সুদীর্ঘ ২২ বছর পর প্রধানমন্ত্রী হয়ে চাঁদপুরে আসছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ১৬ মে প্রধানমন্ত্রীর চাঁদপুরে আগমনকে ঘিরে জেলাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ, উদ্দীপনা ও নতুন আশার সঞ্চার। দীর্ঘদিন ধরে নানা সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে থাকা চাঁদপুরবাসী এবার প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে জেলার সামগ্রিক উন্নয়নের বাস্তবধর্মী ঘোষণা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করছেন।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, বিগত সরকারের আমলে চাঁদপুর থেকে একাধিক হেভিওয়েট এমপি-মন্ত্রী এবং প্রশাসনিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করলেও জেলার প্রত্যাশিত উন্নয়ন অনেক ক্ষেত্রই অপূর্ণ থেকে গেছে। সম্ভাবনাময় এই জেলাকে ঘিরে মুখে এবং কাগজে কলম বড় বড় পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও তা বাস্তবায়নের গতি ছিল হতাশাজনক। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরকে ঘিরে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন চাঁদপুরবাসী।
বিশেষ করে পদ্মা-মেঘনার ভাঙন থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা পেতে শক্তিশালী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ এখন চাঁদপুরবাসীর সবচেয়ে বড় দাবি। বছরের পর বছর নদীভাঙনে জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ, ফসলি জমি ও বসতভিটা হুমকির মুখে পড়লেও স্থায়ী সমাধান এখনো দৃশ্যমান হয়নি। বন্ধ হয়নি পদ্মা মেঘনা থেকে অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব। তাই প্রধানমন্ত্রীর সফরে এ বিষয়ে কার্যকর ঘোষণা আসবে বলে আশা করছেন সচেতন মহল।
এছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নের লক্ষ্যে চাঁদপুরে একটি ইপিজেড স্থাপন, হাইমচরে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক জোনের দৃশ্যমান কার্যক্রম শুরু এবং স্থানীয় তরুণদের জন্য নতুন শিল্প ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির দাবিও জোরালো হয়ে উঠেছে। জেলার অর্থনীতিকে গতিশীল করতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও তরুণ উদ্যোক্তারা।
পর্যটন সম্ভাবনাময় জেলা হিসেবে পদ্মা-মেঘনার মোহনাকে কেন্দ্র করে বহুদিন ধরে চাঁদপুরে একটি বৃহৎ আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। নদী, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যকে ঘিরে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে চাঁদপুর দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন নগরীতে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ এখানে রয়েছে নদী-শস্য ইলিশ, প্রাকৃতিক অপার সৌন্দর্য এবং দেশের বৃহত্তম মিঠা পানির বিচ।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও রয়েছে বড় প্রত্যাশা। বহুদিনের দাবিকৃত, চাঁদপুর-সিলেট, চাঁদপুর-কক্সবাজার এবং ঢাকা-চাঁদপুর রেল যোগাযোগ চালু, মেঘনার পাড় ঘেঁষে চাঁদপুর-মতলব-দাউদকান্দি হয়ে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন এবং জেলার অভ্যন্তরীণ সড়ক ব্যবস্থার আধুনিকায়নের বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি কামনা করছেন সাধারণ মানুষ। প্রত্যাশা রয়েছে চাঁদপুর সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক মহাসড়ক গুলোকে চার লেনে উন্নত করার। এছাড়া চাঁদপুর শরীয়তপুরে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ এবং আরো উন্নত করার লক্ষ্যে চাঁদপুর শরীয়তপুর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতেও উন্নয়নের প্রত্যাশা রয়েছে চাঁদপুরবাসীর। চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো নির্মাণ, আধুনিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু এবং ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালকে আরও অধিক শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তরের দাবি এখন সময়ের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, জেলার সংস্কৃতি কর্মী, নাট্যজন, সংগীতশিল্পী ও সাহিত্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শিল্প-সাহিত্য চর্চার জন্য চাঁদপুরে একটি আধুনিক ও উন্নত শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রতিভাবান শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের বিকাশের জন্য মানসম্মত অবকাঠামো, মিলনকেন্দ্র ও প্রশিক্ষণ সুবিধা অত্যন্ত জরুরি। একটি সমৃদ্ধ শিল্পকলা একাডেমি ও সাহিত্য একাডেমি গড়ে উঠলে চাঁদপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গন আরও বিকশিত হবে এবং নতুন প্রজন্ম শিল্প-সাহিত্য চর্চায় উদ্বুদ্ধ হবে।
কর্মসংস্থান নিয়ে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি এবং চাঁদপুর সাহিত্য মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক সাদ আল-আমিন বলেন, “চাঁদপুরে শিক্ষিত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। ফলে শিক্ষিত তরুণদের অনেককেই বিদেশ বা ঢাকামুখী হতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী যদি এখানে একটি ইপিজেড ও বড় শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেন, তাহলে হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আমরা চাই চাঁদপুর শুধু সম্ভাবনার জেলা না, কর্মসংস্থানের জেলায় পরিণত হোক।”
শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমী পরিচালক (সাহিত্য) ও বিশিষ্ট লেখক মাইনুল ইসলাম মানিক বলেন, “চাঁদপুরে অনেক মেধাবী শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মী রয়েছেন। কিন্তু তাদের চর্চা ও বিকাশের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা খুবই সীমিত। শিল্পকলা একাডেমী ও সাহিত্য একাডেমির ভবনটি দীর্ঘদিন যাবত জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সাহিত্য সংস্কৃতি কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের কোন সুব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আমরা চাই চাঁদপুরের সামগ্রিক উন্নয়নের সাথে সাথে শিল্পকলা একাডেমী ও সাহিত্য একাডেমী ভবনকে আধুনিকায়ন এবং উন্নত করা হোক। যেখানে এই জেলার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা সাহিত্যচর্চা, নাটক, সংগীত, নৃত্য, চিত্রকলা, আবৃত্তিসহ সকল সংস্কৃতি চর্চার সুন্দর পরিবেশ তৈরি হবে। কারণ শিল্প সংস্কৃতি বিকশিত হলে সমাজও আলোকিত হবে।”
মেঘনা ভাঙন নিয়ে নদীপাড়ের বাসিন্দা এবং চাঁদপুর হিলশা মেডিকেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাও: মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে এলেই চাঁদপুর এবং শরীয়তপুর এলাকার নদী পাড়ের মানুষরা ভাঙনের আতঙ্কে থাকে। বহুকাল ধরে পদ্মা-মেঘনা তীরের হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি ও জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা অন্যত্র বাড়ি করতে পারলেও সামর্থ্যহীনদের ঠাঁই হয়েছে সরকারি গুচ্ছ গ্রামে। তাছাড়া অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনও নদী ভাঙ্গনের অন্যতম কারণ। আমরা চাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চাঁদপুরকে রক্ষায় স্থায়ী ও শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণের ঘোষণা দেবেন। নদী ভাঙন থেকে চাঁদপুর ও শরীয়তপুর জেলাকে রক্ষা এখন সময়ের দাবি।”
চাঁদপুর বড়স্টেশন কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক রাসেল পারভেজ বলেন, “চাঁদপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন অনেক এগিয়ে যাবে। আমরা বহুদিন ধরে চাঁদপুর-কুমিল্লা এবং সিলেট রুটে একাধিক ট্রেন চলাচলের দাবি জানিয়ে আসছি। এছাড়া বর্তমানে ঢাকা-চাঁদপুর রেল যোগাযোগ ও সরাসরি সড়ক সংযোগের দাবিও উঠেছে। মেঘনার পাড় ঘেঁষে ঢাকার সাথে সরাসরি আধুনিক সড়ক নির্মাণ হলে চাঁদপুরের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।”
চাঁদপুরবাসীর প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চাঁদপুর সফর যেন শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা বা রাজনৈতিক সমাবেশে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রধানমন্ত্রীর চাঁদপুরে আগমনে যেন এই জেলার দীর্ঘদিনের সমস্যা ও সম্ভাবনাকে সামনে এনে বাস্তবভিত্তিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন হয়।
-আশিক বিন রহিম/ ১৫ মে ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur