ইসলাম

ইসলামে অমুসলিমদের অধিকার

ইসলাম অমুসলিমদের সব ক্ষেত্রে মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে। তাদের যথাযথ সম্মান দিয়েছে। যার বিবরণ নিম্নরূপ—

অমুসলিমদের সঙ্গে ওঠাবসা

অমুসলিমদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে ইসলাম নিষেধ করে না। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা ও ওঠাবসা করা বৈধ। তবে তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব স্থাপন করা যাবে না। এমনকি তাদের মসজিদে বসারও অনুমতি আছে।

হজরত হাসান বলেন, যখন সাকিফ গোত্রের প্রতিনিধি রাসুল (সা.)-এর দরবারে হাজির, তখন তারা মসজিদের শেষে গম্বুজের কাছে অবস্থান করে। যখন নামাজের সময় হলো, দলের একজন লোক বলল, হে আল্লাহর রাসুল! নামাজের সময় হয়েছে। এরা একদল অমুসলিম, তারা মসজিদে আছে। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘অমুসলিমদের কারণে জমিন নাপাক হয় না।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৮৫৭৬)

অমুসলিমদের প্রতি জুলুম করা নিষিদ্ধ

নবী করিম (সা.) কারো ওপর জুলুম করতে নিষেধ করেছেন, যদিও মজলুম অমুসলিম হয়। তিনি বলেন, ‘তোমরা মজলুমের বদদোয়া থেকে বেঁচে থেকো, যদিও সে কাফের হয়। তার মাঝখানে আর আল্লাহর মাঝখানে কোনো পর্দা নেই (অর্থাৎ তার বদদোয়া দ্রুত কবুল হয়ে যায়)।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১২৫৭৭)

অমুসলিমদের সঙ্গে ভালো কথাবার্তা

তাদের সঙ্গে শালীন কথাবার্তা বলতে হবে। আচার-আচরণে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালমা (রা.) বলেন, যখন আল্লাহ তাআলা জায়েদ ইবনে সায়ইয়াকে ইসলাম গ্রহণের তাওফিক দিলেন, জায়েদ বললেন, নবুয়তের সব নিদর্শন আমি মহানবী (সা.)-এর চেহারায় অবলোকন করছি; কিন্তু দুটি নিদর্শন এখনো আমি অনুভব করতে পারিনি। এক. তাঁর ধৈর্য তাঁর অজ্ঞতার ওপর প্রাধান্য লাভ করবে। অজ্ঞতা তাঁর ধৈর্যকে আরো বাড়িয়ে দেবে। সাহাবি বলেন, তখন আমি তাঁর সঙ্গে মিশতে চেষ্টা করি, যাতে তাঁর ধৈর্য অনুভব করি।

একবার আমি মহানবী (সা.)-এর কাছে এলাম। আমি তাঁর জামা ও চাদর ধরলাম। তিনি সঙ্গীদের সঙ্গে এক জানাজায় ছিলেন। আমি তাঁর দিকে রুক্ষ চেহারায় তাকালাম এবং বললাম, হে মুহাম্মদ! তুমি কি আমার ঋণ আদায় করবে না? আল্লাহর কসম! তোমরা বনি মুত্তালিব টালবাহানার লোক। এ সময় ওমর (রা.) আমার দিকে তাকালেন। তাঁর চেহারায় চক্ষু ঘোরাফেরা করছে ঘুরন্ত নক্ষত্রের মতো।

ওমর (রা.) আমাকে বললেন, ‘হে আল্লাহর দুশমন! তুমি কি রাসুলকে এমন কথা বলছ, যা আমি শুনছি? তুমি কি এমন কিছু করছ, যা আমি দেখছি? আল্লাহর কসম! মহানবী (সা.) আমাকে বকা না দিলে আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দিতাম।’ রাসুল (সা.) তখন ওমরের দিকে শান্ত, ভদ্র ও মুচকি হেসে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘হে ওমর! আমি ও সে তার চেয়ে উত্তম আচরণের মুখাপেক্ষী। তুমি আমাকে সুন্দরভাবে ঋণ আদায় করতে বলতে পারতে। আর তাঁকে সুন্দরভাবে ঋণ উসুল করার জন্য বলতে পারতে।

হে ওমর! তুমি যাও ও তাঁর হক আদায় করো এবং তাঁকে আরো অতিরিক্ত ২০ সা’ ফল দাও।’ এটি দেখে জায়েদ ইবনে সায়ইয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন এবং রাসুলের সঙ্গে বাকি সব যুদ্ধের ঘটনায় ছিলেন। তাবুক যুদ্ধের বছর তিনি ইন্তেকাল করেন।’ (ইবনে কাসির, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৮০)

অমুসলিম রোগীকে দেখতে যাওয়া

তাদের রোগীকেও দেখতে যাওয়া সুন্নাত। নবী করিম (সা.) অমুসলিম রোগীদের দেখতে যেতেন এবং তাদের ইমানের দাওয়াত দিতেন। তাদের সেবা করতেন।

সহিহ বুখারিতে বর্ণিত, হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ইহুদি গোলাম নবী করিম (সা.)-এর খেদমত করত। যখন সে অসুস্থ হলো, তখন মহানবী (সা.) তাকে দেখতে গেলেন, তার মাথার দিকে বসলেন আর তাকে বললেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ করো! তখন সে তার পিতার দিকে দেখল। পিতা বললেন, তুমি আবুল কাসেমের অনুসরণ করো, ফলে সে ইসলাম গ্রহণ করল। তখন নবী (সা.) এই বলে বের হলেন, আল্লাহর শোকর, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিলেন।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস : ১২৫৬) এভাবে তিনি মৃত্যুর সময় তাদের দেখতে গিয়ে ইমানের দাওয়াত দিতেন এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতেন।

অমুসলিম মৃতদের সম্মান করা

তাদের জীবিতের যেমন হক রয়েছে, তেমনি মৃতেরও হক রয়েছে। তাদের দাফনে সহযোগিতা করতে হবে এবং তাদের জানাজাকেও সম্মান দিতে হবে। কেননা তারা শ্রেষ্ঠ মাখলুক তথা মানবজাতির অন্তর্ভুক্ত।

সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আবদুর রহমান ইবনে আবি লায়লা থেকে বর্ণিত, সাহল ইবনে হুনাইফ ও কায়েস ইবনে সাদ কাদেসিয়াতে বসা ছিলেন। তখন তাঁদের পাশ দিয়ে একটি জানাজা নিয়ে কিছু লোক অতিক্রম করল। এ সময় তাঁরা দুজন দাঁড়িয়ে গেলেন। এরপর তাঁদের বলা হলো, ইনি হলেন কাফের। এটা শুনে তাঁরা বললেন, নবী (সা.)-এর পাশ দিয়ে একসময় এক জানাজা নেওয়া হয়েছিল। এ সময় তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁকে বলা হলো, ‘এটা তো এক ইহুদির জানাজা।’ তখন তিনি বললেন, ‘তা কি প্রাণী নয় (মানব নয়)?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১২১৩)

এ থেকে বোঝা যায়, মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের বিশেষ সম্মান রয়েছে।

অমুসলিমদের অন্যায়ভাবে হত্যা করা নিষেধ

যেসব অমুসলিম মুসলিম দেশে জিম্মি হিসেবে (মুসলিম রাষ্ট্রের আইন মেনে) বসবাস করে, তাদের হত্যা করা যাবে না। তেমনি যারা ভিসা নিয়ে আমাদের দেশে আসে, তাদের হত্যা করা যাবে না। তাদের জানমালের নিরাপত্তা মুসলমানদের মতোই অপরিহার্য।

ইমাম বায়হাকি (রহ.) সুনানে কুবরা নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন, হজরত আবি জানুব আসাদি (রহ.) থেকে বর্ণিত, আলী (রা.)-এর দরবারে এক মুসলিমকে হাজির করা হয়, যে একজন অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করেছে। এ হত্যার প্রমাণও পাওয়া গেছে। তখন তিনি তাকে কেসাস হিসেবে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তখন মৃত ব্যক্তির ভাই এলো এবং বলল, আমি তাকে ক্ষমা করছি। তখন তিনি বললেন, হয়তো তার পরিবার তোমাকে ধমক দিয়েছে, ভীতি প্রদর্শন করেছে, হুমকি দিয়েছে। তখন সে বলল, না। কিন্তু তাকে হত্যা করলে আমার ভাই ফিরে আসবে না। আর তারা আমাকে ‘দিয়াত’ (রক্তপণ) দিয়েছে। তাই আমি রাজি হয়েছি।

আলী (রা.) বললেন, ‘তুমি ভালো করেই জানো, যেসব অমুসলিম আমাদের রাষ্ট্রে নাগরিক হিসেবে থাকবে, তাদের জীবন আমাদের মতো, তাদের রক্তপণ আমাদের মতো।’ (বায়হাকি, হাদিস : ১৫৯৩৪)

হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করল, সে জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না, অথচ তার সুগন্ধি ৪০ বছরের রাস্তার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।’ (বুখারি, হাদিস : ৩১৬৬)

হজরত আবু বাকারা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করবে, আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দেবেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২০৬৪৮)

ইসলাম ।। আপডটে, বাংলাদশে সময় ৪ :৪৪ পিএম, ১৮ নভেম্বর ২০১৬, শুক্রবার
এইউ

Share