বরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান
বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ১০৩তম এ বছর জন্মবার্ষিকী। ১৯২৩ সালের এ দিনে নড়াইলের মাছিমদিয়ায় এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবার নাম মেছের আলী এবং মায়ের নাম মাজু বিবি। গ্রামীণ জীবন,কৃষক-শ্রমিক এবং তাদের পেশিশক্তিকে রং-তুলির ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছিলেন শিল্পী সুলতান। চিত্রকলায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকসহ দেশ-বিদেশে অসংখ্য পদক ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।
শিল্পী সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কোরআন খতম,শিল্পীর মাজারে শ্রদ্ধাঞ্জলি, শিশুকিশোরদের চিত্রাঙ্কন উৎসব, আর্ট ক্যাম্প, চিত্রপ্রদর্শনীর উদ্বোধন,আলোচনা সভা এবং এসএম সুলতান সম্মাননা পদক বিতরণ।
এ বছর সুলতান সম্মাননা পদক পাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী, প্রিন্টমেকার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলাসহ অন্যান্য অতিথি উপস্থিত থাকবেন।
এসএম সুলতানের জীবন ও কর্ম
চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ডাকনাম ছিল ‘লাল মিয়া’। তার বাবা পেশায় ছিলেন রাজমিস্ত্রি ও কৃষক। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় বেশি দূর এগোতে পারেননি সুলতান। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার পর তার স্কুলজীবনের ইতি ঘটে। এরপর তিনি বাবার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন।
তবে ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তার প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। বাবার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ করার পাশাপাশি তিনি দালানকোঠার ছবি আঁকা শুরু করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি কলকাতার আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়ে প্রায় তিন বছর চিত্রকলার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই তিনি বেরিয়ে পড়েন।
সুলতান পাকিস্তান, কাশ্মীর ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। ভ্রমণ ও সাধনার মাধ্যমে নিজেকে একজন বিশ্বমানের চিত্রশিল্পী হিসেবে গড়ে তোলেন।
জীবদ্দশায় কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ছবির প্রদর্শনী বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে তিনি এসব দেশে বেশ কয়েকটি একক ও যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নেন। দেশের ভেতরে ঢাকা ও নড়াইলে তার বিখ্যাত চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে এবং ১৯৮৭ সালে গ্যোথে ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত প্রদর্শনীগুলো তার খ্যাতি ছড়িয়ে দেয়।
বিশ্বখ্যাত এই বাংলাদেশি চিত্রশিল্পীর চিত্রকর্মের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রামীণ জীবন ও অতিবলিষ্ঠ পেশিবহুল কৃষক সমাজ। তার বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে ‘চর দখল’, ‘ধান কাটা’, ‘পাট কাটা’, ‘কৃষকের সংগ্রাম’ ও ‘আমার গ্রাম’ উল্লেখযোগ্য।
চিত্রশিল্পে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এসএম সুলতান ১৯৮২ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। এ ছাড়া তিনি দেশ-বিদেশে অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর শিল্পী সুলতানের মৃত্যুর পর তার স্মৃতি সংরক্ষণে ২০০৩ সালে প্রায় এক একর জমির ওপর স্মৃতি সংগ্রহশালা ও শিশুস্বর্গ তৈরি করা হয়। এ ছাড়া শিল্পীর নামে একটি আর্ট কলেজও প্রতিষ্ঠা করা হয়।
শিশুস্বর্গে বর্তমানে সপ্তাহে দু’দিন শিশুরা ছবি আঁকা শেখে। কোমলমতি এসব শিশু শিল্পী এসএম সুলতানের মতো চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ছবি আঁকা শিখছে।
শিশু শিক্ষার্থী অজিহা কবির জানায়,সে সপ্তাহে দু’ দিন আর্ট শিখতে আসে। প্রাকৃতিক দৃশ্য,নদী,খাল,বিল,এসএম সুলতান,মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন,জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ছবি আঁকা শিখেছে। বড় হয়ে এসএম সুলতানের মতো শিল্পী হতে চায় সে।
সুলতান সংগ্রহশালাকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি
এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায় রয়েছে শিল্পীর আঁকা দুর্লভ কিছু ছবি ও তার ব্যবহার্য জিনিসপত্র। সংগ্রহশালায় বর্তমানে তার ২৩টি দুর্লভ চিত্রকর্ম এবং ৫৩টি রেপ্লিকা রয়েছে। শিল্পীর আরও চিত্রকর্ম থাকলেও স্থানসংকুলান না হওয়ায় সেগুলো প্রদর্শন করা যাচ্ছে না। সংগ্রহশালাটি সম্প্রসারণে জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে।
মাত্র প্রায় এক একর জমির ওপর স্থাপনা দেখে ঘুরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থীরা পরিপূর্ণ আত্মতৃপ্তি পান না। রাজধানীর মিরপুর থেকে কলেজছাত্রী হাসিবা ইসলাম তার পরিবারের সঙ্গে সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায় ঘুরতে এসেছিলেন। শিল্পীর ছবিগুলো দেখে ভালো লাগলেও জায়গা কম হওয়ায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমা তার বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায় ঘুরতে এসেছিলেন। তিনি এসএম সুলতানের নৌকাটি (ভাসমান শিশুস্বর্গ) মেরামত করে নদীতে ভাসানোর দাবি জানান।
এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালার কিউরেটর তন্দ্রা মুখার্জী বলেন,‘পদ্মা সেতু ও মধুমতি সেতু চালুর পর এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায় দর্শনার্থী বেড়েছে। বর্তমানে শিল্পী সুলতানের ২৩টি দুর্লভ চিত্রকর্ম এবং ৫৩টি রেপ্লিকা রয়েছে। শিল্পীর আরও চিত্রকর্ম থাকলেও স্থানসংকুলান না হওয়ায় প্রদর্শন করা যাচ্ছে না। সংগ্রহশালাটিকে পর্যটনবান্ধব করতে জমি অধিগ্রহণসহ কিছু স্থাপনা নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে সুলতান সংগ্রহশালাটি একটি পর্যটনকেন্দ্রে রূপ নেবে।
‘এ ছাড়া সুলতানের নৌকাটির একটি রেপ্লিকা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। রেপ্লিকাটি তৈরি করা গেলে আগের মতো শিশুশিক্ষার্থীরা নৌকায় ভেসে ভেসে মনের আনন্দে ছবি আঁকতে পারবে। পাশাপাশি দর্শনার্থীরাও ইচ্ছা করলে নৌকাটি ব্যবহার করে বিনোদনের সুযোগ পাবে। এ ব্যাপারে আশা করি,প্রকল্পটি অনুমোদন হলে সংগ্রহশালার পরিধি বাড়বে এবং এটি পর্যটনবান্ধব হয়ে উঠবে।’
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এ জি