জাহাঙ্গীরনগরে মাস্টার্সে সিজিপিএ- ৪.০০ পেলেন শাহরাস্তির সন্তান রাতুল শাকিল

চাঁদপুরের শাহরাস্তির কৃতী সন্তান রাতুল শাকিল। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা ও জ্ঞানচর্চার প্রতি আগ্রহী এই তরুণ বর্তমানে দেশের অন্যতম স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (icddrb)-এ গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। একাডেমিক সাফল্য, গবেষণা, বিতর্ক ও নেতৃত্ব—সব ক্ষেত্রেই নিজের মেধা ও পরিশ্রমের স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগ থেকে সম্প্রতি মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন রাতুল শাকিল। মাস্টার্সে তিনি ৪.০০-এর মধ্যে ৪.০০ সিজিপিএ অর্জন করেছেন এবং ৬০ শিক্ষার্থীর ব্যাচে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। এর আগে একই বিভাগ থেকে স্নাতকেও ৪.০০-এর মধ্যে ৩.৮৫ সিজিপিএ পেয়ে ৬০ শিক্ষার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন।

তার মাস্টার্সের গবেষণার বিষয় ছিল Extended-Spectrum Beta-Lactamase (ESBL)-producing E. coli নিয়ে One Health ভিত্তিক গবেষণা। এই গবেষণায় ক্লিনিক্যাল, পরিবেশ ও পোলট্রি উৎস থেকে পাওয়া জীবাণুর জিনগত বৈশিষ্ট্য, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক্ষমতা ও সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন তিনি।

গবেষণায় নিজেকে তৈরি করছেন

শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি গবেষণাক্ষেত্রেও দ্রুত নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন রাতুল। ২০২৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত icddr,b-এর Food Safety and One Health Laboratory-তে মাস্টার্স থিসিস শিক্ষার্থী ও গ্র্যাজুয়েট ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করেন। সেখানে ৪০১টি ESBL-producing E. coli isolate নিয়ে বৃহৎ পরিসরের জিনোমিক গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। Illumina NextSeq 2000 প্ল্যাটফর্মে Whole Genome Sequencing (WGS), অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স জিন শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন বায়োইনফরমেটিক্স টুল ব্যবহারের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

বর্তমানে icddr,b-এর One Health Laboratory-তে Research Fellow হিসেবে কাজ করছেন তিনি। কোষভিত্তিক গবেষণা, pseudovirus engineering, molecular biology, vaccine-related research, antiviral drug discovery এবং বিভিন্ন functional assay নিয়ে কাজ করছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশি ও মালয়েশিয়ান Nipah virus strain-এর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতামূলক গবেষণাতেও যুক্ত আছেন।

মেধার স্বীকৃতি এসেছে বারবার

রাতুলের এই পথচলায় এসেছে একাধিক পুরস্কার ও বৃত্তি। বাংলাদেশ সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের National Science & Technology (NST) Fellowship অর্জন করেছেন তিনি। ২০২৬ সালের AMR Fest-এ National AMR Quiz Plus & Extempore Speech Competition-এ Champion ও Best Speaker হওয়ার গৌরবও রয়েছে তার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাভিত্তিক বৃত্তিও তিনি ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে পেয়েছেন।

শুধু পড়াশোনা ও গবেষণায় নয়, বিতর্ক ও জনসম্মুখে বক্তব্য রাখার ক্ষেত্রেও রয়েছে তার উজ্জ্বল সাফল্য। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে World Universities Debating Championship (WUDC)-এ অংশ নিয়েছেন। মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিতর্ক প্রতিযোগিতায়ও অংশগ্রহণ করেছেন। জাতীয় পর্যায়ে একাধিক আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় গ্র্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।

নেতৃত্বেও রেখেছেন দক্ষতার পরিচয়

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় Biochemistry & Molecular Biology Journal Club-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রাতুল। সেখানে নিয়মিত একাডেমিক আলোচনার আয়োজনের পাশাপাশি ৪০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে গবেষণাপদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণে সহযোগিতা করেছেন। এছাড়া Biochemistry Student Forum-এর Research & Education Secretary এবং Jahangirnagar University Debate Organization-এর English Debate-এর Vice President হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষাদানের প্রতিও রয়েছে তার গভীর আগ্রহ। Sena Public School & College এবং Savar Cantonment Public School & College-এ English Debate Head Coach হিসেবে কাজ করেছেন। পাশাপাশি ২০২০ সাল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের Chemistry ও Biology-এর Academic Tutor হিসেবে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন।

স্বপ্ন শিক্ষকতা ও গবেষণায়

সাফল্যের এই দীর্ঘ পথচলার পরও রাতুল শাকিলের লক্ষ্য কেবল নিজের ক্যারিয়ার গড়া নয়। তার স্বপ্ন শিক্ষকতা ও গবেষণাকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া—জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা ও গবেষণার আগ্রহ তৈরি করা।

চাঁদপুরের শাহরাস্তির মাটি থেকে উঠে এসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ একাডেমিক সাফল্য অর্জন এবং বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার মাধ্যমে রাতুল শাকিল ইতোমধ্যে নিজের এলাকার জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছেন।

তার এই অর্জন শুধু একটি সিজিপিএ ৪.০০ পাওয়ার গল্প নয়; এটি অধ্যবসায়, গবেষণার প্রতি ভালোবাসা, নেতৃত্ব এবং নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গল্প।

চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬