Home / আরো / তথ্য প্রযুক্তি / ‘স্বপ্ন’ খুঁজে দেবে ‘টু আওয়ার জবস’!
Job

‘স্বপ্ন’ খুঁজে দেবে ‘টু আওয়ার জবস’!

দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও চাকরির বাজারে ‘অচ্ছুত’ থেকে যান আমাদের শিক্ষার্থীরা। পড়ালেখার পাট চুকানোর আগেই তাদের কাছ থেকে চাওয়া হয় অভিজ্ঞতা। সপ্তাহে এক ঘণ্টাও কাজের সুযোগ পান না এমন বেকারের সংখ্যা দেশে এখন ২৬ লাখ ৭৭ হাজারের বেশি। অথচ দেশে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের নির্দিষ্ট একটি কাজের জন্য একজন ব্যক্তিকে প্রতিদিন ঘণ্টা দু’য়েকের জন্য প্রয়োজন হয়। কিন্তু ওই কাজের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে পুরো মাসের বেতন দিয়ে একজন কর্মচারীকে নিয়োগ দিতে হচ্ছে।

বিপুল সংখ্যক এই শিক্ষিত বেকারদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পার্টটাইম বা ফুলটাইম কাজের সুযোগ করে দিতে এবং হাতের কাছেই থাকা সবচেয়ে ভালো কাজের মানুষটির সঙ্গে আপনার পরিচয় করিয়ে দিতে একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপ তৈরি করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মামুন খাঁন। তার আশা, এ অ্যাপ ব্যবহার করে তরুণ-তরুণীরা তাদের ‘স্বপ্ন’ খুঁজে নেবে।

‘টু আওয়ার জবস’ (www.2hourjobs.com) নামের অ্যাপটি ব্যবহার করে একজন শিক্ষার্থী বা চাকরিপ্রার্থী যেমন তার ‘স্বপ্নের’ কাজটি খুঁজে পেতে পারেন তেমনি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে কাছের লোকেশন থেকেই সবচেয়ে উপযুক্ত মানুষটিকে তার কাজে লাগাতে পারবেন সাশ্রয়ী খরচে। অ্যাপটি পাওয়া যাবে গুগল প্লে স্টোরে। মোবাইল অ্যাপ’র পাশাপাশি ওয়েবসাইট ব্যবহার করেও এ সুবিধা নেয়া যাবে।

বেকার শিক্ষার্থী বা চাকরিপ্রার্থীদের চিন্তা মাথায় রেখে ‘টু আওয়ার জবস’ এর ওয়েব সাইট ও মোবাইল অ্যাপটি তৈরি করা হলেও এটি ব্যবহার করে সুবিধা নিতে পারবেন মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ এবং প্রতিষ্ঠান।

ধরুন, চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও আবাসিকে বসবাস করেন এমন একজন, তার কলেজপড়ুয়া ছেলের জন্য বিজ্ঞানের শিক্ষক প্রয়োজন। স্বাভাবিক নিয়মে এ জন্য তিনি হয়তো তার পরিচিতদের বলবেন বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়াতে পারবে এমন একজন শিক্ষক জোগাড় করে দিতে। অথবা তিনি টিউশন মিডিয়ার সহায়তা নেবেন। এ ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তিকে অপরের সহায়তা ও পছন্দের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। এরপরও যখন কোনো শিক্ষকের ব্যবস্থা হয়, দেখা যায় তিনি থাকেন চকবাজারে। এত দূর থেকে বাসায় এসে পড়ানোর জন্য ওই শিক্ষককে দিতে হবে বাড়তি টাকা।
অথচ হয়তো চান্দগাঁও আবাসিকের কোনো একটি বাসায়, হতে পারে তার নিজের ভবনের ওপরের ফ্লাটেই ভালো বিজ্ঞান পড়াতে পারেন এমন একজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী রয়েছেন। সেও অনেকদিন ধরে হয়তো একটি টিউশনির খোঁজ করছে, কিন্তু পাচ্ছেন না।

ঠিক এ অবস্থায় ওই অভিভাবক যদি টিউশনির খোঁজে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ওই শিক্ষার্থীর কথা জানতেন তাহলে তাকে বেশি টাকা দিয়ে দূরের শিক্ষককে ছেলের জন্য রাখতে হতো না। আবার একটি টিউশনি হলেই খুব ভালোভাবে চলতে পারতেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এই ধরনের চাহিদাসম্পন্ন দুই গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরির কাজটি করবে ‘টু আওয়ার জবস’।

এ বিষয়ে ‘টু আওয়ার জবস’র উদ্ভাবক মামুন খাঁন বলেন, ‘শুরুটা শিক্ষার্থীদের সমস্যা সামনে রাখা হলেও সমাধানটা এখন সবার জন্য। আমাদের অ্যাপ ব্যবহার করে শুধুমাত্র ইন্টারনেট ব্যবহার করতে জানে এমন প্রায় নয় কোটি মানুষ এ সুবিধা নিতে পারবেন। সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২৭ লাখ মানুষ আছেন যারা সপ্তাহে একদিনও কাজ পান না। ‘টু আওয়ার জবস’ হতে পরে সেসব বেকারদের আশার আলো। পার্মানেন্ট নয়, প্রতিদিন মাত্র দু’ঘন্টা কাজের সুযোগ পেলেও এই বিশাল শ্রমশক্তি তাদের বেঁচে থাকার নতুন পথ খুঁজে পাবেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানও খুঁজে পাবেন তার সবচেয়ে বেস্ট চয়েসটি।’

‘এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা বেশি সুবিধাপ্রাপ্তি হবেন। লেখাপড়া শেষে তাদের আর অভিজ্ঞতা সংকটে ভুগতে হবে না। আর্থিকভাবেও হতে পারবেন সচ্ছল।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ অ্যাপের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো লোকেশন সিস্টেম। বর্তমানে আমাদের চাকরিপ্রার্থীরা বিভিন্ন সাইটের মাধ্যমে আবেদন করলেও নিকটতম লোকেশনে চাকরিপ্রাপ্তিতে সংকটে থাকেন। এ অসুবিধা চাকরিদাতাদেরও। কিন্তু ‘টু আওয়ার জবস’ সবচেয়ে বেশি প্রাইরোটি দিচ্ছে লোকেশনের ওপর। একই লোকেশনে বা কাছাকাছি থাকা কাজদাতা ও গ্রহীতাদের মধ্যেও পরিচয় ঘটানো আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য। এমনকী এ সুবিধা ব্যবহার করে আমাদের প্রবাসীরাও বিদেশে তাদের প্রয়োজনীয় কাজ পেতে পারেন।’

প্রবাসীরা কীভাবে কাজ পেতে পারেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে মামুন খাঁন বলেন, ‘ধরুন আরব আমিরাতের আলাইনে (একটি জায়গার নাম) একজন বাংলাদেশির একটি ওয়েলিং কারখানা আছে। ওই প্রতিষ্ঠানে তার একজন লোক প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ থেকে নতুন করে লোক নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। অথচ হতে পারে পাসের মদিনা শহরেই এমন একজন বাংলাদেশি আছেন, যিনি ওই কাজ পারেন অথচ এখন যেখানে আছেন সেখানে তিনি ভালো বেতন পাচ্ছেন না। ওই দুই ব্যক্তি যদি তাদের নিজ নিজ রিকয়ারমেন্ট জানিয়ে ‘টু আওয়ার জবস’ এ পোস্ট করেন তাহলে আমাদের অ্যাপ সংক্রিয়ভাবে তাদের দুজনের পোস্টগুলো তাদের নিজ নিজ ওয়ালে প্রদর্শন করবে। এতে তারা দু’জন দু’জনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে কাজ আদান-প্রদানের সুযোগ পাবেন।’

‘শুধু ছাত্র কিংবা প্রবাসী নন। দেশের যেকোনো প্রান্তে থাকা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি কিংবা ইলেকট্রিশিয়ান, যেকোনো বিষয়ে পারদর্শী ব্যক্তি ‘টু আওয়ার জবস’ ব্যবহার করে তার কাজ পেতে পারেন। এক্ষেত্রে ‘টু আওয়ার জবস’-এ তার শুধু একটি অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। কাজ দিতে চান এমন প্রতিষ্ঠান তার প্রয়োজনীয় কাজের মানুষের চাহিদা ও লোকেশন জানিয়ে পোস্ট করলেই লোকেশন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রোফাইল তাদের ওয়ালে প্রদর্শন করবে। একই সঙ্গে কাজে আগ্রহী ব্যক্তির ওয়ালে প্রদর্শিত হবে ওইসব প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞপ্তি। এক্ষেত্রে তারা নিজেরাই বিজ্ঞপ্তি কিংবা প্রোফাইলে দেয়া যোগাযোগ নম্বর বা ঠিকানা ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যকার প্রয়োজনীয় কথা সেরে কাজ শুরু করতে পারবেন’- বলেন মামুন খাঁন।

‘টু আওয়ার জবস’-এর কারিগরি দিকগুলো নিয়ে সঙ্গে কথা বলেন এর ওয়েব ডেভলপিংয়ের সহায়তাকারী সাখাওয়াত হোসেন। ‘টু আওয়ার জবস’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি এমন একটি অনলাইন প্লাটফর্ম যেখানে একজন চাকরিপ্রার্থী বা কাজপ্রার্থী তার নিজের প্রোফাইলে শিক্ষাগত বা দক্ষতার বিবরণ তুলে ধরবেন। সঙ্গে জানাবেন তার নিজের লোকেশন ও কাজের ধরন।’

“একইভাবে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি তার নিজের একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করে প্রয়োজনীয় কাজের জন্য লোকেশন উল্লেখ করে দক্ষ জনশক্তি পাওয়ার জন্য পোস্ট করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ‘টু আওয়ার জবস’ কাজের ক্যাটাগরি অনুযায়ী সবচেয়ে কাছের লোকেশনে অবস্থান করা আগ্রহী ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করবে। পরস্পরের পোস্ট ও প্রোফাইল দুজনের ওয়ালে প্রদর্শন করবে। পরবর্তীতে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে কাজ ঠিক করে নেবেন।’

কীভাবে এর সুবিধা নেয়া যাবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটির ব্যবহার খুবই সহজ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের আদলে গড়ে তোলা এই ডিভাইসে আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রথমে একটি অ্যাকাউন্ট করতে হবে। এক্ষেত্রে চাকরিপ্রার্থী বা কাজপ্রার্থী ব্যক্তিকে তার প্রোফাইলে ছবি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কাজের যোগ্যতা (যদি থাকে), বয়স, লোকেশন, মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর উল্লেখ করবেন। অপরদিকে চাকরি বা কাজ দিতে ইচ্ছুক ব্যক্তি তার কাজের ধরন, বিবরণ, সময়, লোকেশন, মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর উল্লেখ করবেন। এক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও প্রতারণা রোধে শুধুমাত্র একটি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা যাবে (যা ভেরিফাইড হবে) এবং বিশেষ অবস্থা ছাড়া ওই নম্বর আর কখনোই পরিবর্তন করা যাবে না।’

জাতীয় পরিচয়পত্র ও বয়স উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা প্রসঙ্গে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘কোনো কাজ নিয়ে যাতে কেউ ঠকতে না পারে বা কর্মক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে না পারে সে জন্য চাকরিদাতা ও প্রার্থী উভয়কে নিজ নিজ প্রোফাইলে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর উল্লেখ করতে হবে। যখন দুজনের মধ্যে কাজ করার চুক্তি হবে সে সময় উভয়ে উভয়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর দেখতে পারবেন। পরে কোনো সমস্যা হলে তারা উভয়েই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিতে পারেন।’

‘এছাড়া শিশুশ্রম ঠেকাতে প্রোফাইলে বয়স উল্লেখ বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। ১৬ বছরের নিচের কেউ কাজ নিতে পারবেন না।’

‘টু আওয়ার জবস’ অ্যাপটি নির্মাণে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংকের এভিপি খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, ‘ধরুন একজন ইলেকট্রিশিয়ান থাকেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। অথচ তাকে প্রতিদিন কাজ করতে যেতে হয় মিরপুরে। যদিও মোহাম্মদপুরেই তিনি কাজ পেতে পারতেন। কিন্তু কাজ করাবেন এমন মানুষ তাকে চেনেন না বলে তাকে প্রতিদিন জ্যাম ঠেলে গাড়িতে করে মিরপুর গিয়ে কাজ করতে হয়। অথচ আমাদের অ্যাপের মাধ্যমে যদি ওই ইলেকট্রিশিয়ান ভাইটির কথা মোহাম্মদপুরের মানুষরা জেনে যান তাহলে তিনি মোহাম্মদপুরেই তার নিজের কাজ পেতে পারেন। যিনি কাজ করাবেন তিনিও কম টাকায় কাজটি করাতে পারবেন। পাশাপাশি নগরের পরিবহন খাতেও অনেকটাই চাপ কমবে। এখানে লোকেশন সিস্টেমটি ডেভেলপ করতে আমরা গুগল ম্যাপের সহায়তা নিয়েছি।’

‘টু আওয়ার জবস’-অ্যাপটি তৈরির পেছনের গল্প ও বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে উদ্ভাবক মামুন খাঁন জাগো নিউজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় দেখছি শিক্ষার্থীরা একটি টিউশনির জন্য অনেক কষ্ট করে শহরে যাওয়া-আসা করতেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের গ্রামগুলোতেও ভালো টিউশনি পাওয়ার সুযোগ ছিল। এ সমস্যা থেকে ২০১৩ সালের দিকে এমন একটি অ্যাপ তৈরির পরিকল্পনা মাথায় আসে। এর মধ্যে ২০১৪ সালে আইডিবি থেকে আমার পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়। পরে ২০১৬ সালে এ প্রকল্পের কাজ শুরু করি। সবকিছু গুছিয়ে ২০১৭ সালে আমাদের ‘টু আওয়ার জবস’ ওয়েব সাইটের যাত্রা শুরু হয়।’

“তবে বিষয়টি মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার অংশ হিসেবে গত ১৩ নভেম্বর গুগল প্লে স্টোরে ‘টু আওয়ার জবস’-এর মোবাইল অ্যাপ যাত্রা শুরু করে। অল্প সময়ে সাড়াও পেয়েছি ব্যাপক। এখন পর্যন্ত সারাদেশে আমাদের প্রায় পাঁচ হাজার ইউজার সৃষ্টি হয়েছে। গত দু’মাসে শুধুমাত্র অ্যাপ ব্যবহার করে সুবিধাভোগীর সংখ্যাও হাজারের কোটা পেরিয়ে গেছে”- বলেন তিনি।(জাগো নিউজ)

বার্তা কক্ষ
১৪ জানুয়ারি,২০১৯

Leave a Reply