খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা : সালাহউদ্দিন আহমেদ,বীর উত্তম

সালাহউদ্দিন আহমেদ ছিলেন নৌ-কমান্ডো দলের অন্যতম সদস্য। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও আত্মত্যাগের জন্য তাকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। বীর উত্তম খেতাবে তার সনদ নম্বর ৪৬। সালাহউদ্দিন আহমেদের জন্ম ১৯৪৫ সালে চাঁদপুর সদর উপজেলার দাসাদী গ্রামে । মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ রাইফেলসের উপ-সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের আগে সালাহউদ্দিন আহমেদ ইপিআরে কর্মরত ছিলেন। তার কর্মস্থল ছিল চট্টগ্রাম সেক্টরের অধীনে হালিশহরে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে প্রতিরোধ যুদ্ধে শেষে তিনি ভারতে চলে যান। পরে তাকে মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডো দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তো বটেই, বিশ্বের ইতিহাসেও অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৌ অপারেশনগুলোর একটি বলা হয়ে থাকে অপারেশন জ্যাকপটকে। অপারেশন জ্যাকপটে চাঁদপুর নদীবন্দর আক্রমণে অংশ নিয়েছিলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ।

৩ আগস্ট সাবমেরিনার বদিউল আলমের নেতৃত্বে সালাহউদ্দিন আহমেদসহ বাছাইকৃত ২০ জন নৌ কমান্ডোকে চাঁদপুর নদীবন্দরে অপারেশনের জন্য পাঠানো হয়। প্রথমে সামরিক ট্রাকে করে ব্যারাকপুর, এরপর বিমানে করে আগরতলা হয়ে ১২ আগস্ট চাঁদপুরের দাসাদী গ্রামে পৌঁছান সালাহউদ্দিন আহমেদসহ নৌ কমান্ডোরা।

১৪ আগস্ট অপারেশন জ্যাকপটের পরিকল্পনা থাকলেও রেডিওতে নির্ধারিত সময়ে সংকেত না আসায় অন্যান্য বন্দরের মতো এদিন চাঁদপুরেও অপারেশন স্থগিত রাখা হয়। ১৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ৭টায় রেডিওতে অপারেশনের সংকেত আসে। তখন দলনেতা সাবমেরিনার বদিউল আলম সব কমান্ডোকে প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন।

বদিউল আলম মোট ৬টি টার্গেট ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেন। প্রতি দলে ৩ জন করে মোট ৬টি দলে ভাগ করা হয় নৌ কমান্ডোদের। সালাহউদ্দিন আহমেদসহ সব কমান্ডো প্রাণ হাতের মুঠোয় রেখে এ অপারেশন সম্পন্ন করেছিলেন। এ অপারেশনে ২টি স্টিমার,গমবাহী একটি জাহাজসহ ৬টি নৌযান ধ্বংস করেছিলেন নৌ-কমান্ডোরা।

মুক্তিযুদ্ধের ২৯ অক্টোবর চাঁদপুরে সালাহউদ্দিন আহমেদসহ নৌ-কমান্ডোরা বার্মা ইস্টার্ন তেলের ডিপোতে বিস্ফোরণ ঘটান। এ হামলায় কয়েক হাজার গ্যালন তেল পুড়ে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিল টহলরত কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা।

৩০ অক্টোবর চাঁদপুরের লন্ডনঘাটে সুরক্ষিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও মাইন দিয়ে আমেরিকান পতাকাবাহী সমরাস্ত্র ও রসদবাহী জাহাজ এমভি লোরেন ধ্বংস করেছিলেন সালাহউদ্দিন আহমেদসহ ১৫-১৬ জন নৌ-কমান্ডো।

মুক্তিযুদ্ধের ২ নভেম্বর মেঘনা নদীতে তেলবাহী বার্জ দখল অপারেশনে অংশ নেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। এ অপারেশনে তিনিসহ অন্য নৌ-কমান্ডোরা মেঘনা নদীতে পাকিস্তানি সেনাদের জন্য পাঠানো ৩৮৫ ব্যারেল সয়াবিন তেল ছিনিয়ে নেন এবং এগুলো নিলামে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ সংগ্রাম কমিটির কাছে জমা দেন।

নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে চাঁদপুরে নৌ-কমান্ডোরা পাকিস্তানি জাহাজ এমভি সামি আক্রমণ করেন। এতে সালাহউদ্দিন আহমেদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

৪ নভেম্বর দুপুর ১২টার দিকে চাঁদপুর অঞ্চলের নৌ-কমান্ডোরা দেখতে পান,পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র ও রসদবাহী জাহাজ এমভি সামি আমিরাবাদের কাছে মেঘনা নদীতে নোঙর করেছে।

কমান্ডোরা বুঝতে পারলেন,এ জাহাজ এখানে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করবে না। সুতরাং দ্রুত দিনের আলোতেই জাহাজটি ধ্বংস করতে হবে তাদের। ফলে এটি হবে ভীষণ বিপজ্জনক একটি অপারেশন।

তারপরও নৌ-কমান্ডো সালাহউদ্দিন আহমেদ,শাহজাহান কবির এবং সেলিম উল্লাহ মাইন নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যান। ৩ নৌ কমান্ডো বড় একটি নৌকায় যাত্রা শুরু করেন। নৌকার ছইয়ের ভেতর ছিলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ ও শাহজাহান কবির,ওপরে ছিলেন সেলিম উল্লাহ। সালাহউদ্দিন আহমেদ ও শাহজাহান কবিরের পায়ে ছিল ফিনস লাগানো। তাদের বুকে ছিল মাইন এবং কোমরে ড্যাগার।

এক পর্যায়ে তাদের দৃষ্টি সীমানায় চলে এল জাহাজ এমভি সামি। নদীতে তখন অসংখ্য পালতোলা নৌকা। জেলে নৌকাগুলো মাছ ধরছে। তাদের নৌকার ওপর যেন সন্দেহ না পড়ে সেজন্য এবং পাকিস্তানি সেনাদের মনোযোগ সরিয়ে নিতে নৌকার ছইয়ের উপর দাঁড়িয়ে বেসুরো গলায় গান গাইতে ও নাচতে শুরু করেন সেলিম উল্লাহ।

এরই মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং শাহজাহান কবির সন্তর্পণে নৌকা থেকে পানিতে নেমে গেলেন। পাকিস্তানি সেনাদের দৃষ্টি তখন নৌ-কমান্ডো সেলিম উল্লাহর দিকে।

এদিকে সালাহউদ্দিন আহমেদ ও শাহজাহান কবির কচুরিপানা দিয়ে নিজেদের আড়াল করে সন্তর্পণে সাঁতরিয়ে জাহাজের কাছে পৌঁছান। এরপর দ্রুততার সঙ্গে জাহাজে মাইন লাগিয়ে যখন সাঁতরে দূরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন,তখন জাহাজে টহলরত পাকিস্তানি সেনারা তাদের দু জনকে দেখে ফেলে। গালি দিয়ে পরিচয় জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন,‘তাদের পরিবারসহ নৌকা নদীতে ডুবে গেছে। তাদেরই উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। টহলরত পাকিস্তানি সেনারা তাদের কথা বিশ্বাস করে তখন।’

কিছুক্ষণ পর সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং শাহজাহান কবির দ্রুত সাঁতরে ওই জায়গা ত্যাগ করতে লাগলে পাকিস্তানি সেনাদের সন্দেহ হয়। তারা গুলিবর্ষণ শুরু করে। এদিকে সেলিম উল্লাহ নৌকা তীরে নিয়ে চরে দাঁড়িয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিবর্ষণ দেখে তিনিও স্টেনগান দিয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করেন। ঠিক তখনই বিকট শব্দে জাহাজে লাগানো ২টি মাইন বিস্ফোরিত হয়। প্রাণভয়ে পাকিস্তানি সেনারা গুলিবর্ষণ থামিয়ে চিৎকার শুরু করে। কাছাকাছি কোনো জাহাজের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সাইরেন বাজাতে শুরু করে তারা।

কিন্তু ততক্ষণে মাছ ধরার নৌকাগুলো বিপদ টের পেয়ে দূরে চলে গেছে। এমভি সামি যখন তলিয়ে যাচ্ছিল,তখন বিপদ সংকেত শুনে এগিয়ে এসেছিল চাঁদপুরের মতলবগামী কলেরার টিকা ও ঔষধবাহী রেডক্রসের একটি জাহাজ। কিন্তু বিপদের আশঙ্কায় তারাও পরে ফিরে যায়। এরই মধ্যে নৌ কমান্ডো সালাহউদ্দিন আহমেদ ও শাহজাহান কবির সাঁতরে তীরে উঠে ক্রলিং করে সেলিম উল্লাহ খানের কাছে চলে যান। সেখান থেকেই এমভি সামিকে ডুবতে দেখেন তারা।

মুক্তিযুদ্ধের ৭ নভেম্বর পাকিস্তানি ওয়াটার ওয়েজের যাত্রীবাহী জাহাজ এমভি লিলি আক্রমণেও অংশ নিয়েছিলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। এই জাহাজটি মাঝেমাঝে পাকিস্তানি সেনাদের ঢাকা থেকে চাঁদপুরে নিয়ে যেত।

৭ নভেম্বর এমভি লিলি এখলাসপুর বাজারের কাছে নোঙর ফেলে। সালাহউদ্দিন আহমেদসহ নৌ- কমান্ডোরা সেই রাতেই জাহাজটিতে আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু কিভাবে যেন জাহাজের ক্রুরা খবর পেয়ে যায়। দ্রুত ওই জায়গা ত্যাগ করে মোহনপুরের কাছে চরের মধ্যে জাহাজ নোঙর করে রাখে তারা। কমান্ডোরা তখন অন্য একটি মাছ ধরার ট্রলার হাইজ্যাক করে জাহাজের অবস্থান নির্ণয় করেন।

সরাসরি জাহাজের কাছে না গিয়ে ট্রলার কিছুটা দূরে রেখে কমান্ডো সেলিম উল্লাহ এবং শামসুল কবির সাঁতরে জাহাজের কাছে গিয়ে মাইন লাগিয়ে ফিরে আসেন। অন্যদিকে সালাহউদ্দিন আহমেদসহ বেশ কয়েকজন কমান্ডো ও স্থানীয় সংগ্রাম কমিটির সদস্যরা উদ্ধারকারী নৌকা নিয়ে তাদের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন।

কিছুক্ষণ পর মাইন বিস্ফোরিত হয়ে জাহাজ অর্ধেক ডুবে যায়। এরই মধ্যে জাহাজের ক্রুসহ নিরাপত্তারক্ষীরা পালিয়ে যায়। সালাহউদ্দিন আহমেদসহ বাকি নৌ কমান্ডোরা তখন এমভি লিলি থেকে বিপুল পরিমাণ খাদ্য সামগ্রী উদ্ধার করে আনেন এবং আবারও মাইন লাগিয়ে জাহাজটিকে ডুবিয়ে দেন।

১৯৯৫ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সালাহউদ্দিন আহমেদ,বীর উত্তম।

আহমাদ ইশতিয়াক , ২৩ জুন ২০২২
এজি

Share