ভূমিকম্প সম্পর্কে যে বিষয়টি জেনে রাখা জরুরি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপের তথ্যমতে, গত ৬ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় ভোর ০৪:১৭টায় তুরস্কের গাজিয়ানতেপ শহরের নিকটবর্তী প্রায় ১৭.৯ কিলোমিটার গভীরে রিখটার স্কেলে ৭.৮ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প এবং সেই সঙ্গে ১০০টি আফটার শক রেকর্ড করা হয়েছে।

প্রথম ভূকম্পনের পর ১২ ঘণ্টার মধ্যে আরেকটি ভূমিকম্প তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আঘাত হানে। রিখটার স্কেলে ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূকম্পনটির উৎপত্তিস্থল ছিল এলবিস্তান জেলার কাহরামানমারাস প্রদেশে। ভূমিকম্পের সঙ্গে তুষারপাত ও বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট মহাবৈরী আবহাওয়ায় মৃতের সংখ্যা এ পর্যন্ত ৪১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

এখানে বলা বাহুল্য যে, রিখটার স্কেল হলো একটি ১০ ভিত্তিক লগারিদমিক পরিমাপ। এ পরিমাপে ৬ মাত্রার ভূমিকম্পের চেয়ে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প ১০ গুণ শক্তিশালী। তেমনিভাবে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের চেয়ে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প ১০ গুণ শক্তিশালী। সিসমোলজিষ্টদের মতে, রিখটার স্কেলে ৭.৮ মাত্রার ভূকম্পনটি তুরস্কের এযাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প।

ইউএস ভূতাত্ত্বিক জরিপের ম্যাপ থেকে প্রতীয়মান, এ ভূমিকম্পটি তুরস্ক-সিরিয়ার সীমান্তবর্তী তুরস্কের গাজিয়ানতেপ, কাহরামানমারাস, হাতে, ওসমানিয়া, আদিয়ামান, মালাতিয়া, সানলিউরফা, দিয়ারবাকির ও কিলিস এবং সিরিয়ার আলেপ্পো, হামা ও লাকাতিয়া শহরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিসাধন করেছে। সিরিয়া সীমান্তবর্তী শহর গাজিয়ানতেপ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল, যা তুরস্কের অন্যতম শিল্প এলাকা।

শক্তিশালী এ ভূমিকম্প লেবানন, সাইপ্রাস ও মিসরের কায়রোতেও অনুভূত হয়। প্রায় ২০ লাখ জনবসতিপূর্ণ গাজিয়ানতেপ শহরে অনেক সিরীয় নাগরিক বসবাস করে, যারা ২০১১ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের উদ্বাস্তু। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ভূকম্পনবিদ স্টিফেন হিকসের তথ্য অনুসারে, ১৯৩৯ সালের ডিসেম্বর মাসে তুরস্কের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ও তুষারপাতের মধ্যেই উদ্ধারকাজে ৬৫টি দেশের মোট ৩০০০ স্বেচ্ছাসেবী দল তুরস্ক ও সিরিয়ায় ত্রাণকার্য অব্যাহত রেখেছে। এ ছাড়া তুরস্ক ও উত্তর সিরিয়ার প্রায় ৮০ হাজার উদ্ধারকর্মী হাজার হাজার ধসে যাওয়া ঘরবাড়ি, স্কুল ও হাসপাতাল থেকে মৃতদেহ ও আহতদের উদ্ধারের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যে তুরস্কের ওসমানিয়া শহর, যা ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের কাছে অবস্থিত; সেখানে রাতে বিদ্যুৎ সরবরাহও বিঘ্ন ঘটেছে বলে বিবিসির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক এক সাংবাদিক জানিয়েছেন। ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকাজে সরকারের ভূমিকা নিয়ে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও ধ্বংসস্তূপে আটকাপড়াদের উদ্ধার চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।

ইতোমধ্যে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ক্ষতিগ্রস্ত শহর কাহরামানমারাস পরিদর্শন করেছেন এবং মন্তব্য করেছেন, এ ধরনের বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগে থেকে প্রস্তুত থাকা অসম্ভব।

এখানে একটি বিষয় স্বভাবতই আমাদের মনে আসে যে, বাংলাদেশ ভূমিকম্পে কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ? আমরা কি এ ব্যাপারে কোনো দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি? আর্থ অবজারভেটরি সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবস্থান ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মার টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে।

আমরা জানি, টেকটনিক প্লেটের একটি থেকে অন্যটির হঠাৎ পিছলে পড়ার বিশাল মুক্ত শক্তিই ভূকম্পন হিসাবে পরিলক্ষিত হয়। ঘন জনবসতিপূর্ণ দুর্বল অবকাঠামো দিয়ে তৈরি বাংলাদেশের শহরগুলো ভূমিকম্পে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিল্ডিং কোডের নানারকম ব্যতিক্রম ঘটিয়ে প্রয়োজনীয় মাটি পরীক্ষা ও সঠিক ভিত্তি স্থাপন না করে বহুতলবিশিষ্ট বিল্ডিং একটির পাশে আরেকটি নির্মাণ বাংলাদেশের প্রতিটি শহরকে ভূমিকম্পকালীন জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় সম্পূর্ণ অনুপযোগী করেছে বলে আমার অভিমত।

জরুরি অবস্থায় বহুতল ভবন থেকে লোকজন বের হয়ে আসার প্রয়োজনীয় সিড়ি না থাকায় সব বিল্ডিংই ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া জরুরি অবস্থায় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থার অভাবে ভূমিকম্পকালীন আহত ও মৃতের উদ্ধার কাজ কোনোভাবেই সম্ভবপর হবে না।

বিল্ডিং ও ফ্লাইওভারসহ সবরকম অবকাঠামোতে এক বা একাধিক তরঙ্গমালা তৈরি হতে পারে। ভূমিকম্পের সময় এ তরঙ্গমালার কোনো একটি যদি ভূমিকম্পের তরঙ্গমালার সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে এর ফলস্বরূপ তা রেসোনেন্স (অনুরণন) হয়ে বিশাল শক্তির তরঙ্গমালা তৈরি করে যে কোনো অবকাঠামো ভেঙে ফেলতে সক্ষম। এ কারণে উড়োজাহাজের ডিজাইনের ক্ষেত্রেও এটা দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, এর পাখার তরঙ্গমালার কোনো একটির সঙ্গেও যেন ইঞ্জিনের কোনো তরঙ্গমালার মিল না থাকে।

থাকলে সম্পূর্ণ উড়োজাহাজ ভেঙে পড়বে। ১৯৮৫ সালে সংঘটিত ৮.১ মাত্রার ভূমিকম্পে মেক্সিকো সিটির বিল্ডিংগুলো ভেঙে যাওয়ার মূল কারণ রেসোনেন্স হওয়া। প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূর থেকে আঘাত হানা সিসমিক তরঙ্গ মেক্সিকো সিটির তেমন ক্ষতি করতে পারত না, কিন্তু পুরোনো আমলে তৈরি মেক্সিকো সিটি লেইক বেডের উপর হওয়ায় রেসোনেন্স ত্বরান্বিত হয় এবং এর ফলে প্রায় সব ভবন ভেঙে পড়ে বিপুল ক্ষতিসাধন করে।

এক্ষেত্রে ১৯৮৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে সংঘটিত ভূমিকম্পের পর্যালোচনা ও অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া দরকার। সানফ্রান্সিসকোর এ ভূমিকম্প লোমা প্রিয়েটা ভূমিকম্প নামে পরিচিত। এতে ৬৩ জনের প্রাণহানি হয়, ৩৮০০ লোক আহত হয় এবং আনুমানিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিমাণ সম্পদের ক্ষতি হয়।

ভূমিকম্প শুরু হয় স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায়, যা সান আন্দ্রিয়াস ফল্টের টেকটনিক প্লেটের পিছলে যাওয়ার ফলে সংঘটিত হয়। এ ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল ‘ফরেস্ট অব নিসেনে মার্কস স্ট্রেইট পার্ক’, যা সান্তাক্রুজ পর্বতমালার লোমা প্রিয়েটা শৃঙ্গে অবস্থিত। ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৬.৯ এবং স্থায়িত্ব ছিল ১৫ সেকেন্ড। সানফ্রান্সিসকোর মারিয়ানা ডিস্ট্রিক্ট সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ এর বিল্ডিং, মহাসড়ক ও ফ্লাইওভারগুলো তৈরি হয়েছে কাদামাটি দিয়ে খাদ ভরাট করে। এ ছাড়াও সান্তাক্রুজের অনেক ইট-বালুর বিল্ডিং ৫০ থেকে ১০০ বছরের পুরোনো হওয়ায় তা সম্পূর্ণ ভেঙে যায়।

১৯৮৯ সালে সানফ্রান্সিসকো-ওকল্যান্ডে সংঘটিত ভূমিকম্পে ফ্রিওয়ের উপরের তলা নিচতলার ওপর ভেঙে পড়ে অনেকে হতাহত হয়। এর প্রধান কারণ হলো এ ফ্রিওয়ের অংশটুকু মাডফিলের উপর তৈরি হয়েছিল। ফ্রিওয়ের এ অংশটুকুতে প্রয়োজনীয় রিইনফোর্সমেন্ট করার কারিগরি ভুলের খেসারত দিতে হয় অকারণ প্রাণহানির মধ্য দিয়ে।

সানফ্রান্সিসকোতে সংঘটিত এ ভূমিকম্প থেকে শিক্ষা নিলে আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারব যে, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি-যদি আমরা আমাদের ভবনগুলো মাডফিলের উপর কোনো ধরনের রিইনফোর্সমেন্ট ছাড়া শুধু ইট-বালুতে তৈরি করি। এ হিসাবে ধারণা করা যায়, ৬-৭ মাত্রার ভূমিকম্পে আমাদের রাজধানীর পুরান ঢাকার সব পুরোনো ভবনসহ দেশের অন্যান্য জায়গায় এ ধরনের স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে এবং অগণিত প্রাণহানি, আহত ও সম্পদের ক্ষতিসাধন হবে।

আমাদের দেশে এ ব্যাপারে কোনো রকম সচেতনতা সৃষ্টির সঠিক প্রক্রিয়া ও পদক্ষেপ সরকারি বা বেসরকারিভাবে নেওয়া হচ্ছে কিনা আমার জানা নেই। লক্ষণীয়, এ ভূমিকম্পে বেশিরভাগ মানুষের মৃত্যু হয়েছে ধসে পড়া বিল্ডিংয়ে চাপা পড়ে। এ ধরনের বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের আওতার মধ্যে বিল্ডিং, মহাসড়ক ও ফ্লাইওভার নির্মাণে যথাযথ আগাম ব্যবস্থা গ্রহণে অত্যন্ত কঠোর ও সর্বাধুনিক নিয়ম-পদ্ধতি কার্যকর করতে হবে।

ঘনবসতিপূর্ণ এ দেশে তিনতলা বিল্ডিংয়ের বেশি বহুতল ভবন গড়ার প্রয়োজনীয় শর্তাবলী পূরণে ব্যর্থ যে কোনো আবেদন নাকচ করা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি। এ ছাড়া সরকারি উদ্যোগে জরুরি ভিত্তিতে সারা দেশের সব ঝুঁকিপূর্ণ বিল্ডিং, ব্রিজ ও বিভিন্ন অবকাঠামোর দ্রুত জরিপ করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এ ছাড়া ভূমিকম্প সহনশীল পরীক্ষিত ও কার্যকর আধুনিক কারিগরি ব্যবস্থা ছাড়া কোনো বিল্ডিং, ফ্লাইওভার ও অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি করার কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটনের পরবর্তী ক্ষতি পূরণের আর্থিক ব্যয়ভার বহনের ক্ষমতা এককভাবে বিশ্বের খুব কম দেশেরই আছে। তবে আগাম ব্যবস্থাসংক্রান্ত নীতিমালায় আমরা কঠোর অবস্থান গ্রহণ করলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটনের পরবর্তী ক্ষতিপূরণ অনেকাংশেই কম হবে বলে আমার ধারণা।

মিফতাহুর রহমান : শিক্ষাবিদ, গবেষক, বিজ্ঞান ও কারিগরি পরামর্শদাতা

Share