অনিয়ম-দুর্নীতিতে অপ্রতিরোধ্য চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) আশাফুল আলম এখন দু’উপজেলার দায়িত্বে। ১৬ বছর মতলব উত্তর উপজেলায় কর্মরত থাকলেও তিনি এখন মতলব উত্তর উপজেলার পাশাপাশ মতলব দক্ষিণ উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন। দু’উপজেলা মিলিয়ে তিনি এখন ১০২ টি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তদারকি কর্মকর্তা। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি যেন অপ্রতিরোধ্য। মন্দ কাজের জন্য তিরস্কার না পেয়ে বরং পেয়েছেন আরেকটি উপজেল দায়িত্ব পালনের পুরস্কার।
২০০৮ সালে মতলব উত্তর উপজেলায় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে যোগদানের পর থেকেই কৌসলে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের মাঝে আধিপত্য বিস্তার করে তাদেরকে আশরাফুল আলমের মতো করে চলতে বাধ্য করে নেন।
মতলবে তার কর্মজীবনের ১৬ বছরের মধ্যে ৭ বছর ছিলেন ভারপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বে। আর ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কাজী ওয়াহিদ মোঃ সালেহ নামক একজন নিতান্তই ভদ্রলোক মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এই বিতর্কিত ও প্রভাবশালী আশরাফুল আলম-ই অলিখিতভাবে ছিলেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। আশরাফুল আলমের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মূল শিক্ষা কর্মকর্তা ওয়াহিদ মোঃ সালেহ কোন ধরনের প্রতিবাদ করার সাহসও পেতেন না।
উপজেলার কয়েকটি মাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানান, একসময়ে মতলবের এমপি এবং আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী মায়া চৌধুরী’র পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠতার কারনে তখন আশরাফুল আলম হয়ে উঠেন আরো বেশি বেপরোয়া। এই আশরাফুল আলম নিয়োগ বনিজ্য, এমপিও, উচ্চতর স্কেলের কাজ করার জন্য নিয়ম বর্হিভূত ভাবে শিক্ষকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় না করে ফাইল উপরে পাঠাতেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে ব্যাপক।
২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি সাবেক মন্ত্রী মায়া চৌধুরী এমপি নির্বাচিত হলে আশরাফুল আলম পুনরায় মতলব উত্তর উপজেলায় ভারপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে ওই বছরেরই ৪ এপ্রিল যোগাদান করেন।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে মতলব উত্তর উপজেলার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ৮ কেন্দ্রের কয়েকজন কেন্দ্র সচিব জানায়, গত ২০২৫ খ্রীঃ এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় কেন্দ্রগুলো থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) আশাফুল আলম উপজেলা প্রশাসনের নাম করে কেন্দ্র সচিবদের থেকে কেন্দ্র প্রতি ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা এবং নিজের জন্য কেন্দ্রপ্রতি ১০ হাজার টাকা হারে উত্তোলন করেছেন। যা তিনি তার দায়িত্বে থাকা সময়েও প্রতি এসএসসিতেই উঠিয়ে থাকতেন বলেও জানা যায়। কয়েকজন কেন্দ্র সচিব আরো জানান, জেলা শহর চাঁদপুর থেকে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র মতলব উত্তর থানায় আনা বাবদ তিনি কেন্দ্রপ্রতি সচিবদের থেকে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা, থানায় প্রশনপত্র শর্টিং এবং পরীক্ষার কয়েকদিন পূর্বে উপজেলা প্রশাসনের সাথে ৮ কেন্দ্র সচিবদের একটি মতবিনিময় সভার নামেও কেন্দ্র সচিবদের থেকে কেন্দ্রপ্রতি দুই থেকে আড়াই হাজার করে টাকা উত্তোলন এখানে যেনে নিয়ম হয়েই দাড়িয়েছে। এ বছরের এসএসসি পরীক্ষার পূর্বও তিনি একই কাজ করেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে । কয়েকজন কেন্দ্র সচিব এমনটাও জানান, এই আশরাফুল সাহেবের কোন দাবির বিষয়ে কোন প্রতিষ্ঠান প্রধান বা কেন সচিব দ্বিমত বা আপত্তি করার সাহসও রাখে না। এসএসসি পরীক্ষা কে ঘিরে উপজেলার ৮ পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে তার রয়েছে আরো নানান রকমের বাণিজ্য।
শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি কার্ডের নামে উপজেলার চরকালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৭ হাজার টাকা, নাউরি আহমদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৬ হাজার টাকা, জমিলা খাতুন উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৪ হাজার টাকা। এই হারে উপজেলার ৫১ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টাকা তিনি কৌশলে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের স্বাক্ষর নিয়ে সেই টাকা আত্মসাৎ করে ফেলেন বলেও নাম প্রকাশ না করা শর্তে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে, নিশ্চিন্তপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আমাদের যে শীটে স্বাক্ষর করতে হয়েছে সেই স্বাক্ষরের স্থানের পাশেই টাকার পরিমাণ লেখা থাকলেও আমাদেরকে অনেককে নিজ প্রতিষ্ঠানের টাকার পরিমাণটাও দেখতে দেওয়া হয়নি।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, উপজেলার ৫১ টি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি উপজেলায় গ্রীষ্মকালীন খেলাধুলার নামে ৪ হাজার টাকা হারে এবং শীতকালীন খেলাধুলার নামে ৪ হাজার মোট ৮ হাজার টাকা হারে উত্তোলন করেছেন। বছরে কেবল খেলাধুলার নামেই তিনি শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ৪ লক্ষ ৮ হাজার টাকা উত্তোলন করেন এবং দুই মৌসুমে সরকারি বরাদ্দের ৫০ হাজার টাকা সর্ব সাকূল্যে বছরে ৪ লক্ষ ৫৮ হাজার টাকা দায়সারাভাবে খেলাধুলা শেষ করে সিংহভাগ টাকাই তিনি আত্মসাৎ করেন বলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের অনেকে অভিযোগ করেন।
১০ গ্রেডের সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হয়েও তিনি নিয়ম বহির্ভুত ভাবে উপজেলার ৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি স্কুল পরিচালনা কমিটি নির্বাচনে ৪১টি উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৩ টি উচ্চ বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটি নির্বাচনের প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব বাগিয়ে নিয়েছিলেন। আর এনিয়ে উপজেলা অন্য অফিসারদের মাঝে ও স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেনী-পেশার মানুষের মাঝে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। স্কুল নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্বে থেকে কাঙ্খিত প্রার্থীকে পাস করিয়ে দেওয়া ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার ছোটখাটো ত্রুটি কে পুঁজি করে প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে মোটাঅংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
খোজখবরে আরো জানা যায়, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল আলম তার সময়কালে নিয়োগ বাণিজ্যের ধরন ছিল কয়েকজন প্রার্থীর কাছ খেকে চাকুরী পাইয়ে দেওয়ার নামকরে মোটা অংকের টাকা নিবে। পরে যার নিয়োগ হবে তার টাকা রেখে অন্যদের টাকা ফেরত দিয়ে দিতেন। আর কিছু প্রার্থীরা চাকুরি না পেয়েও শুধুমাত্র ঘুষের টাকার বেশিরভাগ টাকা ফেরত দেয়ার কারণে এই কর্মকর্তার প্রতি যথেষ্ট সন্তুষ্টও থাকতেন ঘুষ প্রদানকারী চাকরি প্রত্যাশীরা ।
উপজেলার ৫১ টি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ক্রীড়া ও সংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে তাকে কখনো প্রধান অতিথি, কখনোবা বিশেষ অতিথি হিসেবে হলেও রাখতেই হতো। অনুষ্ঠানের ব্যানারে তার নামের সামনে ভারপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার লেখা যাবে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা তা অক্ষর অক্ষরে পালন করতে বাধ্য থাকতেন। এমনকি উপজেলায় তার চেয়ারের পিছনে যে অনার বোর্ডটি সেই বোর্ডে তার নামের সাথে পদবীতে ভারপ্রাপ্ত শব্দ লেখার বিষয়টিও তার প্রভাবের নমুনা হিসেবে প্রমানিত হয় ।
তার প্রভাবের কারনে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা তার অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস পায় না বলে জানান মতলব উত্তর উপজেলার বেশ ক’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান।
বিভিন্ন ক্লাশের (৬ষ্ঠ-১০ম) ব্যাকরণ-গ্রামার বই পাঠ্য করার নামে কিছু বই প্রকাশনী থেকে তিনি মোটামুটি অংকের টাকা নিয়ে বই পাইয়ে দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে ।
তিনি ১০ম গ্রেডে চাকরি করেও ঢাকায় ৪৫ হাজার এবং মতলব উত্তরে ৫ হাজার টাকায় বাসা ভাড়ায় থাকেন। এ নিয়েও উপজেলার শিক্ষকদের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে দীর্ঘদিন যাবত।
উপজেলার ইন্দুরিয়া উচ্চ স্কুল পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জানান, আর্থিক সুবিধা নেওয়ার মাধ্যমে তিনি মতলবের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থাকে একদম ধ্বংস করে দিয়েছে।
উপজেলার চরকারিয়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুল গনি তপাদার জানান, আওয়ামী সরকারের মন্ত্রী পরিবারের সাথে যার পারিবারিক সম্পর্ক দুর্নীতিগ্রস্ত সেই অফিসার কি করে ১৫/১৬ বছর একই উপজেলায় থাকেন ?
ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক (ভারপ্রাপ্ত) শিক্ষা অফিসার আশরাফুল আলম মুঠোফোনে বলেন, ভাই কাজ করতে গেলে ভুলশুদ্ধ থাকতেই পারে। অনেকদিন আমি মতলবে আছি এখন চেষ্টা করতেছি চলে যাওয়ার। আপনার যদি আমার বিষয়ে লেখেন আমার কি করার আছে?
এ বিষয়ে কথা হলে চাঁদপুরের জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ রুহুল্লাহ বলেন, উনার বিষয়ে এত অভিযোগ তো আমি জানিনা। তবে তদন্ত সাপেক্ষে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রতিবেদক: শরীফুল ইসলাম/
৩ মে ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur