মতলব উত্তরে পাটের বাম্পার ফলন হলেও দামে হতাশ কৃষকরা

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় এবার আগাম বৃষ্টি না হওয়ায় আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় সোনালি আঁশ পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। যার ফলে ক্রমেই পাট চাষে আগ্রহ বাড়েছে কৃষকদের মাঝে। ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকরা আপাতত খুশি। তবে ভাল ফলনে দাম নিয়ে শঙ্কায় ভুগছেন স্থানীয় কৃষকরা। তবে পাট বিক্রির শুরুতেই গতবারের চেয়ে মণপ্রতি দাম কমেছে ১ হাজার টাকা। এতে শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা। কৃষকদের দাবি, যত শিগগির সম্ভব, পাটের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হোক।

উপজেলায় ইতিমধ্যে ক্ষেত থেকে পাট কাটা শুরু হয়েছে। অনেকে আবার পাট পরিপত্র করার ব্যস্ত সময় পার করছেন। এরই মধ্যে মুক্ত জলাশয়ে জাঁক দেওয়া পাট থেকে আঁশ ছাড়ানোর কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু দাম নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কৃষকেরা। সরকারি ও বেসরকারি পাটকল গুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সঠিক দাম পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বেশির ভাগ এলাকায় ক্ষেত থেকে কৃষকেরা পাট কাটছেন। কোথাও মাঠ থেকে কাটা পাট অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছেন। কোথাও চলছে পাট পচানোর প্রস্তুতি। আবার পঁচানো পাট থেকে আঁশ ছাড়ানোর কাজ চলছে।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও চাষিরা পাট চাষ করে লোকসানে পড়েছিলেন। তাই অনেকে বাধ্য হয়ে অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়েন। মাঝে স্বল্প পরিসরে যারা আবাদ ধরে রেখেছিলেন, তারাই লাভবান হয়েছেন। তাদের দেখেই অন্যরা আবারো পাট চাষে ফিরেছেন। গত বছর পাটের দাম ভালো পাওয়ায় চলতি মৌসুমের শুরুতেই চাষিরা পাট চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। এতে পাটের আবাদ বেড়েছে অনুকূল আবহাওয়ায় ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ বছর দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মতলব উত্তর উপজেলার সুগন্ধি গ্রামের পাট চাষি মোঃ আলাউদ্দিন (৪৮) এবার ২৫ শতাংশ জমিতে পাট চাষ করেছেন। তিনি বলেন, আমি প্রতি বছরই পাট চাষ করে থাকি। ফলন এবার ভালো হয়েছে। কঠিন পরিশ্রম করে পাট আবাদ করি। কিন্তু বর্তমান বাজারে পাটের দাম অনেক কম। এতে লোকসানে পড়তে হচ্ছে।

আমান উল্লাহ (৫০) নামে আরেকজন বলেন, গত বছর দুই বিঘা জমিতে পাট আবাদ করে কিছুটা লাভ করতে পেরে এবার আবাদ বাড়িয়েছি। কিন্তু এখন দেখছি আগের থেকে ১ হাজার টাকা কমে গেছে দাম। পাটের উৎপদন খরচ আর বদলি খরচ বাবদ ৫০০ টাকা খরচ সহয়ে বর্তমানে যে পাটের বাজার মূল্য তাতে লোকশানের মুখে পড়তে হবে। সরকার যদি পাটের দাম না বাড়ায় তাহলে আমাদের পাটের আবাদ থেকে সরে আসতে হবে। সরকারের উচিত পাটের মূল্যা বাড়ানো।

পাটের ফলন ভালো হওয়ায় এলাকার ‘মৌসুমী’ শ্রমিকদের ব্যস্ততাও বেড়েছে। সুগন্ধি গ্রামের রোশন আরা বেগম, বেনু বেগম ও খোশেদা বেগম জানান, এক আঁটি জাঁক দেওয়া পাট থেকে আঁশ ছাড়িয়ে ২০ টাকা পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে দিনে ১০০ থেকে ১২০ টাকা টাকার মতো আয় হয় তাদের।

এদিকে পাইকাররা বলছেন, মিল মালিকরা পাটের সঠিক দাম না দেয়ার পাশাপাশি গত বছরের বকেয়া বিল থাকায় কৃষকদের কাছ থেকে কম মূল্যে পাট ক্রয় করতে হচ্ছে।

জানা যায়, উপজেলায় গত বছর মণপ্রতিতি ২ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় কৃষক পাট বিক্রি করলেও বর্তমানে তা ১ হাজার টাকা কমে ২ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। এদিকে চলতি মৌসুমে উপজেলায় পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ২৮০ হেক্টর জমিতে ধরা হলেও আবাদ হয়েছে ১৮০ হেক্টর জমিতে। তার মধ্যে দেশীয় জাত পাট ৯০ হেক্টর, তোষা পাট ৮৫ হেক্টর, অন্যান্য ৫ হেক্টর।
মতলব উত্তর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল মোহাম্মদ আলী বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন এবার মুটামুটি আশানুরুপ হয়েছে। কৃষকরা এখন যে পাটের দামটা কিছুটা কম পাচ্ছে। কৃষকরা যদি তাদের উৎপাদিত পাটের সোনালী আঁশগুলো কিছুদিন মজুদ রাখে তাহলে আশা করি দেড় মাস কিংবা দু’মাসের মধ্যে দামটা আরো বাড়বে। তখন কৃষকরা ভালো দাম পেতে পারে।
কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল মোহাম্মদ আলী আরও বলেন,চলতি বছরে উপজেলায় ২৮০ হাজার হেক্টর জমিতে পাটের চাষাবাদ হয়েছে। এবার প্রতিহেক্টর জমিতে ১.৬ মেট্রিকটন ফলন হয়েছে। এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে আশাকরি পাটের যে সোনালী দিন ছিলো সেটা আমরা খুব কম সময়ের মধ্যেই ফিরে যেতে পারবো। এ উপজেলায় পাট উৎপাদন ভালো হওয়ায় চাষিদের নিয়মিত বিভিন্ন পরামর্শ ও সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এবার আশা করছি ন্যায্য দাম পেলে কৃষক লাভবান হবে। সে ক্ষেত্রে সামনের বছর আরো দিগুন জমিতে পাট উৎপাদনে কৃষকরা ঝুকবে। লক্ষ্যমাত্রাও দ্বিগুন অর্জন হবে। পাটের উৎপাদনও বাড়বে।

প্রতিবেদক: খান মোহাম্মদ কামাল,৭ আগস্ট ২০২৩

Share