বন্যায় লণ্ডভণ্ড কক্সবাজার, ক্ষতি প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা
চকরিয়ার কৃষক মো. গফুর নিজের জমির দিকে তাকিয়ে নির্বাক। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে জমিতে বাতাসে দুলছিল সবুজ আউশ ধান, সেখানে এখন কাদা আর পলির স্তূপ। পাশের গ্রামের মাছচাষি শাহাবুদ্দিন ভেঙে যাওয়া ঘেরের পাড়ে দাঁড়িয়ে হিসাব মেলানোর চেষ্টা করছেন। কয়েক ঘণ্টার পাহাড়ি ঢলে ভেসে গেছে ১০ লাখ টাকার বেশি মূল্যের মাছ। আর উখিয়ার হলদিয়াপালংয়ের গৃহবধূ ইসমত আরা ভেঙে পড়া টিনের ঘরের পাশে দুই সন্তানকে নিয়ে বসে আছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে। মাথার ওপর ছাদ নেই, ঘরে খাবার নেই, সামনে কী অপেক্ষা করছে, সেই উত্তরও অজানা।
এ তিনটি দৃশ্য আলাদা তিনটি পরিবারের নয়, এবারের বন্যায় বিধ্বস্ত কক্সবাজারের সামগ্রিক চিত্র।
গত ৪ জুলাই থেকে টানা নয় দিনের অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় জেলার জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক সমন্বিত ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জেলার ১০টি উপজেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি পরিবার এবং ২৪ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। প্রাথমিক হিসাবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা। মাঠপর্যায়ের যাচাই-বাছাই শেষে এ ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দুর্যোগে প্রাণহানিও ছিল উদ্বেগজনক। বন্যা, পাহাড়ধস, দেয়ালধস, নৌকাডুবি ও পানিতে ডুবে জেলায় মোট ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা। পাহাড়ধসে মারা গেছেন ১৯ জন, পানিতে ডুবে আটজন এবং দেয়ালধস ও নৌকাডুবিতে প্রাণ গেছে আরও দুইজনের।
জেলার প্রায় সবখানেই দুর্যোগের ছাপ
টানা বৃষ্টিতে মাতামুহুরী, বাঁকখালীসহ বিভিন্ন নদীর পানি দ্রুত বেড়ে যায়। ভেঙে যায় বেড়িবাঁধ, তলিয়ে যায় গ্রামীণ সড়ক, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বহু জনপদ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উখিয়া, চকরিয়া, মহেশখালী, টেকনাফ, সদর ও পেকুয়া উপজেলা। অনেক এলাকায় কয়েক দিন বিদ্যুৎ ছিল না, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, জরুরি সেবাও ব্যাহত হয়।
ঘর হারিয়েছে হাজারো পরিবার
বন্যার সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে মানুষের বসতভিটায়। জেলায় ৬৬৮টি বসতঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে এবং আরও ১৫ হাজার ৮৫০টি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিতে নষ্ট হয়েছে খাদ্যশস্য, আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়, শিক্ষাসামগ্রী ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র।
পানি নেমে গেলেও বহু ঘরে এখনও হাঁটুসমান কাদা। কোথাও দেয়াল ধসে গেছে, কোথাও উড়ে গেছে টিনের চালা। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরে অনেক পরিবার এখনও নিজেদের ঘরে বসবাস শুরু করতে পারেনি।
কৃষিতে বড় ধাক্কা, ক্ষতিগ্রস্ত ১০ হাজার ৪০১ একর জমি
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, আটটি উপজেলায় ১০ হাজার ৪০১ একর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬ হাজার ৪৭২ একর আউশ ধান। এছাড়া ৯১৪ একর আমনের বীজতলা, ২ হাজার ৩৫৯ একর শাকসবজি এবং ৪১০ একর পানবরজ নষ্ট হয়েছে। চকরিয়ায় সর্বোচ্চ ৪ হাজার ১০০ একর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর রয়েছে কুতুবদিয়া, পেকুয়া, রামু, মহেশখালী, সদর, ঈদগাঁও ও উখিয়া।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, আমনের বীজতলা নষ্ট হওয়ায় আগামী মৌসুমের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত বীজ, সার ও প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এক রাতে ভেসে গেল কোটি টাকার মাছ
মৎস্য খাতেও নেমে এসেছে বড় ধরনের বিপর্যয়। জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাবে, বন্যায় ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে ১ হাজার ৯৭ মেট্রিক টন মাছ, ৩৮৫ মেট্রিক টন চিংড়ি, ৩ লাখ ৫৬ হাজার পোনা এবং ২২১ লাখ পোস্ট লার্ভা (পিএল)। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে উখিয়ায়। এরপর রয়েছে মহেশখালী, চকরিয়া, মাতারবাড়ী, টেকনাফ ও সদর উপজেলা।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে ক্ষতিগ্রস্ত মাছচাষিদের সহায়তা দেওয়া হবে।
অবকাঠামো ক্ষতি, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
বন্যায় জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট, সেতু, সংযোগ সড়ক ও প্রতিরক্ষা বাঁধ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও রাস্তা ধসে গেছে, কোথাও সেতুর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে অসংখ্য নলকূপ। বিশুদ্ধ পানির সংকটে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। বহু বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।
আট দিনে ৮২৩ মিলিমিটারের কাছাকাছি বৃষ্টি
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, ৪ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত আট দিনে জেলায় ৮২০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে ৫ জুলাই সর্বোচ্চ ২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এছাড়া ৬ জুলাই ১২৯, ৮ জুলাই ১২৫, ১১ জুলাই ১১৫, ৯ জুলাই ৯৯, ৭ জুলাই ৬৯, ৪ জুলাই ২৮ এবং ১০ জুলাই ১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ১২ জুলাইও বৃষ্টি অব্যাহত ছিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যোগ হয়েছে মানবসৃষ্ট সংকট
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। তার মতে, পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ, খাল ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আইনজীবী মীর মোশারফ হোসেন টিটু বলেন, শুধু ত্রাণ দিয়ে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, কৃষকদের বীজ ও সার, মাছচাষিদের পোনা ও খাদ্য, স্বল্পসুদে ঋণ, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ ও সড়ক সংস্কার, নদী-খাল পুনঃখনন এবং পাহাড় সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মুর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ৮৯০ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ। কিন্তু যে স্বপ্ন ভেঙেছে, যে ঋণের বোঝা বেড়েছে, যে শিশুদের পড়াশোনা থেমে গেছে, আর যে কৃষক ও মাছচাষিরা আবার শূন্য থেকে শুরু করতে বাধ্য হচ্ছেন, তার মূল্য কোনো পরিসংখ্যানে ধরা সম্ভব নয়।
তার মতে, বন্যার পানি ধীরে ধীরে নামছে। কিন্তু কক্সবাজারের মানুষের সামনে এখন শুরু হয়েছে আরও কঠিন এক লড়াই। সেই লড়াই পুনর্গঠনের, পুনর্বাসনের এবং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর।
চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/
১৪ জুলাই ২০২৬