বঙ্গোপসাগরে চার বছরে আহরণ কমেছে ৭১ হাজার টন

দেশের মোট ইলিশ আহরণের প্রায় ৫৫-৬০ শতাংশ আসে বঙ্গোপসাগর থেকে। অথচ গত চার অর্থবছরে সামুদ্রিক ইলিশের আহরণ ৩ লাখ ২২ হাজার থেকে কমে ২ লাখ ৫১ হাজার টনে নেমে এসেছে।

অর্থাৎ এ চার বছরে ইলিশ আহরণ কমেছে ৭১ হাজার টন। সামুদ্রিক ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ায় নদী ও সমুদ্রের ইলিশ আহরণের ব্যবধানও কমেছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতেও বড় ইলিশের ঝাঁক না মেলায় অন্য মাছ আহরণের দিকেই নজর বাড়াতে হচ্ছে তাদের।

সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তর, সামুদ্রিক মৎস্য জরিপ অধিদপ্তর ও মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত অর্থবছরে বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক ইলিশ আহরণের চিত্রে উত্থান-পতন দেখা যাচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সমুদ্র থেকে ২ লাখ ৯০ হাজার টন ইলিশ আহরণ হয়। এরপর ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ লাখ ৪ হাজার টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩ লাখ ১৪ হাজার ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ লাখ ২২ হাজার টন আহরিত হয়,যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে তিন লাখ টন ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮১ হাজার টনে।

সর্বশেষ প্রকাশিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সমুদ্র থেকে ইলিশ আহরণ কমে ২ লাখ ৫১ হাজার টনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ শেষ চার অর্থবছরে সামুদ্রিক ইলিশ আহরণ কমেছে ৭১ হাজার টন বা প্রায় ২২ শতাংশ। ২০১১-১২ অর্থবছরের পরবর্তী ১৩ বছরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সমুদ্র থেকে সর্বনিম্ন পরিমাণ ইলিশ আহরণ হয়েছে। এদিকে সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সমুদ্র থেকে ইলিশ আহরণের চূড়ান্ত তথ্য প্রকাশে আরো অন্তত আট মাস লাগবে। তবে গত অর্থবছরের পরিস্থিতি বিবেচনায় ইলিশের আহরণ আরো কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর নদীর তুলনায় সমুদ্র থেকেই বেশি ইলিশ আহরণ হয়। তবে শেষ পাঁচ অর্থবছরে নদী ও সমুদ্র থেকে ইলিশ আহরণের ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

২০২০-২১ অর্থবছরে সমুদ্রে ইলিশ আহরণ নদীর তুলনায় ৬৩ হাজার টন বেশি ছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭৭ হাজার টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৯ হাজার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৩ হাজার এবং সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নদী ও সমুদ্রের আহরণের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে মাত্র দু হাজার টনে। সব মিলিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নদী ও সমুদ্র থেকে পাঁচ লাখ টন ইলিশ আহরণ হয়েছে,যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পর সর্বনিম্ন।

চট্টগ্রাম নগরীর ফিশারিঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকে মাছবাহী ট্রলার ভিড়লেও অধিকাংশ ট্রলারে ইলিশের পরিমাণ তুলনামূলক কম। বরফের বাক্সে ইলিশের বদলে রূপচাঁদা, লইট্টা ও কোরাল বেশি দেখা গেছে। নিষেধাজ্ঞা শেষে সমুদ্রে ইলিশের যে আশা করেছিলেন আড়তদাররা, তার এক-চতুর্থাংশও পাওয়া যায়নি বলে দাবি তাদের।

সমুদ্রফেরত জেলেরা জানান, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা আগের তুলনায় বেশি থাকায় মাছের স্বাভাবিক বিচরণে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মাছ ধরার অনুকূল পরিবেশ নেই। বড় জাহাজ ও ৩৫-৪০ ফুটের কাঠের নৌকায় ট্রলিং জাল ব্যবহারের কারণে সব ধরনের মাছ তুলে নেয়া হচ্ছে। এতে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের পরিমাণ এখন খুবই কম। সামুদ্রিক ইলিশ আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না। একটি ৩৫-৪০ ফুটের নৌকায় প্রায় ৩০০ মণ মাছ ধারণক্ষমতা থাকলেও সেখানে ৫০০ মণ পর্যন্ত মাছ বহন করা হয়। ট্রলিং জালের ব্যবহার কমানো না হলে বঙ্গোপসাগরে মাছের প্রাচুর্য আর দেখা যাবে না বলে ধারণা করছেন তারা।

ফিশারিঘাটের কায়সার এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. কায়সার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সমুদ্র থেকেই দেশের বেশির ভাগ ইলিশ আহরণ করা হয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে ইলিশ সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক দিন আগে ৫৮ দিন মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। দেশের সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের সবচেয়ে বড় বাজার ফিশারি ঘাটেও ইলিশের সরবরাহ খুবই কম। গত বছর ট্রলিং জালে মাছের ঝাঁক ধরার সময় এক-দেড় ইঞ্চি আকারের ইলিশের পোনাও ধরা পড়েছিল। সমুদ্রে মাছকে বড় হওয়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। এ কারণে ইলিশ আহরণ ক্রমান্বয়ে নিম্নমুখী।’

ব্যবসায়ী ও জেলেরা বলছেন, সমুদ্রে ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক ফিশিং বোট আর নিয়মিত মাছ ধরতে যাচ্ছে না। একটি ট্রলার সমুদ্রে পাঠাতে জ্বালানি, বরফ, খাদ্য ও শ্রমিক বাবদ বড় অংকের ব্যয় হলেও অনেক সময় সে ব্যয়ও উঠছে না। নিষেধাজ্ঞা শেষে সমুদ্রে গেলেও অধিকাংশ ট্রলার কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ পাচ্ছে না। যদিও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ কিছুটা মিলছে, তবে ইলিশ আহরণ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বঙ্গোপসাগরের পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও স্রোতের পরিবর্তনে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ, খাদ্য সংগ্রহ ও প্রজননের পরিবেশ বদলে যাচ্ছে। ফলে মাছ আগের পরিচিত এলাকায় কম আসছে, আর অনেক ইলিশ গভীর সমুদ্রে চলে যাচ্ছে।

বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক মাছ ও মজুদ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ শহিদুল আলম (শাহীন)। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন,‘বঙ্গোপসাগরে যেভাবে নির্বিচারে মাছ আহরণ হচ্ছে, তাতে কয়েক বছরের মধ্যে ইলিশসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ মাছের সংকট আরো প্রকট হবে।

সমুদ্রে মৎস্য আহরণকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও জেলেরা ছোট-বড় কোনো মাছই বাছবিচার না করে ধরছেন। ফলে প্রজননক্ষম মা-মাছ ডিম ছাড়ার সুযোগ পাচ্ছে না, আবার ছোট মাছও বড় হওয়ার আগেই ধরা পড়ছে। বিশেষ করে ট্রলিং জালে যা উঠছে, তার প্রায় সবই ধরে আনা হচ্ছে। এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং সমুদ্রে প্রাকৃতিক মজুদ দ্রুত কমে যাচ্ছে।

দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থাকলেও সবচেয়ে বড় সমস্যা অনিয়ন্ত্রিত মাছ আহরণ। সরকারের নির্ধারিত নিয়মকানুন থাকলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন ও নজরদারির অভাবে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। টেকসই মৎস্যসম্পদ রক্ষায় ছোট ও প্রজননক্ষম মাছ সংরক্ষণে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

২৬ জুরাই ২০২৬
এ জি