ফরিদগঞ্জে সন্তানসহ পলাতক গৃহবধূ, স্বামীর সংসার ফিরে পেতে হয়েছেন মামলার আসামি!

স্বামীর সংসারে ফিরতে চেয়েছিলেন। ৭ মাস বয়সী কন্যা সন্তানের পিতৃত্ব স্বীকৃতি ও দাম্পত্য অধিকার ফিরে পেতে থানায় করেছিলেন অভিযোগ। কিন্তু সেই অভিযোগই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে গৃহবধূ ইতি আক্তারের জীবনে। এখন তিনি নিজেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের একটি মামলার প্রধান আসামি। গ্রেফতারের ভয়ে সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এরই মধ্যে স্বামীর পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে ডিভোর্স লেটারও। সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে দিন কাটছে ওই গৃহবধূর।

জানা গেছে, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের চাঁদপুর গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস পণ্ডিতের মেয়ে ইতি আক্তারের সঙ্গে পাশ্ববর্তী গোবিন্দপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের হাঁসা গ্রামের মফিজ পাটওয়ারীর ছেলে শরীফ পাটওয়ারীর বিয়ে হয় ২০২৪ সালে। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই দাম্পত্য জীবনে অশান্তি শুরু হয়। ইতির অভিযোগ, স্বামীর অনুপস্থিতিতে শাশুড়ি ও ননদের নির্যাতন এবং স্বামীর যৌতুকের দাবির কারণে তার সংসার ভেঙে পড়ে।

ইতি আক্তার বলেন, “বাবার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা এনে স্বামীর হাতে তুলে দেওয়ার সময় আমি ভালো স্ত্রী ছিলাম। কিন্তু আবার টাকা চাইলে দিতে রাজি না হওয়ায় আমার ওপর নির্যাতন শুরু হয়। স্বামীর অবহেলা, শাশুড়ি-ননদের নির্যাতন সহ্য করেও অনাগত সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কৌশলে আমাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।”

তিনি আরও বলেন, “সন্তান জন্মের পর সাত মাস পেরিয়ে গেলেও শিশুটি বাবার স্নেহ পায়নি। এমনকি সন্তান জন্মের সময় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেও পাশে পাইনি স্বামীকে।”

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন বিচার না পেয়ে ইতি আক্তার সন্তানের অধিকার ও স্বামীর সংসারে ফিরে যেতে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের তদন্ত চলাকালে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মেয়ের বাড়িতে একটি সালিসি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেই বৈঠক ভেস্তে যায়।

ইতির দাবি, সালিসি বৈঠকে তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও পরদিন ২২ এপ্রিলের ঘটনা দেখিয়ে তার শ্বশুর মফিজ পাটওয়ারী একটি “কাল্পনিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের” মামলা দায়ের করেন। মামলায় ইতি আক্তারকে প্রধান আসামি করে মোট ৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে সালিসে উপস্থিত স্থানীয় ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে।

এদিকে, মামলার দিনই ২৬ এপ্রিল চাঁদপুর জজ কোর্টের আইনজীবী রেহানা ইয়াসমিনের মাধ্যমে ইতি আক্তারের কাছে ডিভোর্স লেটার পাঠান তার স্বামী শরীফ পাটওয়ারী।

সালিসি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য জাকির হোসেন, গোবিন্দপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মোহেব উল্যাহ মীর, বালিয়া ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আব্দুল কাদির, সাবেক চেয়ারম্যান আবু তাহের পাটওয়ারী, রাজনৈতিক কর্মী হেলাল উদ্দিন, মাসুদ আলম ও সাংবাদিক মো. ফাহাদসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য জাকির হোসেন বলেন, “ইতি আক্তার দীর্ঘদিন ধরে শিশু সন্তানকে নিয়ে বিচার চেয়ে ঘুরছিলেন। তার শ্বশুর প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ এগিয়ে আসেনি। থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর আমরা সালিসে বসি। সেখানে কথা কাটাকাটি হলেও কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়নি। পরে জেনেছি, মেয়েটিকে ফাঁসাতে উল্টো মামলা দেওয়া হয়েছে।”

গোবিন্দপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মোহেব উল্যাহ মীর বলেন, “তদন্তকারী কর্মকর্তা থানায় বসে বিষয়টি সমাধানের কথা বলেছিলেন। তবে আমরা স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করি। বৈঠকে উভয়পক্ষের অসহযোগিতার কারণে সমাধান হয়নি। শরীফ পাটওয়ারীকে আমি নিজে মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে সরিয়ে দিই। তখন তার শরীরে কোনো রক্তক্ষরণের চিহ্ন দেখিনি।”

ঘটনাস্থলে উপস্থিত বেসরকারি টেলিভিশন মোহনা টিভির প্রতিনিধি মো. ফাহাদ বলেন, “সালিসি বৈঠকটি ২১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তার ভিডিও আমার কাছে রয়েছে।

 মামলায় যাদের আহত বলা হয়েছে, তারা বৈঠক শেষে স্বাভাবিকভাবেই চলে গেছেন—এমন ভিডিও প্রমাণও আছে। তাই মামলার ঘটনাকে কাল্পনিক বলেই মনে হচ্ছে।”

অভিযোগের বিষয়ে ইতি আক্তারের শ্বশুর মফিজ পাটওয়ারী বলেন, “ঘটনাটি ২২ এপ্রিল বিকেলে হয়েছে। সালিসি বৈঠকে আমাদের ওপর হামলা, মারধর ও ছিনতাই করা হয়। আমার ছেলেসহ দুইজন গুরুতর আহত হয়েছে।”

এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মো. জুমায়েত হোসেন বলেন, “ইতি আক্তারের অভিযোগটি আমার তত্ত্বাবধানে রয়েছে। ২১ এপ্রিল স্থানীয়ভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের বিষয়ে আমাকে কেউ অবগত করেনি।”

ফরিদগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, “গৃহবধূর অভিযোগ ও তার শ্বশুরের দায়ের করা মামলা—দুইটিই তদন্তাধীন রয়েছে।”

-শিমুল হাছান, ১৩ মে ২০২৬