রাজনীতি

সাংবাদিক মাহফুজ আনাম নাৎসিবাদের উপাসকে পরিণত : রিজভী

ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’ সম্পাদক প্রবীণ সাংবাদিক মাহফুজ আনাম আওয়ামী নব্য নাৎসিবাদের উপাসকে পরিণত হয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

গণতন্ত্র দিবসে ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এ প্রকাশিত ‘After 30 years of autocracys demise, democracy still remains a distant dream’ প্রবন্ধে ২১ আগস্ট গেনেড হামলায় তারেক রহমানের সম্পৃক্ততা, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বিএনপির অগণতান্ত্রিক আচরণ বিষয়ে মাহফুজ আনাম যে বক্তব্য তুলে ধরেছেন, তার প্রতিক্রিয়া জানাতে এ সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়।

রিজভী বলেন, “এই ভয়াবহ দুঃসময়ে গণতন্ত্র দিবসে ইংরেজী দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম ’After 30 years of autocracys demise, democracy still remains a distant dream’ শিরোনামে নিজের একটি নিবন্ধ ছেপেছেন। নিবন্ধের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নির্জলা মিথ্যাচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য, অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অসংলগ্ন মতামত। ওয়ান-ইলেভেনের গণতন্ত্র ধ্বংসের প্রধান কুশীলবদের অন্যতম হোতা এবং সেনা সমর্থিত মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত মাহফুজ আনামের এই নিবন্ধে বেগম জিয়াকে নিয়ে তিনি সরাসরি ও ইঙ্গিতে যে মন্তব্য করেছেন তাতে জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।”

তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের কথা বলতে গিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে বারবার বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন মাহফুজ আনাম, যা হলুদ সাংবাদিকতা ও বর্তমান সরকারের নির্লজ্জ স্তুতিরই সমতুল্য। মাহফুজ আনাম ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা নিয়ে তার প্রবন্ধে যা লিখেছেন তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পারিষদবর্গের হাইপার-প্রোপাগান্ডা ও কলুষিত মিথ্যাচারের প্রতিধ্বনী মাত্র।’

‘মিথ্যা বানোয়াট গল্প সাজিয়ে সংবাদ পরিবেশনের দায়ে বার বার ক্ষমা চেয়ে এখন সরকারের কাছে সাধু সাজার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন তিনি। তার লেখালেখির ভিশন-মিশন হলো বিএনপি’র বিরুদ্ধে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কাহিনী রচনা করে তা প্রকাশ করা। ভয়ে হোক বা উচ্ছিষ্ট ভোগের ইচ্ছায় হোক, গণতন্ত্রহীন ও বেপরোয়া আচরণে লিপ্ত আওয়ামী লীগ সরকারকে খুশি করাই এখন তার আরাধ্য। মাহফুজ আনাম এখন আওয়ামী নব্য নাৎসিবাদের উপাসকে পরিণত হয়েছেন,’— বলেন রুহুল কবির রিজভী।

তিনি বলেন, “আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন, নিজেকে কথিত ‘প্রতিষ্ঠানতুল্য সাংবাদিক’ দাবি করা সাংবাদিকতার ‘এথিকস’ শেখানো, কে এই মাহফুজ আনাম? কি তার আমলনামা? গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা সাজা এই মুখোশধারী মাহফুজের পিতা ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভায় দীপ্তিমান সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক-সম্পাদক সর্বজন শ্রদ্ধেয়। সেই স্মরণীয় আবুল মনসুর আহমদের নাম তিনি ভুলুণ্ঠিত করছেন। মাহফুজ আনামদের সারথী হয়ে তথাকথিত সুশীল শ্রেণির বেশ কয়েকজন এ দেশে গণতন্ত্র হত্যা করে এক-এগারোর অসাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল।’

রিজভী বলেন, ‘স্বচ্ছ সাংবাদিকতা নয়, বিদেশি অর্থদাতা প্রভু ও দেশীয় গোয়েন্দাদের এজেন্ট হিসেবেই কাজ করেছেন মাহফুজ আনাম। মাহফুজ আনামদের বাংলাদেশে গণতন্ত্র ধ্বংস এবং ফ্যাসিবাদের উত্থানে ভূমিকা ও অপতৎপরতা কলঙ্কিত ইতিহাস হয়ে থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি বিপুল বিজয়ে ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করে গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যার মাধ্যমে অসাংবিধানিক শাসন কায়েম করার নীলনকশা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করে এই মাহফুজরা। কারণে-অকারণে তাদের প্রায় প্রতিদিন দেখা যেত জাতির সামনে নানা সবক নিয়ে হাজির হতে। তাদের নেতৃত্বেই তখন নানা ইস্যু বানিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির পালে হাওয়া দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি অবৈধ ক্ষমতা গ্রহণকারীদের মাধ্যমে সুশীল সমাজের কিছু ব্যক্তি তাদের প্রথম লক্ষ্য হাসিল করে। সেই লক্ষ্য হাসিলে পুরোধা ছিলেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম।’

রিজভী বলেন, “ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার নিয়ে সেদিন তিনি উল্লাস করেছিলেন। এ সরকার আনার পেছনে নিজের কৃতিত্ব নিয়ে সগর্বে কলাম লিখেছিলেন— ‘দুই নেত্রীকে বিদায় নিতে হবে’। ডেইলি স্টার গ্রুপের পত্রিকায় গণতান্ত্রিক সরকারের পরিবর্তে সেনা সমর্থিত অগণতান্ত্রিক, একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরশাসনকে স্বাগত জানিয়ে প্রকাশ করা হয়েছিল একটির পর একটি নিবন্ধ। পুরো সময়টা তারা গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থাকে শুধুই গালমন্দ করে মনগড়া নিবন্ধ লিখে গেছেন।”

তিনি বলেন, ‘মাইনাস ফর্মুলায় রাজনীতি শূন্য করতে মাহফুজ আনাম মিথ্যা, অসত্য ও ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশন করে রাজনীতিকদের গ্রেফতারের পটভূমি রচনার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তৎকালীন অবৈধ সরকার গণমানুষের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে একবছরের বেশি সময় কারাবন্দি করে রাখে। তারেক রহমানকে হত্যার চেষ্টা করে, নির্যাতনের মাধ্যমে তাকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়। আজও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। এর জন্য দায়ী ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরা।‘

রিজভী বলেন, ‘মাহফুজ আনামদের চোখে সব দোষ রাজনীতিকদের। রাজনীতিবিদরা সবাই যেন চাঁদাবাজ-চোর। তারাই কেবল অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মনগড়া অভিযোগ এনে ওই পত্রিকায় তালিকাও ছাপা হয়েছিল। আর জেলে ঢোকানো হয় দেড় শতাধিক নেতাকে। রাজনৈতিক নেতাদের স্ত্রী সন্তানদের পর্যন্ত ধরে নিয়ে জেলে ঢোকানো হয়।’

“জরুরি সরকারের আইনমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পাদকদের এক বৈঠক শেষে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে হাজির হয়ে মাহফুজ আনাম বলেছিলেন, ‘এ সরকার হচ্ছে আমাদের আন্দোলনের ফসল’। তার কিছুদিন পরে শেখ হাসিনাও বলেছিলেন ‘এ সরকার হচ্ছে আমাদের আন্দোলনের ফসল’। মাহফুজের ভাষার সঙ্গে গণতন্ত্র হত্যাকারী শেখ হাসিনার ভাষার কোনো পার্থক্য ছিল না। এখনো নেই। তখনই তৈরি হয়েছিল ‘গেম প্ল্যান’,”— বলেন রিজভী।

‘বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে এই ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত হয়নি এবং এই ঘটনা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য করা হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন’— মাহফুজ আনামের এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় রিজভী বলেন, ‘গণতন্ত্র নিয়ে কলাম লিখতে গিয়ে মাহফুজ আনাম খেই হারিয়ে ফেলেছেন। নিশিরাতের সরকারকে পরিতুষ্ট করার জন্য একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার প্রেক্ষিত এবং বিচার প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিএনপি এবং বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসার ও কদর্য মিথ্যাচার করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘এই লেখাতেই প্রমাণিত হয় মাহফুজ আনাম বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি বিষোদগার করে আওয়ামী লীগের কৃপা পেতে চান। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে মাহফুজ আনাম ভালোভাবেই অবগত আছেন। প্রশাসন, আইন ও বিচার বিভাগকে কব্জা করে মামলাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্তের মাধ্যমে বর্তমান প্রতিহিংসাপরায়ণ সরকার সাক্ষ্য প্রমাণহীন রায় প্রদান করে অনেক নিরপরাধের সাজা দিয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপি কখনোই ঘৃণ্য হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না।’

রিজভী বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম কুশীলব মাহফুজ আনাম মুখে গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে চিৎকার করলেও তিনি আপন স্বার্থসিদ্ধির জন্য গণতন্ত্র হন্তারকদের নাটের গুরু, ফ্যাসিবাদের তল্পিবাহক। পৃথিবীতে বিচিত্র ও বহুরুপী মানুষরা নানা ঘটনার সাথে যে যুক্ত থাকে মাহফুজ আনামরা তার প্রমাণ। মাহফুজ আনামদের সাংবাদিকতা বস্তুনিষ্ঠতার জন্য, নাকি মুখোশ— সেটি এখন জনমনে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘মাহফুজ আনাম ২০১৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি টিভি টকশোতে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক সরবরাহ করা সূত্রবিহীন খবর যাচাই না করে ছাপিয়ে রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিবাজ বানানোর চেষ্টা ও গ্রেফতার করার প্রেক্ষাপট তৈরির কথা স্বীকার করার পর ক্ষমা চেয়েও কূল পাননি। তার নামে প্রতিটি জেলায় মামলা হয়েছে। জাতীয় সংসদে তার বিচার ও ডেইলি স্টার বন্ধের দাবি ওঠে। তবে সারাদেশে মামলার পর বদলে গেছেন মাহফুজ আনাম। তার অপরাধ রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য। কারণ তিনি নিজে একটি অসাংবিধানিক সরকারকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন অথবা গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করে অসাংবিধানিক একটি গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছেন অথবা তাদের ইচ্ছেকে সমর্থন যুগিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি জার্নালিজমের এথিক্সের ধার ধারেননি।’

রিজভী বলেন, ‘দেশের জনগণ মনে করে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ছিল ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্টির মহড়া। এই মহড়ার কুশীলবদের সঙ্গে মাহফুজ আনামরাও জড়িত থাকতে পারেন। এখন বাঁচার জন্য সরকারের সুরে সুর মিলিয়ে গীত গাইছেন। তার লেখার মধ্যে তিনি অবৈধ শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেছেন, যা একদিকে যেমন সরকারের প্রতি তার নির্লজ্জ দালালির সাক্ষ্য বহন করে, অন্যদিকে বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রতি গভীর এক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত বলে বিএনপি মনে করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাহফুজ আনাম পেপার ট্রায়াল করেছেন। আমরা মাহফুজ আনামের ফরমায়েশি, অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একদেশদর্শী এই প্রবন্ধে ২১ আগস্ট ও দেশনেত্রীকে নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, সেটি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি।’

Share