আন্তর্জাতিক মঞ্চে অক্টোপ্যাড শিল্পী মোঃ রাজুর অনন্য পথচলা
বাংলাদেশের যন্ত্রসংগীত জগতে নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও প্রতিভার এক উজ্জ্বল নাম মোঃ রাজু। টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর উপজেলার সখিপুর পৌরসভার বাসিন্দা এই গুণী শিল্পীর জন্ম ১৫ এপ্রিল ১৯৮৭ সালে। তাঁর পিতা মোঃ আশরাফ মিয়া ছিলেন একজন খ্যাতিমান বাউল ও বিচার গানের শিল্পী। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বাউল সংগীত পরিবেশন করে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। আর সেই পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকেই সংগীতের প্রতি ভালোবাসার জন্ম হয় মোঃ রাজুর।
মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে বাউল গানের আসরে মন্দিরা বাজানোর মাধ্যমে তাঁর সংগীতজীবনের সূচনা। পরবর্তীতে তিনি বেইজ গিটার শেখেন এবং প্রায় তিন বছর দেশের বিভিন্ন মঞ্চে বেইজ গিটারিস্ট হিসেবে সফলভাবে পারফর্ম করেন। এরপর তাঁর আগ্রহ তৈরি হয় আধুনিক পারকাশন যন্ত্র অক্টোপ্যাডে, যা পরবর্তীতে তাঁর সংগীতজীবনের মূল পরিচয়ে পরিণত হয়।
২০০৭ সালে তিনি অক্টোপ্যাডের শিক্ষক মোঃ শহিদুল ইসলাম-এর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তালিম গ্রহণ শুরু করেন। তাঁর সান্নিধ্যে দক্ষতা অর্জনের পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত স্টেজ পারফরম্যান্স শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি দেশের প্রখ্যাত গুরুজি হানিফ আহমেদের কাছ থেকেও দীর্ঘ সময় অক্টোপ্যাডের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এছাড়া এশিয়ার অন্যতম খ্যাতিমান পারকাশন শিল্পী ও হৃদমের জাদুকর হিসেবে পরিচিত গুরুজি মানিক আহমেদের সান্নিধ্য লাভ তাঁর সংগীতজীবনকে আরও সমৃদ্ধ করে।
সংগীতের এই দীর্ঘ পথচলায় মোঃ রাজুর প্রথম আন্তর্জাতিক সফর ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের সঙ্গে একাধিক সফল স্টেজ পারফরম্যান্সে অংশ নেন। পরবর্তীতে দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী শারমিন দীপুর সঙ্গে একাধিকবার ভারতে সফর করে বিভিন্ন বৃহৎ সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশগ্রহণের সুযোগ পান।
এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের কিংবদন্তি ও জনপ্রিয় শিল্পীদের সঙ্গে একই মঞ্চে পরিবেশনার গৌরব অর্জন করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন খুরশেদ আলম, ফেরদৌস ওয়াহিদ, তপন চৌধুরী এবং প্রয়াত সুবীর নন্দীসহ দেশের বহু স্বনামধন্য শিল্পী।
বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)সহ দেশের প্রায় সব বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে তিনি নিয়মিত সংগীত পরিবেশন ও লাইভ অনুষ্ঠানে যন্ত্রসংগীতশিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন। দেশের বরেণ্য শিল্পীদের পাশাপাশি বর্তমান প্রজন্মের অসংখ্য জনপ্রিয় শিল্পীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
বিশেষ করে ক্লোজআপ ওয়ান তারকা লায়লার সঙ্গে টানা চার বছর ‘প্রাণের টিম ভালোবাসার টিম’ ব্যান্ডের সদস্য হিসেবে সারা দেশে অসংখ্য বড় মাপের স্টেজ শোতে অংশ নেন। এছাড়াও ক্লোজআপ ওয়ান তারকা লালনকন্যা নাসরিন আক্তার বিউটি, নোলক বাবু, গামছা পলাশ, মিজান রাজিব, তামান্না হক, হিরো ফকির, শফি মণ্ডল, আশিক, বাঁধন মোদক, দিতি সরকারসহ বর্তমান সময়ের প্রায় সব জনপ্রিয় শিল্পীর সঙ্গে সফলভাবে মঞ্চে পারফর্ম করেছেন।
২০১৭ সালে মোঃ রাজু সরকারি তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের অন্তর্ভুক্ত হন। এরপর থেকে তিনি বিটিভির বিভিন্ন আয়োজনে দেশের গুণী সংগীতশিল্পী ও যন্ত্রসংগীতশিল্পীদের সঙ্গে নিয়মিত সংগত করে আসছেন।
সংগীতাঙ্গনে তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের যন্ত্রসংগীত শিল্পীদের সরকারি নিবন্ধিত সংগঠন বাংলাদেশ মিউজিসিয়ান্স ফাউন্ডেশন (বিএমএফ)-এর ২০২২ ও ২০২৫ সালের কেন্দ্রীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটে প্রচার সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি প্রখ্যাত গুরুজি বিকাশ রায়ের কাছে অ্যাকোস্টিক ড্রামসের ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন।
নিজের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সম্পর্কে মোঃ রাজু বলেন, “আমি একজন আন্তর্জাতিক মানের যন্ত্রসংগীতশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। সংগীতের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে আরও উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরাই আমার স্বপ্ন।”
পারিবারিক ঐতিহ্য, নিরলস সাধনা, দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের মঞ্চ অভিজ্ঞতায় মোঃ রাজু আজ দেশের যন্ত্রসংগীত অঙ্গনের একজন সুপরিচিত মুখ। তাঁর এই সাফল্যের যাত্রা নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
প্রতিবেদক: সাইদ হোসেন অপু চৌধুরী/
২৯ জুলাই ২০২৬