‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখে মৃত্যু উদযাপন- এই সমাজে তুমিও বাস করো
একত্রিশ বছরের একটি তরুণ জীবন থামিয়ে দিল লিভারের নিষ্ঠুর ব্যাধি। ভারতের চেন্নাইয়ের ভেলোর খ্রিস্টান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ যন্ত্রণার লড়াই শেষে গত ১৫ মে রাতে চিরতরে চোখ বুজলেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর, অভিনেত্রী ও চিত্রনাট্যকার কারিনা কায়সার। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের কিংবদন্তি খেলোয়াড় কায়সার হামিদের কন্যা, যিনি নিজের মেধা ও প্রতিভায় ডিজিটাল বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি পরিচিত ও আপন মুখ হয়ে উঠেছিলেন। তার এই অকাল বিদায় কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক নয়, এটি গোটা সংস্কৃতি অঙ্গনেরও ক্ষতি। কিন্তু মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যা ঘটল, তা আমাদের সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক ভয়াবহ ক্ষত উন্মোচন করে দিল। শোকের বদলে উল্লাস, প্রার্থনার বদলে বিদ্বেষ, মানবিকতার বদলে পাশবিকতা; সোশ্যাল মিডিয়ায় যা চলল, তার ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
প্রশ্ন করতে হবে নিজেদেরকে: আমরা কোথায় যাচ্ছি? একটি জীবনের গল্প, একটি রোগের নির্মম পরিণতি। কারিনার অসুস্থতার শুরু ছিল নিতান্তই সাধারণ জ্বর দিয়ে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ধীরে ধীরে তার শরীরে গুরুতর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং একই সঙ্গে হেপাটাইটিস এ ও ই-জনিত জটিলতায় লিভার ফেইলিউর দেখা দেয়। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে চেন্নাইয়ে নেওয়া হয় তাকে। সেখানে ভেলোরের খ্রিস্টান মেডিকেল কলেজে চিকিৎসকেরা প্রথমে ফুসফুসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু ফুসফুসে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার সময় হঠাৎ রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে নেমে যায়। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মৃত্যুকে আর ঠেকানো গেল না।
কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে পরিচিতি পেলেও সাম্প্রতিক সময়ে কারিনা নিজেকে একজন দক্ষ অভিনেত্রী ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছিলেন। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ‘ইন্টার্নশিপ’ ও ‘৩৬-২৪-৩৬’-এর মতো আলোচিত কাজ রেখে গেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা শেষ করে ফেরা এই তরুণী একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই যাত্রা থামিয়ে দিল মাত্র একত্রিশ বছর বয়সে।
কারিনা শুধু একটি নাম নন; তিনি কারও সন্তান, কারও প্রিয়জন। এখানে একটু থামতে চাই। একটু ভাবতে চাই তাদের কথা, যারা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। কায়সার হামিদ; বাংলাদেশের ফুটবলের এক গর্বিত নাম। গোটা জীবন মাথা উঁচু করে বেঁচেছেন, দেশের জন্য খেলেছেন, সম্মান অর্জন করেছেন। সেই বাবা আজ মেয়েকে হারিয়ে নিঃস্ব। কারিনার মা, যিনি মেয়ের সঙ্গে দূর দেশে হাসপাতালের করিডোরে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছেন, সেই মা আজ বুকশূন্য। কারিনার দুই ভাই, যারা লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য নিজেদের শরীরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছিলেন বোনকে বাঁচাতে; তারা আজ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?
কারিনার বন্ধুরা, সহকর্মীরা, যারা তাকে ভালোবাসতেন; তারা শুধু একজন তারকাকে হারাননি, তারা হারিয়েছেন একজন আপনজনকে।
যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় কারিনার মৃত্যুতে উল্লাস করেছেন, একবার কি তারা ভেবেছেন এই মানুষগুলোর কথা? একবার কি চোখ বন্ধ করে কল্পনা করেছেন; যদি আপনার নিজের মেয়ে, নিজের বোন, নিজের প্রিয়জনের মৃত্যুতে কেউ ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখত, তখন আপনার বুকের ভেতরটা কেমন করত?
কারিনা শুধু একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর নন, শুধু একজন পরিচিত মুখ নন। তিনি একটি পরিবারের প্রাণ। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার পরিবারের মান, সম্মান, স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ। একজন মানুষের মৃত্যুতে যখন উল্লাস করা হয়, তখন শুধু সেই মৃত মানুষকে নয়, তার গোটা পরিবারকে আঘাত করা হয়। সেই বাবাকে আঘাত করা হয়, সেই মাকে আঘাত করা হয়, সেই ভাইদের আঘাত করা হয়; যাদের কোনো অপরাধ নেই, যাদের একমাত্র দুর্ভোগ হলো তারা কারিনাকে ভালোবাসতেন।
ঘৃণার বন্যা: যে দৃশ্য মানতে পারা যায় না মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তে না পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা শুরু হলো, তা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে সহজে হজম করার মতো নয়। ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম ডিসমিসল্যাব কারিনা কায়সারকে কেন্দ্র করে অন্তত ৫৩টি ঘৃণ্য ও বিদ্বেষমূলক পোস্ট শনাক্ত করেছে। এমনকি তিনি লাইফ সাপোর্টে থাকার সময় থেকেই ধর্মীয় শব্দের আড়ালে তার সংকটাপন্ন অবস্থাকে উদযাপন করা হচ্ছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। মৃত্যুর পর সেই প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র ও ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। কেউ লিখেছেন আলহামদুলিল্লাহ’, কেউ উল্লাস করেছেন, আবার কেউ কেউ মৃত একজন নারীর শরীর নিয়ে এমন অশ্লীল ও ধর্ষণের হুমকি-সদৃশ মন্তব্য করেছেন, যা লেখার ভাষা এই সম্পাদকীয়তে নেই।
এখানে একটি কথা স্পষ্টভাবে বলা দরকার: কারও মৃত্যুতে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখে উল্লাস করার এই ঘটনা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া পাপ নয়। ইতিহাস সাক্ষী, বিভিন্ন আমলে, বিভিন্ন সরকারের সময়ে, বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষেরা প্রতিপক্ষের মৃত্যুতে এই ঘৃণ্য আচরণ করেছে। এই নিন্দা তাই সবার জন্য; যে বা যারা এই কাজ করেছেন, করছেন বা করবেন, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, সেই আচরণ সর্বকালে, সর্বাবস্থায় নিন্দনীয় ছিল, আছে এবং থাকবে।
দেশের একটি শীর্ষ জাতীয় দৈনিকে একটি বিশ্লেষণধর্মী লেখা সরাসরি বলেছে, এই আক্রমণের একটি বিশেষ মাত্রা আছে; কারিনা নারী বলেই আক্রমণ এই রূপ নিয়েছে। এটি কেবল রাজনৈতিক বিদ্বেষ নয়, এটি নারীর প্রতি সমাজের দীর্ঘদিনের লুকানো অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রকাশ।
রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন হলেই কি একটি মৃত মানুষের মরদেহ অবমাননার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে? এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে বিবেকবান প্রতিটি মানুষের উত্তর হওয়া উচিত: না, কখনো না।
তুমি যে সমাজকে ঘৃণা করছ, সেই সমাজেই তুমি বাস করো এখানে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু অপরিহার্য কথা বলতে চাই। যে মানুষ আজ কারিনার মৃত্যুতে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখে উল্লাস করছেন, তিনি কি একবার ভেবেছেন যে তিনি নিজে কোন সমাজে বাস করছেন? যে সমাজে মৃত্যুকে উদযাপন করা যায়, যে সমাজে ঘৃণা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ে, সেই সমাজেই তার নিজের পরিবার থাকে। সেই সমাজেই তার মা, বাবা, ভাই-বোন, সন্তান বেড়ে ওঠে।
আপনি যে বিষ ছড়াচ্ছেন, সেই বিষের বায়ু আপনি নিজেও শ্বাস নিচ্ছেন। আজ আপনি যে সংস্কৃতি তৈরি করছেন, কাল সেই সংস্কৃতিই আপনার সন্তানের মাথার উপর ছায়া হয়ে থাকবে। আজ আপনি প্রতিপক্ষের মৃত্যুতে উল্লাস করছেন, কাল যখন আপনার প্রিয়জনের মৃত্যুতে অন্য কেউ একই কাজ করবে, তখন আপনি কী বলবেন?
এই প্রশ্নটি নিছক কাল্পনিক নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, আজকের ক্ষমতাবান কাল অসহায়। আজকের বিজয়ী কাল পরাজিত। আজকের নিন্দুকেরাও একদিন কারো নিন্দার শিকার হবেন। সেই দিনটির কথা মনে রেখে আজ কাজ করুন।
ঘৃণার সংস্কৃতি কোনো দলের জন্য নিরাপদ নয়। কোনো মতাদর্শের জন্য নিরাপদ নয়। এই আগুনে সবাই পোড়ে।
ইসলামের দৃষ্টিতে: ‘আলহামদুলিল্লাহ’ কি মৃত্যুর উৎসবে? যারা কারিনার মৃত্যুতে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখে উল্লাস প্রকাশ করেছেন, তাদের কাছে একটি সরল প্রশ্ন রাখা জরুরি: ইসলাম কি সত্যিই এটি শেখায়?
ইসলামি শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ ও আলেমগণ বহুকাল ধরে বলে আসছেন, কোনো মানুষের মৃত্যুতে শত্রুতাবশত উল্লাস করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা হলো, মৃত ব্যক্তির কুসমালোচনা না করা। ‘লা তাসুব্বুল আমওয়াত’ অর্থাৎ মৃতদের গালি দিও না। এই হাদিসের শিক্ষা আমাদের নবীজির জীবনদর্শনের কেন্দ্রে। মৃত মানুষের আমল আল্লাহর কাছে, বিচার আল্লাহর কাছে। সেই বিচারের আসনে বসার অধিকার কোনো মানুষের নেই।
আলহামদুলিল্লাহ অর্থ ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর’। এটি কৃতজ্ঞতার বাণী, আনন্দের বাণী, আল্লাহর প্রতি মাথানত করার বাণী। একজন মানুষের মৃত্যুতে এই পবিত্র বাণীকে উল্লাসের হাতিয়ার বানানো শুধু ধর্মের অবমাননা নয়, এটি আল্লাহর নামকে রাজনৈতিক ঘৃণার হাতিয়ারে পরিণত করার গুনাহ।
মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় যখন কেউ মারা যান, তখন চিরাচরিত রেওয়াজ হলো তার জন্য মাগফিরাত কামনা করা, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং অতীতের ভুলভ্রান্তিকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা। কারণ সুন্দর বাংলা-মুসলিম সংস্কৃতির যে ঐতিহ্য, তার মূল সুর হলো: ক্ষমাই মহৎ।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সোশ্যাল মিডিয়ার বিষ বাংলাদেশে জুলাই ২০২৪’র বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর রাজনৈতিক মেরুকরণ এক ভয়ানক রূপ নিয়েছে। দুটি শিবির তৈরি হয়েছে এবং প্রতিটি শিবিরের একটি অংশ পরস্পরকে মানুষ হিসেবে দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। এই মানবিক বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রকাশ ঘটে, যখন একজন মৃত তরুণীর পরিচয় শুধু রাজনৈতিক লেবেলে সংকুচিত হয়ে পড়ে।
স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ কোয়ার্টার্লি জার্নালে প্রকাশিত ‘কমান্ডিং দ্য ট্রেন্ড: সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাজ ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রচারণামূলক বার্তাগুলো মানুষের বিদ্যমান পক্ষপাতিত্বকে আরও গভীর করে। যখন কেউ ইতিমধ্যে কাউকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে রাখেন, তখন সেই ‘শত্রু’র যেকোনো বিপদকে উদযাপন করার প্রবণতা মানসিক গড়নের একটি বিকৃতি হিসেবে দেখা দেয়। এই মনোবৈকল্যকে বিশেষজ্ঞরা ‘dehumanization’ বা মানবিক বিচ্ছিন্নতা বলেন। যখন একটি গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে মানুষ হিসেবে না দেখে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে, তখন সেই প্রতিপক্ষের মৃত্যুতে উল্লাস করা মানসিকভাবে সহজ হয়ে পড়ে। এই বিকৃতি ইতিহাসে বড় বড় গণহত্যার পূর্বাভাস হয়ে এসেছে।
সামাজিক মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া এই বিকৃতিকে আরও ত্বরান্বিত করে। কারণ সেখানে ‘echo chamber’ বা একই মতের বদ্ধ গোষ্ঠী তৈরি হয়, যেখানে ঘৃণার বার্তা পুরস্কৃত হয় এবং মানবিকতার বার্তা হারিয়ে যায়। বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া পরিসরে এই প্রবণতা গত কয়েক বছরে যেভাবে বেড়েছে, তা গভীর উদ্বেগের।
এই অন্ধকারের মধ্যেও আলোর রেখা ছিল। লাখো মানুষ কারিনার মৃত্যুতে সত্যিকারের শোক প্রকাশ করেছেন। তার সহকর্মী, নির্মাতা ও ভক্তরা সামাজিক মাধ্যমে গভীর বেদনা প্রকাশ করেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম তার বিবৃতিতে বলেছেন, কারিনা জুলাই আন্দোলনের একজন নির্ভীক কণ্ঠস্বর ছিলেন এবং তার মৃত্যুতে যারা উল্লাস করছেন, তাদের প্রতিক্রিয়া কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়।
অনেক সাধারণ মানুষ, যারা রাজনৈতিকভাবে কারিনার পক্ষে ছিলেন না, তারাও সোচ্চার হয়েছেন এই বিদ্বেষের বিরুদ্ধে। কারণ তারা বুঝেছেন, আজ যে সংস্কৃতির বিস্তার হচ্ছে, তা একদিন তাঁদের নিজেদের দিকেও ঘুরে আসতে পারে। এই বোধটুকুই মানবতার ন্যূনতম শর্ত।
সমাজবিজ্ঞান কী বলে সমাজবিজ্ঞানীরা বহুকাল ধরে চিহ্নিত করে আসছেন যে, যখন কোনো সমাজে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকট থাকে, তখন ‘moral disengagement’ বা নৈতিক বিচ্ছিন্নতার ঘটনা ঘটে। সমাজমনোবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট বান্দুরার গবেষণা অনুযায়ী, মানুষ নিজের ঘৃণ্য আচরণকে বিভিন্ন যুক্তিতে ন্যায্য বলে মনে করতে পারে; যেমন ‘ওরা আমাদের সঙ্গে এটা করেছিল’, বা ‘ওরা মানুষই না’। এই মনোভাব যখন সামাজিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে পড়ে, তখন সমাজের নৈতিক ভিত্তি ভেঙে পড়তে শুরু করে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই মনোভাব শুধু অনলাইনে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বাস্তব জীবনেও সংক্রমিত হচ্ছে। ভিন্নমতের মানুষকে সম্পূর্ণ মানবিক সত্তা হিসেবে না দেখার প্রবণতা যদি সমাজের গভীরে শিকড় গাড়ে, তাহলে ভবিষ্যতের সহাবস্থান কতটা কঠিন হবে, তা ভাবতেও শিউরে উঠতে হয়।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় মৃত্যুর উদযাপন বা মৃত ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক পোস্টের সঙ্গে সমাজে সহিংসতার সংস্কৃতির একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এটি নিছক ডিজিটাল বিষয় নয়, এটি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংহতির সংকট।
আইনের দিক থেকে বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে বিদ্বেষমূলক বা মানহানিকর পোস্ট আইনত দণ্ডনীয়। মৃত একজন নারীর দেহ নিয়ে যৌন হয়রানির হুমকি-সদৃশ মন্তব্য করা শুধু অনৈতিক নয়, এটি সরাসরি বিদ্যমান আইনের লঙ্ঘন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সাইবার স্পেসকে নিরাপদ রাখা এবং এই ধরনের অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের আহ্বান; কারিনা কায়সারের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে ধর্ষণের হুমকি ও অবমাননাকর বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। না হলে এই সংস্কৃতি আরও গভীরে শিকড় গাড়বে।
পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নয় বাংলার চিরন্তন প্রবাদ ‘পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নয়’। এই সত্যটি আমরা শিশুকাল থেকে শুনে এসেছি, কিন্তু প্রয়োগের সময় ভুলে যাই। কারিনা কায়সারের জীবনে বিতর্ক ছিল। ৫ আগস্টের ঘটনাবলিতে তার ও পরিবারের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে একটি পক্ষ তীব্র সমালোচনা করেছে। সেই সমালোচনা ও প্রশ্ন তোলার অধিকার সমাজে থাকা উচিত। কিন্তু একজন জীবন্ত মানুষের মৃত্যুকামনা করা এবং মৃত্যুর পর তার শবদেহ নিয়ে অশ্লীলতায় মেতে ওঠা; এ দুটি কখনো বাকস্বাধীনতার আওতায় পড়ে না। এটি বর্বরতা।
কারিনার সঙ্গে রাজনৈতিক দ্বিমত পোষণকারীরাও যদি বলতেন, ‘আমি তার কাজের সমালোচনা করি, কিন্তু তার মৃত্যুতে আমি শোকাহত’ তাহলে সেটাই হতো মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সেটাই হতো সত্যিকারের জাতিগত পরিপক্বতার প্রমাণ।
নতুন প্রজন্মের কাছে আবেদন যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়, যারা কনটেন্ট তৈরি করেন, যারা পোস্ট করেন, শেয়ার করেন, মন্তব্য করেন তাদের কাছে একটি সরল কথা বলতে চাই: আজকের যে সংস্কৃতি আপনি তৈরি করছেন, আগামীকাল সেই সংস্কৃতির শিকার আপনি নিজেও হতে পারেন। ঘৃণার বীজ বপন করলে ঘৃণার ফসলই জন্মায়। মানবতার বীজ বপন করলে মানবতার ফুল ফোটে।
‘পোস্ট’ করার আগে একবার ভাবুন; এটি পড়লে কারিনার বাবা কেমন অনুভব করবেন? কারিনার মা কেমন অনুভব করবেন? কারিনার ভাইয়েরা কেমন অনুভব করবেন? যদি সেই অনুভূতির কথা ভেবে হাতটা একটু কাঁপে, তাহলে বুঝবেন আপনার ভেতরে এখনো মানবতা বেঁচে আছে। সেই মানবতাকে বাঁচিয়ে রাখুন।
মানুষ হওয়াটাই সবচেয়ে বড় পরিচয় কারিনা কায়সার ছিলেন একজন তরুণী, একজন শিল্পী, একজন মেয়ে, একজন মানুষ। তিনি কোনো রাজনৈতিক প্রতীক নন। তার মৃত্যু কোনো রাজনৈতিক জয়-পরাজয়ের ঘটনা নয়। এটি একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। একজন বাবার বুক খালি হয়ে যাওয়া। একজন মায়ের কোল শূন্য হওয়া। দুই ভাইয়ের বোনহারা হওয়া।
যে সমাজে মৃত্যুকে উদযাপন করা হয়, সেই সমাজ মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যায় আক্ষরিক ও রূপকার্থ উভয় অর্থেই। আর যে সমাজে শত্রুর মৃত্যুতেও মানুষ বলতে পারে, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, আল্লাহ তাকে মাফ করুন’ সেই সমাজই প্রকৃত মানবিক সমাজ।
মনে রাখুন, যে সমাজের ঘৃণ্য আচরণে আপনি বিচলিত হচ্ছেন, সেই সমাজেরই একজন বাসিন্দা আপনি। এই সমাজকে মানবিক করার দায়িত্ব তাই আপনারও। শুধু অন্যকে দোষ দিলে হবে না, নিজেকেও প্রশ্ন করতে হবে আমি কি কখনো এমন কিছু করেছি? করলে কি ফিরে আসার সাহস আছে?
বাংলাদেশ মানবিক সমাজ হওয়ার ক্ষমতা রাখে। আমাদের ইতিহাস, আমাদের সাহিত্য, আমাদের গান, আমাদের সংস্কৃতি সবকিছু মানবতার কথা বলে। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এই সত্য আমরা ভুলিনি, কেবল ভুলে যাচ্ছি।
কারিনার মৃত্যু যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়: মানুষ হওয়াটাই সবচেয়ে বড় পরিচয়, সবচেয়ে বড় রাজনীতি, সবচেয়ে বড় ধর্ম।
বিদায়, কারিনা। তোমার জন্য প্রার্থনা রইল। তোমার পরিবারের জন্য শোক রইল। আর যারা তোমার মৃত্যুতে কষ্ট পেয়েছেন তাদের জন্য রইল এই একটাই প্রত্যাশা: ঘৃণার বদলে ভালোবাসা বেছে নিন। এই বাংলাদেশ তাতেই সুন্দর হবে।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী; গবেষক ও পর্যবেক্ষক, ডেমোক্রেসি উইদাউট বর্ডার্স, প্যারিস, ফ্রান্স