জাতিসংঘে ভাষণ দিতে গিয়েও বিশ্ববাসীর সামনে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ভিশন তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ভোর ৪ টার দিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেন তিনি।
সেখানে দেশ পরিচালনায় নিজের এবং সরকারের ভিশন তুলে ধরতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়া গুম-খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট আর টাকা পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ আবারও গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করছে।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য সরকার রিকভারি, রস্টোরেশন, রিকনস্ট্রাকশন; অর্থাৎ ‘থ্রি আর’ কৌশল অনুসরণ করছে।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগে বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানব সম্পদে রূপান্তর করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এই কর্মযজ্ঞে নিজের উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে পেতে চায় বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক এবং উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্ট আপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে দিতে চলতি অর্থবছরে ৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। ফলে দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীরা সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন। নারী শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
তিনি বলেন, নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের জন্য নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে সরকার। স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের বিনা-বেতনে শিক্ষার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে।
সরকারপ্রধান বলেন, শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়; সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে। সেই লক্ষ্য পূরণে ইতোমধ্যেই, ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ড এর মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে, সরকার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে।
তারেক রহমান বলেন, প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’-কে সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করে। প্রতিটি সেক্টরে সহায়তার জন্য প্রবর্তন করা কার্ডগুলোকে সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করাও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেয়া ৩১ দফা কর্মসূচি সরকার বাস্তবায়ন করে চলেছে। জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজির ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’— এই প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির কমপক্ষে ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ কার্যক্রমের পরোক্ষভাবে মিল রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার আশা করে, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শহর এবং গ্রামের মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য দূর হবে। একইসঙ্গে ২০৩০ এজেন্ডার সব ক্ষেত্রে, জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্পোর্টসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। নৈতিক মানসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে, কারিগরি এবং ব্যবহারিক শিক্ষার উপর জোর দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই গড়বে আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ। আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বায়ো-টেকনোলোজি এবং বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি। প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এর সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক। বাংলাদেশ উদ্ভাবন ও মেধাস্বত্বকে সম্মান করে। একইসঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারপ্রধান বলেন, বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রায় কোনো দেশ যেন পিছিয়ে না থাকে। সবার জন্য ন্যায্য ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশ এবং দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল যাতে দেশে দেশে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়, সেজন্য জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত দেশ’-এর তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য সকল দেশের ক্ষেত্রে এই উত্তরণ প্রক্রিয়াটিকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোতে ধারাবাহিক সহায়তা অপরিহার্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিটি দেশ একে অপরের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ মনে করে, বিশেষ করে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাণিজ্য সহায়তা ও সম্প্রসারণ, কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থবহ সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা একে অপরের সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করতে পারি।
তিনি বলেন, কোভিড মহামারি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। তবে, কোভিড বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে, বিশ্ব সমাজকে টিকে থাকতে হলে অবশ্যই একের প্রতি অন্যের সহায়তা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা অপরিহার্য। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকা, চিকিৎসা-সামগ্রী ও রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জামের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে এগুলো সবার জন্য সহজলভ্য হয়।
তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্রের নাগরিকদেরকে ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। জনগণের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা এমন একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমূলক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যে রাষ্ট্রে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে সমান অধিকার, সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে সক্ষম হবে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ— সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য একটি পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ এবং স্থিতিশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কাজ করে চলছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে আমরা অংশীদারিত্ব উদ্ভাবন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই।
তারেক রহমান বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে, প্রতিটি শিশু তাদের সকল সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে— সর্বোপরি জনগণ পাবে নিরাপদ এবং শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা। এজন্যই আমরা বলি, ‘সবার আগে বাংলাদেশ……সবার জন্য বাংলাদেশ’।
এরপর বিশ্ব মানবতার প্রতি পুনরায় বাংলাদেশের অকুন্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur