চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসে নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গ্রাহকদের হামলায় বিদ্যুৎকর্মীরা আহত হওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতা ও দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগ তুলে নিজ কার্যালয়ে ডিজিএম মো. সাইফুল আলমকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন বিক্ষুব্ধ বিদ্যুৎ কর্মীরা।
রোববার (২৯ জুন) দুপুরে ফরিদগঞ্জ জোনাল অফিসে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় ২০ থেকে ৩০ জন কর্মী “এক দফা, এক দাবি-ডিজিএমের অপসারণ চাই” স্লোগানে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।
ঘটনার সূত্রপাত উপজেলার গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের উত্তর ধানুয়া গ্রামে। বিদ্যুৎ অফিস ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ২৩ জুন অতিরিক্ত লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে চির্কা সাবস্টেশন এলাকা থেকে ধানুয়া গ্রামের একদল ব্যক্তি দুই বিদ্যুৎ কর্মীকে তুলে নিয়ে যায়। ওই ঘটনার পর থেকেই ধানুয়া গ্রামের একাংশের গ্রাহকদের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই রোববার সকালে ডিজিএম মো. সাইফুল আলম কোনো ধরনের পুলিশি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত দুই ব্যক্তির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ ওঠে। নির্দেশ অনুযায়ী চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর এজিএম নাজির উল্লাহর নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ সদস্যের একটি দল উত্তর ধানুয়া গ্রামে অভিযান চালাতে যায়।
সেখানে গ্রামবাসীর সঙ্গে বিদ্যুৎ কর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। অভিযোগ রয়েছে, গ্রামবাসীর হামলায় এজিএম নাজির উল্লাহসহ অন্তত ২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত ও লাঞ্ছিত হন।
আন্দোলনরত বিদ্যুৎ কর্মীদের মধ্যে লাইন টেকনিশিয়ান তহির আহমেদ, লাইনম্যান মমিন, সানোয়ার মোহাম্মদ শুভ, ফেরদাউস খন্দকার, সুজন শেখ, মহন মিয়া, আজহারুল ইসলাম ও শহিদ আলম অভিযোগ করেন, এলাকাটি আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল এবং সেখানে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। তা জানা সত্ত্বেও ডিজিএম কোনো ধরনের পুলিশি নিরাপত্তা ছাড়াই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কর্মীদের সেখানে পাঠিয়েছেন। এতে সহকর্মীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে তারা ডিজিএমের অপসারণের দাবি জানিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করেন।
অন্যদিকে গ্রাহকদের অভিযোগ ভিন্ন। জুয়েল গাজীসহ একাধিক ভুক্তভোগী জানান, গত দুই মাস ধরে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিদ্যুৎ বিলের কাগজ সরবরাহ করা হয়নি। পরে তিন মাসের বিল একসঙ্গে দিয়ে আগের দুই মাসের বিলের ওপর বিলম্ব ফি বা জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে আসায় গ্রামবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
তাদের আরও অভিযোগ, সংযোগ বিচ্ছিন্নের কারণ জানতে চাইলে বিদ্যুৎ কর্মীরা ফিরোজা বেগম নামে এক নারী গ্রাহককে মারধর করেন। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং এলাকাবাসী পাল্টা হামলা চালায়।
একপর্যায়ে স্থানীয় সাংবাদিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে বিদ্যুৎ কর্মীরা বিচ্ছিন্ন করা সংযোগ পুনঃস্থাপন করে এলাকা ত্যাগ করেন।
গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম শেখ এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমি নিজেও এই অব্যবস্থাপনার ভুক্তভোগী। সাধারণ মানুষকে এভাবে হয়রানি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।”
অবরুদ্ধ অবস্থায় ডিজিএম মো. সাইফুল আলম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি শুধু বলেন, “জিএম (জেনারেল ম্যানেজার) আসছেন, তিনিই সব বলবেন।”
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ এরশাদ উল্লাহ জানান, উপজেলার ধানুয়া গ্রামে বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে হামলার সংবাদ পেয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। অবরুদ্ধ বিদ্যুৎ কর্মীদের উদ্ধার করে হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
খবর পেয়ে চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার মো. আতিকুজ্জামান চৌধুরী বিকেলে ফরিদগঞ্জ জোনাল অফিসে পৌঁছান। তিনি বলেন, “আন্দোলনরত কর্মী ও সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য শুনেছি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্ত করে প্রশাসনিক ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ফরিদগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে।
স্থানীয় লোকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ডিজিএমকে অনতিবিলম্বে অপসারণ করে ফরিদগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের আত্মসম্মান রক্ষার করা হোক।
প্রতিবেদক: শিমুল হাছান, ২৮ জুন ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur