এবারও আলু খেতে হবে বেশি দামে, উৎপাদন কম ২০ শতাংশ

চলতি মৌসুমে দেশে ১ কোটি ১৬ লাখ টন আলু উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাঠপর্যায়ের ফলন এরই মধ্যে বাজারে গড়িয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রোগবালাইয়ের কারণে এ বছরও অন্তত ২০ শতাংশ উৎপাদন কম হয়েছে। অন্যদিকে যা উৎপাদন হয়েছে, অভ্যন্তরীণ সংকট ও বাজার অস্থিরতার কারণে ভালো দাম পেতে কৃষকরা অন্তত ৩০ শতাংশ আলু আগাম তুলে বাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন। অর্থাৎ চলতি মৌসুমে উৎপাদিত আলুর ৩০ শতাংশ এরই মধ্যে খাওয়া হয়ে গেছে। পরবর্তী ফলন আসতে আরও ৬-৭ মাসের অপেক্ষা। এ অবস্থায় বছরের বাকি সময় বাজারে চাহিদানুযায়ী আলু সরবরাহ মেলার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। একইভাবে গত বছরের মতো এবারও দেশকে আলু আমদানিমুখী উদ্যোগেই থাকতে হবে।

এর যৌক্তিক কারণও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। কারণ, বছরব্যাপী দেশে আলু সরবরাহ নিশ্চিত হয় হিমাগারে সংরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর সেই সংরক্ষণ উদ্যোগেও গতি কমে গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এরই মধ্যে যে আলু খাওয়া হয়ে গেছে, এর বাইরে অবশিষ্ট যা রয়েছে তার বেশিরভাগ এখনো হিমাগারে সংরক্ষণের জন্য আসেনি। উত্তরাঞ্চলে উৎপাদিত আলুর ২০ শতাংশ এখনো সংরক্ষণই সম্ভব হয়নি। দেশের সবচেয়ে বড় উৎপাদন অঞ্চল মুন্সীগঞ্জের হিমাগারগুলোতে গত বছরের তুলনায় এ বছর ৩০ শতাংশ কম আলু সংরক্ষণ হয়েছে। একইভাবে ঠাকুরগাঁও, রংপুরের মতো জায়গাগুলোতেও আগের তুলনায় ১০-২০ শতাংশ আলু সংরক্ষণ কম হয়েছে। তদুপরি দেশের বিভিন্ন জায়গার হিমাগারে এখন পর্যন্ত যেসব আলু সংরক্ষণ হয়েছে, তার ক্রয় খরচও পড়েছে বেশি। আবার সংরক্ষণ খরচ এবং পরিবহন ব্যয় যোগ হলে যখন সংরক্ষিত আলু হিমাগার থেকে বাজারে আসবে, তার দামও পড়বে বেশি। যে কারণে এ বছর ক্রেতা-ভোক্তাকে বেশি দাম দিয়েই আলু খেতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, ‘গত বছর কোল্ডস্টোরেজে যেসব আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল সেগুলো ৮-১২ টাকা কেজি দরের আলু ছিল। এবারে যেগুলো রাখা হচ্ছে সেগুলো ২৫-৩০ টাকায় কেনা আলু, কৃষকরা এবার এ দামে আলু বিক্রি করেছেন। কয়েকগুণ বেশি দাম দিয়ে এসব আলু যখন বাজারে আসবে, তখন এর দামও বেশি হবে। হয়তো এ বছরও ৫০ টাকার বেশি দামে আলু খেতে হবে।

এবারও কি দেশকে আলু আমদানির উদ্যোগে যেতে হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চাহিদানুযায়ী আলু সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে দেশকে এবারও সেই আমদানিমুখী উদ্যোগে যেতে হবে। নতুবা দাম ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা যাবে না। এরই মধ্যে পটেটো চিপস কোম্পানিগুলোর চাহিদার কারণে এক হাজার টন আলু আমদানি করা হয়েছে।

এর আগে গত বছরও আলু নিয়ে বিরাট হৈচৈ পড়ে দেশে। উৎপাদনে উদ্বৃত্তের দেশ ওই পরিস্থিতিতে গড়িয়েছে সরবরাহ ঘাটতির মুখে। একই অজুহাতে রপ্তানিমুখী অবস্থান থেকে ইউটার্ন নিয়ে দেশ আমদানিমুখী হতে বাধ্য হয়। ফলে তখন আলুর দামও এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়ে। যে কারণে ক্রেতা-ভোক্তাকে ওই সময় পণ্যটি কিনে খেতে হয় ৮০ টাকায়। এ ছাড়া বছরের বড় একটা সময় বাজারে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় আলু বিক্রি হতে দেখা গেছে। পণ্যটির এমন অস্বাভাবিক দাম, সরবরাহ সংকট, সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা ও ধারাবাহিক অস্থিরতা–সব মিলে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যেও ইস্যু হয়ে ওঠে আলু। এতে সরকার হয় বিব্রত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দফায় দফায় বৈঠক হয়। এতেও কিছু না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সরকার আলু আমদানির অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। এ পর্যন্ত দেশে প্রায় ৩০ হাজার টন আলু আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়।

এভাবে আলুর দাম ও সরবরাহ সংকটের মধ্য দিয়ে বছর পেরিয়েছে। এখন নতুন মৌসুমের ফলনও বাজারে গড়িয়েছে। এতে সাময়িক হলেও এখন দাম সামান্য কমে ৪০ টাকায় নেমেছে। যদিও দেশের ফলন মৌসুমে সাধারণত আলুর দাম সর্বোচ্চ ২০-২৫ টাকার ভেতরেই থাকে। এটি শুধু আলুর বেলাতেই নয়, বাজারে অন্যান্য পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রেও এমন অভিন্ন চিত্রের দেখা মেলে।

হিমাগারে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি:

এ পরিস্থিতিতে আলুসহ বাংলাদেশের পচনশীল অন্যান্য পণ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরবরাহ ঠিক রাখতে কোল্ড চেইন ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।

গতকাল বৃহস্পতিবার পল্টনের বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন ও সেভার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড আয়োজিত এ বিষয়ক ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা জানান, দেশে বর্তমানে ৪০০-এর বেশি হিমাগার রয়েছে, যেগুলোতে আলু সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে পেঁয়াজ, টমেটো, গাজর, মাংস, খেজুরসহ বিভিন্ন পণ্য সংরক্ষণের জন্যও জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে। নতুবা দেশ অচিরেই ভয়াবহ রকম খাদ্য সংকটের মুখে পড়বে। কোল্ডস্টোরেজ খাতে বড় বিনিয়োগ এবং দেশে এই বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সরকারকেই উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। এর জন্য সরকারের কাছে কম সুদে মূলধনও চেয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করলেই সংকট হয়, অথচ সংরক্ষণের অভাবে দেশে পেঁয়াজ নষ্ট হয়। এর জন্য স্পেশালাইজড কোল্ডস্টোরেজ দরকার। একইভাবে তরমুজ, আম, টমেটে, গাজরের জন্য কোল্ডস্টোরেজ দরকার। কারণ হাজার হাজার টন এসব খাদ্যপণ্য উৎপাদন করলেও তা একটা সময় মাঠেই নষ্ট হয়। এখানে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য স্টোরেজ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদ ১৩-১৪ শতাংশ। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে আমরা প্রজেক্ট করলে সেটা লাভজনক করা মুশকিল হয়ে পড়বে। এ কারণে সরকার আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বা বিদেশ থেকে ফান্ড নিয়ে যদি ৩-৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়, তাহলে আমরা এ খাতে বিনিয়োগ করতে পারব।

অনুষ্ঠানে রেফ্রিজারেশন, এয়ার কন্ডিশনিং এবং কোল্ড চেইন পলিসি ইমপ্লিমেন্টেশন সংক্রান্ত এফবিসিসিআইর স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ও ব্রামা সভাপতি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, পুরো একটি কোল্ডস্টোরেজ আমদানি করতে আমাদের ১ শতাংশের মতো শুল্ক দিতে হয়। কিন্তু যখন এর একটা পার্টস আমদানি করতে হয়, তখন এই শুল্ক ১৩০ শতাংশ হয়ে যায়। বিনিয়োগের জন্য এটা একটা বড় সংকট।

কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘কোল্ডস্টোরেজ শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নয়, নিরাপদ খাদ্যের জন্যও দরকার। কারণ অনেক খাবারে প্রিজারভেটিভ দিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়, যেটা কোল্ডস্টোরেজে রাখতে হলে দরকার হবে না। এখানেও আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এ লক্ষ্যে দেশে সাপ্লাই চেইনে কোল্ডস্টোরেজে গুরুত্ব ও করণীয় তুলে ধরতে আগামী ১৬ থেকে ১৮ মে পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী বসুন্ধরার আইসিসিবিতে প্রদর্শনীর আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন ও সেভার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। এতে কোল্ডস্টোরেজের নানা প্রযুক্তির প্রদর্শনী থাকবে। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন সেভার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফয়জুল আলম চৌধুরী।

চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/ ২৯ মার্চ ২০২৪

Share