ফরিদগঞ্জে গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন দিশা, কচুরিপানায় ভাসছে কৃষকের স্বপ্ন

​একসময় ডাকাতিয়া নদী ও আশপাশের জলাশয়ে কচুরিপানার জটলা ছিল স্থানীয় নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার চরম অভিশাপ। নৌ-চলাচলে বাধা আর জলাবদ্ধতা সৃষ্টিকারী সেই আগাছাই এখন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন দিশা দেখাচ্ছে। নদীতে ভেসে থাকা অনাকাঙ্ক্ষিত কচুরিপানা পচিয়ে তৈরি করা ভাসমান বেডে (ধাপ) বিষমুক্ত সবজি ও চারা উৎপাদন করে ভাগ্য বদলাচ্ছেন শত শত কৃষক।

​উপজেলার শোভান এলাকার জলাবদ্ধ প্রাঙ্গণে কয়েক বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে চলছে এ অভিনব ভাসমান কৃষি। স্থানটিতে লাউ,মিষ্টি কুমড়া,লালশাক,শসা, চিচিঙ্গাসহ নানা পদের সবজির সবুজ সমারোহ। এখান থেকে উৎপাদিত বিষমুক্ত সবজি স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রতিবেশী লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লা জেলাতেও।

​স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকাটিতে প্রথম ভাসমান বেডে সবজি চাষ শুরু করে সফল হন উদ্যোমী কৃষক শহীদ তালুকদার। তাঁর সাফল্য দেখে উদ্বুদ্ধ হন অন্যান্য কৃষকেরাও। বর্তমানে শোভান গ্রামেই ১ শ ১০ জন কৃষক বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ভাসমান বেডে সবজি ও চারা উৎপাদনে নিয়োজিত রয়েছেন।

​উদ্যোক্তা কৃষক শহীদ তালুকদার জানান,চলতি মৌসুমে তিনি একাই ৬০টি ভাসমান বেড প্রস্তুত করেছেন। বেড তৈরি,শ্রমিক ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে তাঁর প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। মৌসুম শেষে সবজি ও চারা বিক্রি থেকে অন্তত ১০ লাখ টাকা আয়ের সুসংবাদ আশা করছেন তিনি।

​আরেক কৃষক মিজানুর রহমান বলেন,‘ যে কচুরিপানা পচে দুর্গন্ধ ছড়াত,তা সংগ্রহ করে সারি সারি বেড বানিয়ে এখন আমরা বাড়তি আয় করছি। একই সাথে পরিবারের পুষ্টির চাহিদাও মিটছে। শুধু তা-ই নয়, মৌসুম শেষে বেড পচে গেলে তা জমিতে উন্নতমানের জৈবসার হিসেবেও ব্যবহার করা যাচ্ছে। ’

​তবে সম্ভাবনার এ অগ্রযাত্রায় ক্ষোভের সুরও রয়েছে অনেক প্রান্তিক কৃষকের কণ্ঠে। স্থানীয় কৃষক মো.রাব্বি ও মো.রাজিব অভিযোগ করে বলেন,‘ বহু বছর ধরে আমরা স্বপ্রণোদিত হয়ে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে চাষাবাদ করছি। অথচ কৃষি দপ্তরের প্রকৃত সহায়তা কিংবা প্রণোদনা আমরা পাই না। কৃষি কর্মকর্তারা তাঁদের পছন্দের গুটি কতক লোককে সকল সরকারি সুযোগ-সুবিধা বণ্টন করেন ।’

​অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ফরিদগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কল্লোল কিশোর সরকার জানান,জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ফরিদগঞ্জের নিচু ও জলাবদ্ধ এলাকায় প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে বিভিন্ন কৃষককে সহায়তা দেয়া হয়।

তিনি বলেন,‘ ফরিদগঞ্জে উৎপাদিত চারা পাশের জেলাগুলোতেও জনপ্রিয়। আমরা সরকারি সহায়তার সীমা বাড়াতে নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখছি। প্রকল্পের পরিধি আরও বাড়লে আরও বেশি কৃষককে সরকারি সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হবে। অনাবাদি জলাশয়কে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটানো এ কৃষকদের দাবি-প্রশিক্ষণ,আধুনিক উপকরণ ও সরকারি সুষম সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে ফরিদগঞ্জের ভাসমান সবজি চাষ জাতীয় পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।’

​ প্রতিবেদক: শিমুল হাছান
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
/strong>