দেশের ১০ কোটিরও বেশি মানুষ এখনও নিরাপদ পানীয় জলের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এর ফলে প্রতিদিন ঝুঁকির মুখে পড়ছে শিশুদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত এক যৌথ জরিপের প্রাথমিক ফলাফলে এ চিত্র উঠে এসেছে। গত নভেম্বরে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দেশে স্যানিটেশনের আওতা বেড়ে ৭৩ শতাংশে পৌঁছালেও নিরাপদভাবে পরিচালিত পানীয় জলের প্রাপ্তি নেমে এসেছে ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশে। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকছেন।
এমন পরিস্থিতিতে আজ রোববার পালিত হচ্ছে বিশ্ব পানি দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘পানি ও লিঙ্গ সমতা’। টেকসই উন্নয়ন ও মানবাধিকার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে পানি, স্যানিটেশন ও লিঙ্গ সমতার পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এ প্রতিপাদ্যে।
বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের অধিকার একটি মৌলিক মানবাধিকার—এ বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে এবারের প্রতিপাদ্য। একইসঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনায় নারী ও মেয়েদের অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের পরিবেশ ও উন্নয়ন সম্মেলনে বিশ্ব পানি দিবস পালনের ধারণা উত্থাপিত হয়। পরবর্তীতে ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ প্রতি বছর ২২ মার্চকে বিশ্ব পানি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৯৩ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
জরিপের তথ্য তুলে ধরে ইউনিসেফ জানায়, দেশের প্রায় অর্ধেক পানির উৎসই দূষিত। গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত পানির ৮০ শতাংশের বেশি নমুনায় ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে ১০ দশমিক ২ শতাংশ পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতি জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে তুলেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে ভূগর্ভস্থ পানিতেও লবণাক্ততা বাড়ছে। এতে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। পাশাপাশি চিংড়ি চাষ, লবণ উৎপাদনসহ বিভিন্ন স্থানীয় কার্যক্রমও পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের কারণে মিঠা পানির উৎস খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইউনিসেফের মতে, এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। অনিরাপদ পানির কারণে তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, বাড়ছে স্কুলে অনুপস্থিতি এবং পুষ্টিহীনতা। অন্যদিকে লবণাক্ত পানি পান উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়, যা অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর।
এদিকে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে গত বছর এক গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। নিরাপদ পানিকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমস্থলে বিনামূল্যে নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ে আগামী ১০ বছরের মধ্যে সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত এবং নদী, খাল, বিল, পুকুরসহ সব জলাধার সংরক্ষণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিরাপদ পানি প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার—এ কথা পুনর্ব্যক্ত করে আদালত জানায়, এ অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/
২২ মার্চ ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur