দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা খাতে তৃণমূল পর্যায়ে দীর্ঘদিনের জনবলসংকট এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে হাজার হাজার পদ শূন্য থাকায় সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
সম্প্রতি এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই নিয়োগ পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। তিনি জানান, নতুন নিয়োগের ৮০ শতাংশই হবেন নারী স্বাস্থ্যকর্মী, যাদের মূল দায়িত্ব থাকবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা পৌঁছে দেওয়া।
মাঠপর্যায়ে প্রকট সংকট
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন তথ্য বলছে, দেশের বহু উপজেলায় স্বাস্থ্য সহকারী, স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের বড় অংশের পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় স্বাস্থ্য সহকারীর ৪৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১৫ জন। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, জনবল কম থাকায় নিয়মিত কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে।
খুলনা বিভাগে স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ১ হাজার ৪১১টি পদের মধ্যে ৬২০টি পদ শূন্য। আর স্বাস্থ্য সহকারীর ২০ হাজার ৯০৯টি পদের বিপরীতে খালি রয়েছে ৬ হাজার ৮৮৮টি পদ। রংপুর বিভাগেও একই চিত্র। সেখানে ১৫৩ জন স্বাস্থ্য পরিদর্শকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৫ জন।
হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ
মাঠপর্যায়ের এই সংকটের মধ্যেই দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৫ মে’র তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ২৬৩ শিশু। এর মধ্যে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মৃত্যু হয়েছে ৫৪ শিশুর।
এ সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৪২ হাজার ৯৭৯ শিশুর এবং বর্তমানে প্রায় ২৯ হাজার ৮৩১ শিশু হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, টিকাদান ও তদারকি কার্যক্রম চালিয়ে নিতে অন্য দপ্তরের কর্মীদেরও সহায়তা নিতে হচ্ছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরেও সংকট
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সারা দেশে অনুমোদিত ৫৪ হাজার ২২৬টি পদের মধ্যে বর্তমানে খালি রয়েছে ১৪ হাজার ৯৮১টি পদ, যা মোট পদের প্রায় ২৮ শতাংশ।
জেলা পর্যায়ে খাগড়াছড়িতে ৪৪ শতাংশ, ফরিদপুরে ৩৯ শতাংশ এবং গাইবান্ধায় ৩৮ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। বিশেষ করে পরিবারকল্যাণ সহকারীর ২৩ হাজার ৫০০টি পদের মধ্যে ৪ হাজার ১৮৮টি পদ খালি থাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
এ ছাড়া দেশের প্রায় আড়াই হাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের মধ্যে ৮৭৮টিতে কোনো মেডিক্যাল অফিসার নেই।
এক লাখ নিয়োগের পরিকল্পনা
২ মে সিলেটে আয়োজিত এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ থাকবে নারী স্বাস্থ্যকর্মী। তারা গ্রামে গ্রামে, ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন করবে।”
তিনি বলেন, এ কর্মীদের মূল লক্ষ্য হবে লাইফস্টাইল, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা, যাতে রোগ কমে এবং হাসপাতালের ওপর চাপও হ্রাস পায়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতি
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, যেসব বিভাগে জনবলসংকট সবচেয়ে বেশি, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তিনি বলেন, “এ এক লাখ জনবলের মধ্যে স্বাস্থ্য সহকারী ছাড়াও টেকনিশিয়ান, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কর্মী এবং চিকিৎসকরাও অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পনাটি দ্রুত বাস্তবায়িত হলে তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবায় গতি ফিরবে এবং দীর্ঘদিনের জনবলসংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
১০ মে ২০২৬
এ জি
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur