বাসায় ফেরার জন্য কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন। ভাড়া ৫০০ টাকা চাইলেও শেষ পর্যন্ত ৩০০ টাকায় যাওয়ার কথা হয়। রাত তখন সাড়ে ১২টা। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার বদলে শর্টকাটে দ্রুত বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে তাজমিনকে নির্জন পথে নিয়ে যান চালক সুমন মিয়া।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টায় জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চাঁদপুর সড়কের বিজরা বাজার পেরিয়ে নির্জন এলাকায় গিয়ে অটোরিকশার ইঞ্জিন বন্ধ করে দেন সুমন। অপরিচিত জায়গায় পৌঁছে বিপদের আশঙ্কা বুঝতে পেরে অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করে তাজমিন। চিৎকার শুরু করলে গামছা দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরেন চালক। একপর্যায়ে তাজমিন দুর্বল হয়ে পড়লে তাকে ধর্ষণ করেন তিনি। পরে ধানক্ষেতে নিয়ে মাথায় পা দিয়ে চেপে ধরে তাকে হত্যা করেন বলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন সুমন।
কুমিল্লার স্কুলশিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এমন নৃশংস বিবরণ উঠে এসেছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কুমিল্লা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া।
পুলিশ জানায়, গত ৮ অক্টোবর কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর চরপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেতের পাশ থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় হত্যা মামলা হওয়ার পর থানা-পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে চট্টগ্রাম থেকে অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে পুলিশ জানায়, ঘটনার রাতে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফেরার জন্য অটোরিকশাটি ভাড়া করেছিল তাজমিন। যাত্রাপথে একটি দোকান থেকে ১০০ টাকা দিয়ে চালকের জন্য রুটি ও কলা কিনে আনে সে। এরপর আবার যাত্রা শুরু হয়। কিছুদূর যাওয়ার পর শর্টকাটে দ্রুত বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে সুমন অটোরিকশাটি ঘুরিয়ে নূরজাহান হোটেলের সামনে দিয়ে চাঁদপুর সড়কের দিকে নিয়ে যান। পরে বিজরা বাজার পেরিয়ে নির্জন এলাকায় গিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দেন।
পুলিশের দাবি, তাজমিনকে হত্যার পর তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি আইফোন নিয়ে যান সুমন। ব্যাগটি ফেলে রেখে ঘটনাস্থলে অটোরিকশাটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রেখে পালিয়ে যান তিনি। পরে কাঁচিকাটা মসজিদের সামনের একটি পুকুরে গোসল করে অন্য একটি ভাড়ার অটোরিকশায় বাকরাবাদ এলাকায় যান। সেখানে একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গলে আইফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে পালিয়ে যান।
সুমনকে গ্রেফতারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাকরাবাদ এলাকার জঙ্গল থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন এবং ধানক্ষেত থেকে তার ভ্যানিটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিহত তাজমিনের গ্রামের বাড়ি যশোরে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করত সে।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন এবং নিজের দোষ স্বীকার করেছেন। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
এর আগে গত ৪ অক্টোবর শহরের এক বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লার রেসকোর্স ধানমণ্ডি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হয় তাজমিন। পরে বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায় সে। বুধবার রাত ২টার দিকে কক্সবাজার থেকে ফিরে কুমিল্লা বিশ্বরোড এলাকার নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে এবং সেখান থেকে লাইভ লোকেশন পাঠায়। পরে বৃহস্পতিবার লালমাই উপজেলার জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন ফসলি জমি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
কুমিল্লা প্রতিনিধি/
১০ অক্টোবর ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur