শেষ বাঁশি বাজার পর হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিলেন তিনি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন। চারপাশ থেকে ছুটে আসেন সতীর্থরা। কেউ জড়িয়ে ধরেন, কেউ কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দেন। বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী দল স্পেনকে রুখে দেওয়ার পর কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার সেই কান্না ছিল না শুধুই আবেগের বহিঃপ্রকাশ; সেটি ছিল সংগ্রাম, ত্যাগ আর স্বপ্নপূরণের এক অনন্য গল্পের প্রতিচ্ছবি।
আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে বিশ্বকাপজয়ী ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দেয় বিশ্বকাপে অভিষিক্ত কেপ ভার্দে। পুরো ম্যাচে স্পেন ২৭টি শট নেয়, যার সাতটি ছিল লক্ষ্যে। কিন্তু ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার দুর্দান্ত গোলকিপিংয়ের সামনে বারবার ব্যর্থ হয় লা রোহা।
বিশেষ করে প্রথমার্ধের শেষদিকে ফেরান তোরেস, মিকেল ওয়ারজাবাল এবং আইমেরিক লাপোর্তের নিশ্চিত গোলের সুযোগ রুখে দিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি। তোরেসের একটি শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে, আর বাকি সুযোগগুলোতে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষক। তার বীরত্বেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনের জন্ম দেয় আফ্রিকার ছোট্ট দেশটি।
তবে ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শুধু তার পারফরম্যান্স নয়, তার চোখের জলও।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত ভোজিনিয়া জানান, ম্যাচ শেষে কান্নার পেছনে ছিল ব্যক্তিগত বেদনার গল্প, “আমি কেঁদেছিলাম কারণ ছোটবেলায় দাদা-দাদির কাছেই বড় হয়েছি। কিন্তু আজ তারা এখানে থাকতে পারেননি। কয়েক বছর আগে তারা মারা গেছেন।”
এরপর আরও আবেগঘন কণ্ঠে যোগ করেন, “আমার মাও এখানে থাকতে পারেননি। ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে সময়মতো সব ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।”
বিশ্বকাপের মতো মহামঞ্চে নিজের জীবনের সেরা ম্যাচগুলোর একটি খেলেও প্রিয় মানুষদের গ্যালারিতে না পাওয়ার আক্ষেপ যেন বুক ভরে ছিল ভোজিনিয়ার।
তার এই গল্প ছুঁয়ে গেছে ফুটবলবিশ্বকেও। সাবেক স্কটল্যান্ড উইঙ্গার ও বিবিসি বিশ্লেষক প্যাট নেভিন ম্যাচ শেষে লিখেছেন, “পুরো ম্যাচজুড়ে ভোজিনিয়া ছিলেন অসাধারণ। ৪০ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে তিনি যা করেছেন, তা অবিশ্বাস্য। ম্যাচ শেষে সব ক্যামেরা ছিল তার দিকে। সতীর্থরাও দেখিয়ে দিচ্ছিলেন, আজকের প্রকৃত নায়ক কে।”
সাবেক ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার লি ডিক্সনও নিজের আবেগ লুকাতে পারেননি। তার ভাষায়, “আমি সত্যিই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। এই একটি পয়েন্ট কেপ ভার্দের প্রাপ্য ছিল। আজকের রাতটা শুধু তাদের। ভোজিনিয়াকে কাঁদতে দেখে আমার নিজেরও প্রায় কান্না চলে আসছিল।”
বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নেওয়া কেপ ভার্দের জন্য স্পেনের বিপক্ষে এই ড্র শুধু একটি পয়েন্ট নয়, বরং ইতিহাসের অংশ। আর সেই ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ নিঃসন্দেহে ভোজিনিয়া।
যে মানুষটি অর্থের অভাবে মাকে বিশ্বকাপে আনতে পারেননি, দাদা-দাদিকেও হারিয়েছেন বহু আগে, সেই তিনিই বিশ্বের অন্যতম সেরা দলকে রুখে দিয়ে নিজের দেশকে উপহার দিলেন গর্ব করার মতো এক রাত। আর শেষ বাঁশির পর তার চোখের জল হয়ে উঠল ফুটবলের সবচেয়ে মানবিক এবং হৃদয়স্পর্শী মুহূর্তগুলোর একটি।
চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/ ১৬ জুন ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur