কুরবানির তাৎপর্য ও শিক্ষা

আজহা শব্দের অর্থ ত্যাগ,উৎসর্গ। আর ঈদ শব্দের অর্থ উৎসব। ঈদুল আজহা শব্দের অর্থ ত্যাগের বা উৎসর্গের উৎসব। উজহিয়্যা শব্দ ব্যবহার করে সেই পশুকে বোঝানো হয়,যা কুরবানির দিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জবাই করা হয়। অন্যদিকে কুরবুন শব্দ থেকে এসেছে কুরবান। এর অর্থ নৈকট্য, সান্নিধ্য, উৎসর্গ। এটিও আরবি শব্দ। এর ব্যবহার কুরআনেও রয়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আদমের দুই সন্তান হাবিল ও কাবিল কুরবানি করেন।

এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,‘আপনি তাদের আদমের দুই পুত্রের বাস্তব অবস্থা পাঠ করে শোনান। যখন তারা উভয়েই কুরবানি করেছিল, তখন তাদের একজনের কুরবানি গৃহীত হয়েছিল এবং অপরজনেরটা গৃহীত হয়নি’ (সূরা মায়েদা, আয়াত-২৭)। আল্লাহ এখানে কুরবান শব্দ ব্যবহার করেছেন। উর্দু ও ফার্সিতে কুরবানি ব্যবহার হয়।’

কুরবানির আরেকটি আরবি শব্দ হচ্ছে নুসুক। এর অর্থও ত্যাগ, উৎসর্গ ইত্যাদি। যেমন, ‘আপনি বলুন-নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মৃত্যু আল্লাহরই জন্য’ (সূরা আনআম, আয়াত-১৬২)। কুরবানির আরেকটি শব্দ হলো-নাহার। এর অর্থও উৎসর্গ। ‘অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশে নামাজ পড়ুন এবং কুরবানি করুন’(সূরা কাওসার, আয়াত-২)। এ কারণেই কুরবানির দিনকে ইয়াওমুন নাহার বলা হয়। তবে উজহিয়্যা, কুরবানি, নুসুক, নাহার-যে নামেই বলি,সবগুলোর অর্থ ও উদ্দেশ্য কিন্তু এক। সেটা হলো-ত্যাগ, উৎসর্গের মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ।

কুরবানির ত্যাগ-উৎসর্গ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের একটি অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। তিনি আমাদের সবচেয়ে প্রিয়। পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনের জন্য আমরা আমাদের প্রিয় জিনিস উৎসর্গ করি। মহান আল্লাহ আমাদের সবচেয়ে প্রিয় বিধায় বান্দা হিসাবে আমাদের তার জন্য সবেচেয়ে প্রিয় জিনিস উৎসর্গ করতে হয়। সেটা করতে আমরা কতটুকু প্রস্তুত, সেই পরীক্ষাই মহান রব তার প্রিয় বান্দা ও রাসূল ইব্রাহিমের (আ.) মাধ্যমে নিতে চেয়েছেন।

আল্লাহ তাকে স্বপ্নে আদেশ করেছেন বৃদ্ধ বয়সে পাওয়া এবং তরুণ বয়সে উপনীত হওয়া সন্তান ইসমাইলকে (আ.) জবাই করার জন্য। একই স্বপ্ন ইব্রাহিম (আ.) তিন দিন দেখার পর প্রিয় সন্তান ইসমাইলকে বলেন :‘হে বৎস, আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে জবাই করছি। এখন তোমার মত কী? সে বলল,হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্য ধারণকারীদেরও অন্তর্ভুক্ত পাবেন’ (সূরা সাফফাত, আয়াত-১০২)।

এখানে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, দুই নবী যারা পিতা-পুত্রও বটে, তারা একজন আরেকজনকে জবাই করার কথোপকথন করছেন। পিতা বলছেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি তোমাকে জবাই করছি। জবাবে জবাইয়ের শিকার হতে যাওয়া পুত্র বলছেন, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা-ই করুন। নবী-রাসূলগণের স্বপ্নও ওহি এবং আল্লাহর আদেশ পালন করা জীবনের চেয়েও বেশি দামি-পিতা-পুত্র দুই নবী তা-ই প্রমাণ করলেন।

প্রশ্ন হতে পারে, বান্দা আল্লাহর নিজের হাতে তৈরি, সব সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ এবং প্রিয় হওয়ার পরও কেন বান্দাকে জবাই করতে বললেন? আসলে মাশুকে আ’লা তথা সবচেয়ে বড় প্রেমাস্পদ আল্লাহ চেয়েছেন পরীক্ষা করে দেখতে যে, নিজ হাতে বানানো বান্দা দুনিয়ায় যাওয়ার পর তার আদেশ পালন করতে কতটুকু প্রস্তুত থাকে। কতটুকু আনুগত্য প্রকাশ করে। পিতা-পুত্র তথা ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য প্রকাশ করলেন।

ইব্রাহিম (আ.) ইসমাইলকে (আ.) বেঁধে শুইয়ে দিয়ে তার গলায় ছুরি চালানোর সময় ধারাল ছুরি কাজ করছিল না। ‘তখন আমি তাকে ডেকে বলি : হে ইব্রাহিম, তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে। এভাবে আমি সৎকর্মীদের পুরস্কার দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম জবাই করার এক মহান জন্তু’ (সূরা সাফফাত, আয়াত ১০৫-১০৭)।

যুগে যুগে প্রত্যেক জাতির জন্যই কুরবানির বিধান ছিল। ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানির বিধান করে দিয়েছি। তিনি জীবনোপকরণের জন্য যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর ওপর তারা যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে’ (সূরা হজ, আয়াত-৩৪)। কিন্তু বর্তমানে যে কুরবানি প্রচলিত, সেটা শুরু হয়েছে ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইলের (আ.) মাধ্যমে। আমাদের সৌভাগ্য, আল্লাহ ঘোষণা দিয়ে পরীক্ষা নিয়েছেন এবং দু’জন মহান পয়গম্বর সেই পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়ে আমাদের জন্য ত্যাগ-উৎসর্গের পথকে সহজ করে দিয়ে গেছেন।

কুরবানির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাকওয়া অর্জন। আর কিছুই না। কারণ উপহার-উৎসর্গ যার জন্য করা হয়, তিনিই সেটা ভোগ করেন। কিন্তু কুরবানি এবং আল্লাহর নামে অন্যান্য উৎসর্গের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। এখানে যার জন্য উৎসর্গ করা হয়, তিনি ছুঁয়েও দেখেন না, বরং কুরবানিকারী নিজেই তা ভক্ষণ করেন এবং আত্মীয়-স্বজন ও দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করেন। সেটাও আল্লাহর নির্দেশেই।

তিনি বলেন, ‘এবং কা’বার নামে উৎসর্গকৃত উটকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন করেছি। এতে তোমাদের জন্য মঙ্গল রয়েছে। সুতরাং সারিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় তাদের জবাই করার সময় তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো। অতঃপর যখন তারা কাত হয়ে পড়ে যায়, তখন তা থেকে তোমরা আহার করো এবং আহার করাও যে কিছু যাচ্ঞা করে না তাকে এবং যে যাচ্ঞা করে তাকে।

এমনিভাবে আমি এগুলোকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু তার কাছ পৌঁছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা করো এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন।

সুতরাং সৎ কর্মশীলদের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন’ (সূরা হজ্জ, আয়াত ৩৬-৩৭)। এখানে কুরবানির তাৎপর্য ও শিক্ষা বর্ণনা করার পাশাপাশি কুরবানির গোশতের বণ্টনের নিয়মও আল্লাহ বলে দিয়েছেন। কুরবানির গোশত নিজের, হাত পাতা ভিক্ষুকের এবং হাত না পাতা সম্ভ্রান্ত আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর। তাই কুরবানির গোশতকে আমরা তিন ভাগ করে থাকি।

কুরবানি কবুল হওয়ার জন্য তাকওয়া তথা অন্তরের সুপ্ত বাসনাই হচ্ছে আসল। আল্লাহ বলেছেন, তার কাছে রক্ত-মাংস পৌঁছায় না। কিন্তু তার কাছে যায় মনের তাকওয়া। মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) ‘তাকওয়া এখানে’ তিনবার বলে কলবের দিকে ইশারা করেছেন।

তাকওয়া অর্জনের জন্য পরিপূর্ণভাবে খাঁটি মনে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের জন্য হতে হবে কুরবানি। ‘মানুষ কী বলবে’, ‘আমার সন্তান কার দরজায় যাবে’-এমন চিন্তা যদি কুরবানির উদ্দেশ্য হয় তবে গোশত খাওয়াই হবে কুরবানির মূল উদ্দেশ্য, তাকওয়া অর্জন হবে না। আর যদি আল্লার সন্তুষ্টিই একমাত্র উদ্দেশ্য হয় তবে আপনার-আমার কুরবানির গোশত অন্য কোথাও চলে যাবে না।

বর্তমানে অনুষ্ঠানসর্বস্বতা ও লৌকিকতা আমাদের ওপর তীব্রভাবে ভর করেছে। অথচ ইসলাম আনুষ্ঠানিকতা ও অনুষ্ঠানসর্বস্ব কোনো জীবনবিধান নয়। এর প্রতিটি ইবাদত-বন্দেগি হতে হবে রিয়ামুক্ত। লৌকিকতা ও লোক দেখানো ইবাদত-বন্দেগিকে এত বেশি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে যে, রিয়া তথা লোক দেখানো কর্মকে শিরকে খফি বা ছোট শিরক বিবেচনা করা হয়েছে ইসলামে। ইতিহাসের প্রথম আদম সন্তান হাবিল-কাবিলের কুরবানির মতো কবুল হয়েছে কী হয়নি-অগ্নিসূচির মাধ্যমে আমাদের কুরবানির কোয়ালিটিও যদি দেখানো হতো, তাহলে আমরা কি মুখ দেখাতে পারতাম! ভাবার বিষয় বৈকি।

আল্লাহর সৃষ্টি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কত জীবের ভয়ে আমরা প্রতিনিয়ত তটস্থ থাকি। অথচ বিশাল বিশাল জন্তুকে তিনি মানুষের অনুগত করে দিয়েছেন। সেগুলোকে তার নামে উৎসর্গ করাই কুরবানি। এজন্যই আল্লাহ কুদরতিভাবে কুরবানিযোগ্য পশুর প্রাচুর্যও দান করেছেন। গরু-মহিষ, উট, ছাগল, দুম্বা ইত্যাদি একদিনেই কোটি কোটি জবাই হওয়ার পরও ঘাটতি দেখা যায় না। এমনকি পরের বছরের কুরবানির জন্য পশু পাওয়া যাবে কিনা, সে চিন্তাও করতে হয় না। আমাদের দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। আমদানির সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে কীভাবে আমরা কুরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেছি!

কুরবানি ইসলামের অন্যতম নিদর্শন। কুরবানির জন্য প্রস্তুতকৃত পশুকে কুরআনে আল্লাহর নিদর্শন বলা হয়েছে এবং এই নিদর্শনকে সম্মান করাকে অন্তরের তাকওয়া বলে অভিহিত করা হয়েছে। সর্বোপরি, তাকওয়ার বাইরে কুরবানিতে রয়েছে সমাজের প্রতিটি সদস্যের কল্যাণ। হাত পাততে না পারা এবং হাত পাততে পারা মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবার জোগান হয় কুরবানির মধ্য দিয়ে। কুরবানি না করে এ দুই শ্রেণির মানুষকে যদি কেউ অর্থ দান করে, তবে কতটুকু করবে? ১/২ কেজি খাসি বা গরুর গোশত কিনে দেওয়া বা কিনে খাওয়ার পয়সাদানের মতো মানসিকতা কতজনের আছে? ভিক্ষকের প্রতি মানুষের আচরণ তো সবারই জানা। কিন্তু কুরবানি উপলক্ষ্যে তারা মেহমানের মর্যাদা পায়।

ইসলামের অন্যতম উত্তম একটি কাজ হচ্ছে অন্যকে খাওয়ানো। উত্তম কাজ কোনটি-এক সাহাবির প্রশ্নের জবাবে রাসূল (সা.) বলেন : তুমি অপরকে খাবার খাওয়াবে এবং চেনা-অচেনা লোকদের সালাম দেবে’ (বুখারি)। তাকওয়া অর্জন, পুষ্টিকর খাবার ও নগদ অর্থ (পশুর চামড়ার) দান-বহুবিদ কল্যাণ রয়েছে কুরবানিতে। জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ সময়ের মধ্যে সুস্থ মস্তিষ্ক ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির কাছে দৈনন্দিন অপরিহার্য খরচের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ অর্থ (রূপার ক্যারেটভেদে ৬৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার) থাকলে তার ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব হবে, অন্যথায় নয়। আল্লাহ আমাদের বোঝার ও আমলের তাওফিক দান করুন।

সাইফুল ইসলাম : প্রভাষক (ইসলামিক স্টাডিজ), সামাজিক বিজ্ঞান, মানবিক ও ভাষা স্কুল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

Share