ফিচার

যখন ধানের আগুন প্রাণে লাগে : আবদুল হাই

আগুনের নাম শুনলে অনেকেই লাফাতে পারেন কিংবা ভয় পেতে পারেন । কখনো কখনো মনে সামান্য কষ্টও পেতে পারেন । কারণ বিষয়টি নির্ভর করছে আগুন কোথায়, কখন, কিভাবে লাগছে তার উপর । ধরুন, কাঁচা বাজারে আগুন লাগছে ! পত্রিকার এ শিরোনাম পড়ে আপনি হালকা মনোকষ্ট পাবেন ।

কারণ আপনি বুঝলেন যে, এ আগুন মানে সব্জির দাম বৃদ্ধি । আবার যদি কারো মনে আগুন লাগে তাহলে অবিবাহিত হলে চ্যাকা খাওয়া, রাগ করা আর বিবাহিত হলে সংসারের অশান্তি কারণ বুঝাবে । কারো ঘরে আগুন লাগা মানে পারিবারিক অশান্তি, পরোকিয়া বা একজনের বউ আরেকজন কর্তৃক বাগিয়ে নিয়ে যাওয়া হতে পারে । এ ধরণের ঘরে আগুন লাগিয়ে বউ বাগিয়ে নেয়া বা বেগে যাওয়ার জন্য অনেক স্থান বিখ্যাত । অমুকের বউ তমুকের সাথে বেগে গেছে- এ খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই পাবেন ।

থানায় এ ধরণের আগুন নিভাতে অনেক শালিস হয়। সবাইকে বুঝাতে পুলিশ বাহিনী হিমশিম খায় । তবুও এ আগুন নিভেনা । ফলে আগুন নিভাতে পক্ষগণ মাঝেমধ্যে কোর্ট কাছারিও করে । তথায় অনেক মজার মজার কাহিনীও ঘটে । ফেনীর বা নোয়াখালীর স্মার্ট ছেলেদের ব্যাপারে মেয়ের বাবারা সতর্ক থাকবেন । এরা কুয়েতের আমিরের মেয়ে, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের মেয়ে কিংবা নাসির গ্রুপের পরিচালকের মেয়ে বাগিয়ে নিয়েছিলো । মেয়ের বাবারা কোর্ট করেও মেয়ে ফেরত পায়নি ।

কারণ ফেনী সোনাগাজীর চরের অশিক্ষিত মহিষের রাখাল যখন হাজী সাহেবের মেয়েকে বাঁশির সুরে মাতাল করে বাগিয়ে নিয়ে গেলে, তখন ধরে এনে জজ সাবের সামনে আনলে জজ সাব কুশ্রী কালো ছেলে দেখে কি কারণে এমন ছেলের সাথে কোটিপতির সুন্দরী শিক্ষিত তনয়া বেগে গেল তার কারণ জানতে চাইলে ললনা বললো জজের চোখে যাকে বিশ্রী বা কুশ্রী দেখায় তাকে আমার ছোখে নায়ক রাজ্জাকের মতো লাগে(ঐ সময় রাজ্জাক সাবানা চরম জুটি ছিলো সিনেমায়) ।

জজ সাব আর কিছু না বলে আদেশ দিলেন, “”মিয়া বিবি রাজি- ওদের সাদি আজই ! ” এ ঘটনার পর আমিও বাঁশি কিনেছিলাম । কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিলোনা বলে সুর তুলতে পারিনি!

যাক এখন এ ঘর যদি বসত ঘর বা ভিটেবাড়ি হয় এবং তাতে আগুন লাগলে তাহলে কাল বিলম্ব না করে আমরা ৯৯৯ ফোন দিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে ডাক দিবো কিংবা বালতি নিয়ে আগুন নিভাতে দৌড় দিবো তা নিশ্চিত । কিন্তু এ আগুন যখন কৃষকের ধান ক্ষেতে লাগে তখন তা পানিতে নিভে না, ফায়ার সার্ভিসও যায় না কিংবা এর জন্য শালিস বা কোর্ট কাছারিও হয় না । তবে এক কৃষকের মনোকষ্ট তথা ক্ষেতে আগুন সারা বাংলার সবার মনে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে । সবাই সমবেদনা জ্ঞাপন করেন আর সরকারকে দোষারোপ করেন । কিন্তু আমি তা করি না ।

কারণ –? আমি এক সময় প্রকৃত কৃষক ছিলাম, একেবারেই খাঁটি এবং নির্ভেজাল কৃষক । আমি কখনো ভাবিনি এতো উচ্চ শিক্ষা পাবো, এতো বড় চাকরি পাবো, এতো সুন্দরী ডাক্তার বউ পাবো কিংবা এতো স্মার্ট ছেলের বাবা হবো (বলে রাখলাম , আমার ছেলে কিন্তু স্মার্ট এবং বাড়ি ফেণী!)। আমি জমি চাষ করতাম, কাঁধে লাঙ্গল নিয়ে(গরুর কাঁধের মতন দাগ পড়েছিল আমার কাঁধেও) গরু বুলাতে বুলাতে জমিতে যেতাম, হাল চাষ করতাম, ধানের চারার ক্ষেত করতাম, ধান রোপন করতাম, ক্ষের (আগাচা) বাচতাম, সার দিতাম, ধান কাটতাম, চরে রাতে ধান পাহারা দিতাম, অমাবশ্যা পূর্ণিমায় চরে থাকতাম, ধান কাটতাম, ধান মাথায় করে তিন মাইল দুরের চর হতে বাড়ি আনতাম, ধান মাড়াতাম (কখনো গরু দিয়ে বা কখনো পিটিয়ে), ধান সিদ্ধ করতাম, ধান পুকুরের ভিজাতাম, আবার সিদ্ধ করতাম , রোদে শুকাতাম, বাজারের মেশিনে ভাঙ্গাতাম এবং মাথায় করে নতুন চাল বাজারে নিয়ে ছয় টাকা সের (তখন খুচি বলতো) দরে বিক্রি করতাম । তখনও কৃষক ধানের প্রকৃত দাম পায়নি- এখনো পায়না ।

কারণ কী ? কারণ আছে । কারণ ভুল সিস্টেম, কারণ মধ্যস্বত্বভোগী, কারণ দালাল, কারণ কৃষি বিভাগ, কারণ ধান সংগ্রহকারী খাদ্য বিভাগ, কারণ ধান সংগ্রহে দুর্বল নীতিমালা, কারণ ধান চাতালের বা সরবরাহকারীর মাধ্যমে কিনতে খাদ্য কর্মকর্তার চিরন্তন খায়েশ, কারণ পিঠ বাঁচিয়ে যথাসময়ে লক্ষ্যমাত্রার খাদ্য সংগ্রহের নিরাপদ আশ্বাস এবং কারণ এ সময় কৃষক ধান বিক্রি করতে বাধ্য ।

তাহলে উপায় কী ? ছোটকালে পড়া না পারলে শিক্ষক ক্লাসে জিজ্ঞেস করতেন, উপায় কী ? উত্তর ছিলো, উপায় নাই গোলাম হোসেন!! এ গোলাম হোসেন কে তা আমি জানি না । ধরে নেন, এ হলো কৃষক গোলাম হোসেন যে ধান চাষ করে মাইনকা চিপাই আটকে গেছে ! কারণ , ধান চাষে যা খরচ হয় তা ধান বিক্রি করে তার এক পঞ্চমাংশও উঠে না। ফলে কৃষক রাগে ক্ষোভে ঘৃণায় ও দু:খে ধান ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে । সবাই এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলে ঘূর্ণিঝড় বা ফণি ঝড় নিয়ে আসছে । কিন্তু কৃষকের লাভ হচ্ছে না । লাভ হচ্ছে জুকার বাগের আর মোবাইল অপারেটরদের । তারা ইন্টারনেট বিক্রি করছে । আর আমরা তা কিনে ধানে আগুন লাগার ছবি পোস্ট করে লাইক কমেন্টস বাগিয়ে নিচ্ছি ( তবে কারো বউ না !)।

এখন একজন আদি কৃষক হিসেবে আমি এর কারণ বলছি যা নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত মতামত এবং কারো কাছে যৌক্তিক নাও হতে পারে । কারণটা হলো , বাংলাদেশের জমিগুলি অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র – ছোট ছোট । কৃষকের জমির পরিমাণ কম । ছোট ছোট জমিতে কৃষক তার মন মতো বিভিন্ন ধান চাষ করে । প্রাপ্ত ধানের পরিমান তেমন বেশি না । সে সামান্য ধান বিক্রি করতে চায়। এ ধরেন, এক মন, দুই মন বা বড় জোর দশ বিশ মন । আবার এক এক কৃষকের ধান একেক রকম । কৃষক যে সময় ধান বিক্রি করতে যায় তখন বাজারে কেবল ধান বিক্রেতা বেশি। কিন্তু প্রত্যেকের কাছে ধানের পরিমান কম ।

তখন ধান কিনে কেবল সরকারি দপ্তর (আদতে তারা ঐ সময় কৃষক হতে সরাসরি ধান কিনেনা, চোখ বুঁঝে কয়েকদিনের জন্য হাইবারনেশনে চলে যায়), ফড়িয়া, আড়তদার, দালাল, চাতাল ইত্যাদি । যারা ধান কিনে তাদেরও অনেক কিছু ভাবতে হয় । ধানের প্রাপ্যতা, ধানের ধরণ, ধানের রং, ধানের আদ্রর্তা, ধানের মান, ধানের গুন, ধানের প্রকারভেদ ও ভবিষ্যতে ক্রয়কৃত ধান হতে প্রাপ্ত চালের চাহিদা, মোটা ধান, চিকন ধান, হাজারো বাহারি ধান থাকায় সরকার বা ক্রেতা এক কৃষক হতে পর্যাপ্ত ধান পায় না । খুচরা খুচরা ধান কিনে একত্র করলে নানা সমস্যা দেখা এবং প্রকৃত নামে চাল পাওয়া যায় না ।

ফলে বিভিন্ন ধান (মোটা, চিকন, ২৮, ২৯, রাজার শাইল, ,আগন শাইল সহ হাজারো ধরণ) কিনে মেশিনে কেটে মিনিকেট নামে বিক্রি হয়। ফলে রুটি ভাগের মতো লাভের ভাগ বানরে খায় আর কী ! সরকারি দফতরগুলি ইচ্ছা থাকা সত্বেও কিছু করতে পারে না কেবল হামকি ধামকি দেয়া ছাড়া যা চাতাল মালিক বা ফড়িয়ারা বুঝে ফেলে সহজে । চাঁদপুরে কর্মকালীন সময়ে আজান দিয়ে হামকি ধামকি দেয়া সত্বেও কৃষকের নিকট হতে এক মাসে চাহিদার এক দশমাংশ ধানও সংগ্রহ করা যায় নি। সময় শেষ হবার এক সপ্তাহের মধ্যেই খাদ্য বিভাগ এক সপ্তাহে লক্ষ্যমাত্রার এক তৃতীয়াংশ বেশি ধান চাতাল মালিক বা ফড়িয়া হতে সংগ্রহ করে খুশিতে গদগদ করে প্রতিবেদন দাখিল করে । কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ায় সবাই খুশিতে গদগদ এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত ঐ দিনের মিটিং এ আপ্যায়নও ভালো হয়েছিল। সবাই খুশি কেবল ঐ হতভাগা কৃষক ছাড়া!

এখন এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী ?
সহজ উপায় হলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিতে বিভিন্ন ধান চাষ না করা । কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকদের বুঝিয়ে দাউদকান্দি মডেলে মাছ চাষের মতো অনেক জমি একত্র করে সমবায় পদ্ধতিতে কয়েকশ একর জমিতে একই ধরণের উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান চাষ করতে হবে । কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সমবায় পদ্ধতিতে ধান চাষের প্রকৃত খরচ জানিয়ে দিলে সরকার একটা লাভ ধরে ধান ক্রয় ঘোষণা করতে পারবে ।

এর ফলে কৃষক ধানের ন্যায্য মূল্য পাবে । তাছাড়া ধানের যেমন বাম্পার ফলন হবে, তেমনি খাদ্য অধিদপ্তর সরাসরি ধানের গুণ, আদ্রতা ও মান ঠিক রেখে কৃষককে ন্যায্য মূল্য দিয়ে সরকারি খাদ্য সংগ্রহ অভিযান সফল করতে পারবে। কৃষক জমির অনুপাতে ধানের দাম সমিতি হতে গ্রহণ করতে পারবেন । ফলে কৃষককে আর ধান ক্ষেতে আগুন দিতে হবে না। উত্তরবঙ্গের আম বাগানের মতো ঢাকার অনেক কোম্পানি ব্যবসায়ী তখন ধান বাগান অগ্রিম কিনে নিবে।

এমনকি বিদেশেও ধান চাল রপ্তানির সুযোগ বাড়বে। কৃষক বাঁচলে আমরা বাঁচবো, আমরা বাঁচলে দেশ বাঁচবে। আসুন সবাই মিলে কৃষক বাঁচাই-দেশ বাঁচাই । আর কৃষি বান্ধব বর্তমান সরকারকে সহযোগিতা করি। (দ্রষ্টব্য : লেখকের নিজস্ব ভাষায় রচিত রচনা, তাই লেখাটির কৃতিত্ব এবং দায় সম্পূর্ণ লেখকের)

লেখক- মোহাম্মদ আবদুল হাই, প্রাক্তন এডিসি ও ডিডিএলজি, চাঁদপুর।
বর্তমানে ডেপুটি প্রজেক্ট ডাইরেক্টর(স্মার্ট কার্ড),
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, ঢাকা

Share