২ লাখ ৮৫ হাজার। এর বাইরে ২ লাখ ৫৫ হাজার শিশু-কিশোর মাদকে আসক্ত। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৬১ লাখ গাঁজায়, ২৩ লাখ ইয়াবায় ও ২০ লাখ ২৪ হাজার মদ্যপানে আসক্ত। ৩ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ ফেনসিডিল ও সমজাতীয় মাদকে এবং ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ হেরোইনে আসক্ত।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে- তিন লাখের মতো মানুষ ঘুমের ওষুধ মাদক হিসেবে গ্রহণ করেন। ড্যান্ডির মতো আঠাকে মাদক হিসেবে ব্যবহার করেন ১ লাখ ৬০ হাজারের মতো মানুষ। ইনজেশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করেন ৩৯ হাজার মানুষ। এ নিয়েই দেশে মাদকাসক্ত ৮৩ লাখ। জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮%। অধিকাংশই তরুণ। প্রায় ৩৩% ৮-১৭ বছর বয়সে প্রথম মাদক সেবন করেছেন। ৫৯% প্রথম সেবন করেছেন ১৮-২৫ বছর বয়সে। সংখ্যার দিক থেকে বেশি মাদক সেবনকারী ঢাকায় ; ঢাকা ২২ লাখ ৮৭ হাজার ৯শ ৭০ জন। দ্বিতীয়, চট্টগ্রাম ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫শ ৩ জন। তৃতীয়, রংপুরে ১০ লাখ ৮০ হাজার ৫শ ৮৮ জন। এরপর পর্যায়ক্রমে ময়মনসিংহ ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮শ ১২, খুলনা ৭ লাখ ২৬ হাজার ২শ ১০, রাজশাহী ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫শ ৯, সিলেট ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১শ ৪১ ও বরিশালে ৪ লাখ ৪ হাজার ১শ ১৮ জন। সব মিলেয়ে দেশ ৮১ লাখ ৯৪ হাজার ৬শ ৫১ জন মাদক সেবন করে। এ গবেষণায় সিগারেটকে মাদক সেবন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
দেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরন ও সংশ্লিষ্ট কারণ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলে এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠান হয়। গবেষণাটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। কেউ কেউ একাধিক মাদক সেবন করেন। কেউ শুধু এক ধরনের মাদক সেবন করেন।
গবেষণায় দেখা গেছে- সবচেয়ে বেশি মানুষ গাজা সেবন করেন। এরা অন্য মাদকও সেবন করেন। গাজা সেবনকারীর সংখ্যা ৬০ লাখ ৭৯ হাজার ৯শ ১৪ জন। ইয়াবা ২২ লাখ ৯২ হাজার ৭শ৫, অ্যালকোহল ২০ লাখ ২০ হাজার ৯শ ৭৭,কোডিন ফসফেট ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৬ শ ৬০, হেরোইন ৩ লাখ ২২ হাজার ৬শ ৭৭, ঘুমের ওষুধ ৩ লাখ ৫ হাজার ৬শ ৯৪, ১ লাখ ৫২ হাজার ৮শ ৪৭ ইনহেল্যান্ট এবং ৩৯ হাজার ৬১ ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক, ১১ হাজার ৮শ ৮৮ ক্রিস্টাল মেথ,৫ হাজার ৯৫ এলএসডি এবং ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮শ ৬৪ জন্য অন্যান্য মাদক সেবন করেন। গবেষণায় জানানো হয়, একজন মাদকসেবী মাসে কমবেশি ৬ হাজার টাকা ব্যয় করেন। বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ ও অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত থাকা মাদক সেবনের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আশঙ্কাজনকভাবে,প্রায় ৯০% সেবনকারী মাদক সহজলভ্য বলে জানিয়েছেন। দেশে মাদক ব্যবহারকারী চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ খুবেই সীমিত। মাত্র ১৩% মাদক সেবনকারী কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছেন।
মাদকের ভয়াবহতার প্রভাবে দেশে বিপুল সংখ্যক তরুণ-যুবক বন্ধুদের প্রভাবে এবং সহজলভ্যতার কারণে মাদকে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকাসক্তির কারণে সমাজে খুন, চুরি, ছিনতাই এবং পারিবারিক সহিংসতার মতো অপরাধের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মাদকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে কিডনি ও লিভারের ক্ষতি,মানসিক ভারসাম্য হারানো,এবং হেপাটাইটিস ও এইচআইভি-এর মতো প্রাণঘাতী রোগ ছড়াচ্ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারি পদক্ষেপ ও জনসচেতনতায় জানা যায়-মাদক নির্মূলে সরকার কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে।
যার আওতায় মাদক কেনাবেচার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহায়তায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে আইনের পাশাপাশি পারিবারিক সচেতনতা,কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রের মাধ্যমে মাদকাসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
আমরা মনে করি- এককভাবে পুলিশ,মাদকনিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও জেলা-উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। তাই সকল সাংবাদিক,শিক্ষক সমাজ,ব্যবসায়ী,ছাত্র,সমাজসেবী, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গের মাদকবিরোধী ক্যাম্পেইনে যুক্ত হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এরই অংশ হিসেবে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, চাঁদপুর জেলা শাখা ইতোমধ্যেই মাদকবিরোধী ক্যাম্পেইন কর্মসূচির মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে। আসুন -আমরা মাদক বিস্তার রোধে এগিয়ে আসি।
তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট ওয়েবসাইড থেকে সংগৃহীত। সম্পাদনায় : আবদুল গনি, শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও গণমাধ্যমকর্মী, চাঁদপুর। ১৮ জুলাই ২০২৬। মোবা: ০১৭১৮-২১১ ০৪৪।
২৩ জুলাই ২০২৬
এ জি
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur