Home / জাতীয় / হামে মৃত্যু ৫০০ ছাড়াল

হামে মৃত্যু ৫০০ ছাড়াল

দেশে হাম ও হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু ৫০০ ছাড়াল। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মারা গেছে ৫১২ শিশু। আর গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা) প্রাণ হারিয়েছে ১৩ শিশু। হামে শিশুমৃত্যু না থামার জন্য স্বাস্থ্যগত কিছু কারণের কথা বলছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।

টিকার নির্ধারিত বয়সের আগেই শিশুদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর প্রকোপ বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সাধারণত ৯ মাস বয়সে হাম টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু তার আগেই অনেক শিশু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে, যা অভিভাবকদের জন্য এক বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১২ দিন বয়সি নবজাতক থেকে শুরু করে ১২ বছরের কিশোরীও হাসপাতালে কাতরাচ্ছে হামে আক্রান্ত হয়ে। উচ্চ তাপমাত্রা আর শরীরব্যথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ারও সুযোগ পাচ্ছেন না অভিভাবকেরা। ইতিমধ্যে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ‘হাসপাতালগুলো থেকে সংক্রমিত হচ্ছে শিশুরা।’

ধূসর একটি চাদরে মোড়ানো ছোট্ট একটি শিশুকে কোলে নিয়ে ছুটে চলেছেন এক যুবক। ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাগ কেটেছে অনেকের মনে। ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের সামনে থেকে তোলা ঐ ছবিতে চাদরে মোড়ানো যে শিশুটির নিথর দেহ দেখা গেছে, তার নাম মো. সাদমান। তিন বছর বয়সি শিশুটি হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে মারা গেছে। ৮ মাস ১৮ দিনের শিশু তাজিমের মৃত্যু হয়েছে গত ২২ এপ্রিল। ফারজানা ইসলাম-হেলাল ভূঁইয়া দম্পতির বিয়ের ১১ বছর পর জন্ম হয় তাজিমের। তাজিমের চিকিত্সাধীন ছবি কাঁদিয়েছে দেশবাসীকে। গত মার্চ মাস থেকে তাজিমকে নিয়ে লড়াই শুরু করেছিলেন ফারজানা ইসলাম। প্রথমে নিউমোনিয়া, পাতলা পায়খানা শুরু হয়, তারপর হাম। চাঁদপুর থেকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে ছেলেকে ভর্তি করে চিকিৎসা করিয়েছিলেন এই দম্পতি। হাসপাতালে চিকিত্সাধীন মিঠামইনের ১২ বছরের কিশোরী আঁখির যন্ত্রণাকাতর ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওয়ালে।

রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের আশপাশে সবাই এখন মৃত্যু-আতঙ্কে। কখন হাম আক্রান্ত সন্তানটিকে শেষ নিঃশ্বাস নিতে হয় এমন আতঙ্কে রয়েছেন অভিভাবকেরা। এই হাসপাতালে এখন হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছে আরও অনেক শিশু। কেবল এই হাসপাতালেই ৪০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়াচ্ছে :জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি ভাইরাসজনিত অতি সংক্রামক রোগ। কেবলমাত্র টিকাদানের মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধ করা যায়। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন যাবৎ শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি চমত্কারভাবে চলছিল। হামে আক্রান্তের কথা তেমন শোনা যায়নি। কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় টিকাদান কর্মসূচি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনকালে প্রায় ৪৫-৫০ লাখ শিশু টিকাদানের বাইরে ছিটকে পড়ে। এই শিশুরা প্রথমে আক্রান্ত হয়। অতি সংক্রামক হওয়ায় ধীরে ধীরে তা একজন থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে। পরিণতিতে নেমে আসে ভয়াবহ গণ-সংক্রমণ। যেসব পরিবারে ছোট শিশু আছে, তারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। হাম শিশু থেকে বৃদ্ধ সবারই হতে পারে। তবে বড়দের ক্ষেত্রে হাম শিশুদের মতো মারাত্মক হয় না।

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শামীমা ইয়াসমীন বলেন, ‘হাম বাতাসের মাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়ায়। যেসব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারাই বেশি ঝুঁকিতে থাকে।’ আরেকজন শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘হামের প্রধান কাজ হচ্ছে মানুষের শরীরের সুরক্ষাশক্তি বা ইমিউনিটি ব্যবস্থাকে তছনছ করে দেওয়া। ফলে হাম থেকে ভালো হওয়ার পর শিশুর শরীরে বিভিন্ন ধরনের রোগ হয়ে থাকে। হামে আক্রান্ত শিশুর অনেক জটিলতা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ, চোখের প্রদাহজনিত অন্ধত্ব ইত্যাদি।’ তিনি বলেন, টিকাদানের পাশাপাশি শিশুর পুষ্টিমান নিশ্চিত করাও দরকার।

ডাক্তার-নার্সদের ঈদের ছুটি বাতিল :এদিকে, হামের রোগীদের চিকিত্সাসেবায় দায়িত্বরত ডাক্তার, নার্স ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। যেসব হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুরা ভর্তি আছে, সে হাসপাতালগুলোতে ঈদের ছুটির মধ্যে চিকিৎসকরা থাকবেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাম রোগীদের চিকিত্সাসেবায় দায়িত্বরত কোনো ডাক্তার ও নার্সের ঈদের ছুটি হবে না। তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকতে হবে। ইতিমধ্যে সার্কুলার দেওয়া হয়েছে।

লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত টিকা :সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত ৪ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। শনিবার সচিবালয়ের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) পক্ষ থেকে দেওয়া জরুরি স্বাস্থ্যসামগ্রী আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ শেষে তিনি কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে টিকার আওতায় আনা। এরই মধ্যে ২০ মে পর্যন্ত আমরা ১ কোটি ৮৪ লাখ ৩১ হাজার ১৪৯ শিশুকে টিকা দিয়েছি। এটি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ শতাংশ বেশি। বিশেষ ক্যাম্পেইনের মেয়াদ ২০ মে শেষ হলেও টিকাদান কার্যক্রম কোনোভাবেই বন্ধ হবে না বলে স্পষ্ট ঘোষণা দেন মন্ত্রী। ২১ মে থেকে নতুন পর্যায়ের টিকা দান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যতদিন সবার টিকাদান শেষ না হবে, ততদিন খুঁজে খুঁজে টিকাদান এবং মাইকিং কার্যক্রম চলমান থাকবে।

২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৯৬৭ শিশুর হামের উপসর্গ: এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৯৬৭ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১৩ জনের মধ্যে এক শিশু হাম শনাক্ত হয়ে বরিশালে মারা গেছে। আর হামের উপসর্গে ঢাকায় চার, চট্টগ্রামে দুই, সিলেটে চার, বরিশালে এক ও ময়মনসিংহে এক শিশু মারা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৪২৬ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৮৬ শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৬২ হাজার ৫০৭ শিশুর। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৮৯ শিশু। তবে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে ৪৫ হাজার ১১ জন।

চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/ ২৪ মে ২০২৬