দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এবং পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে আবারও একটি বড় ধরনের পরিবর্তন ও পরিমার্জন আসছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসে শুরু হতে যাওয়া নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইগুলোতে বেশ কিছু নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায় যুক্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো— নব্বইয়ের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনকথা, পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি বিশেষ নিবন্ধ।
ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের পাশাপাশি বাংলা এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ের বিষয়বস্তুতেও আনা হচ্ছে ব্যাপক বৈচিত্র্য। সবচেয়ে বড় সংযোজন হিসেবে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন চারটি বাধ্যতামূলক বই। মূলত শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মেধা মনন বিকাশ, কারিগরি দক্ষতা এবং শারীরিক উৎকর্ষ সাধনের বিষয়টি মাথায় রেখে এই নতুন বইগুলো প্রণয়ন করা হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে,আগামী শিক্ষাবর্ষের বইগুলোতে দীর্ঘদিনের অনেক অনুচ্চারিত ইতিহাস ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঘটনা নতুনভাবে স্থান পাচ্ছে। শ্রেণিভেদে এই বিষয়বস্তুর বিস্তৃতি নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ে তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এবং নবম শ্রেণির বইয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকে।
ইতিহাস ও বাংলা বইয়ে প্রধান সংযোজনগুলো হলো— বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা
অষ্টম ও নবম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব ও অবদানের সুনির্দিষ্ট বিবরণ যুক্ত করা হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বীরদের গাঁথা
ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বীরশ্রেষ্ঠদের বীরত্বগাথা ও জীবনী অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ‘ব্রিজেড ফোর্স’ সংক্রান্ত বিশেষ লেখা যুক্ত করা হচ্ছে। জিয়াউর রহমানের নিবন্ধ ও ৭ নভেম্বর: নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ শীর্ষক শিক্ষণীয় নিবন্ধটি স্থান পাচ্ছে। পাশাপাশি, ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
ভাষা ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন
ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘তৃতীয় ভাষা’ শিরোনামে একটি নতুন প্রবন্ধ যুক্ত করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বহুভাষিক দক্ষতা ও এর প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে পরিচয় করানো হবে। এছাড়া মাধ্যমিক স্তরের আইসিটি বা তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)’-এর ওপর বিস্তারিত অধ্যায় যোগ করা হচ্ছে, যা আজকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে শিক্ষার্থীদের সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
২০২৭ সালের শিক্ষাবর্ষে প্রচলিত বিষয়ের বাইরে প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের আনন্দদায়ক ও কর্মমুখী শিক্ষা দিতে নতুন চারটি বই যুক্ত করা হচ্ছে। চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এসব নতুন বিষয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের কোনো অতিরিক্ত চাপ নিয়ে বার্ষিক পরীক্ষা দিতে হবে না; বরং ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের মূল্যায়ন করা হবে।
নতুন বইগুলোর রূপরেখা ও বিষয়বস্তু
১. আমার কারিগরি শিক্ষা (ষষ্ঠ শ্রেণি): শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও বুনিয়াদ গড়ে তুলতে এই বইটি আনা হচ্ছে। বইটিতে বেশ কয়েকটি চমৎকার অধ্যায় রয়েছে। যেমন- কারিগরি শিক্ষা পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি ও নতুন বিশ্ব, যারা বানায় তারাই পৃথিবী বদলায়, সমস্যা ও সমাধান করি, ছোট উদ্যোগ বড় সম্ভাবনা, ভবিষ্যৎ পেশা ও দক্ষতা, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপন এবং শেষাংশে প্রয়োজনীয় শব্দকোষ।
২. আনন্দময় শিক্ষা (ষষ্ঠ শ্রেণি): নৈতিক মূল্যবোধ, সুস্বাস্থ্য ও মানসিক আনন্দের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে এই বইটি। এর অধ্যায়গুলো সাজানো হয়েছে- আমি ও আমরা, আমার পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জীবনযাপন, প্রযুক্তির সঙ্গে খেলি, নতুন কিছু করি, পরিষ্কার থাকি পরিচ্ছন্ন রাখি, উদযাপনের দিনগুলো এবং আনন্দে থাকি, আনন্দে রাখি— এ থিমগুলোর ওপর ভিত্তি করে।
৩. বাংলাদেশের সংস্কৃতি (চতুর্থ শ্রেণি): দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে শিশুদের নিবিড় পরিচয় ঘটাতে এই বইটির অবতারণা। এতে সংস্কৃতির মৌলিক ধারণা,ব্যক্তিজীবনে সংস্কৃতির গভীর প্রভাব, জাতীয়, ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবসমূহের গুরুত্ব,ঐতিহাসিক বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি এবং সামগ্রিক সাংস্কৃতিক চর্চার প্রয়োজনীয়তা চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
৪. খেলাধুলা (চতুর্থ শ্রেণি): শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার বিকল্প নেই। চতুর্থ শ্রেণির এ নতুন বইটিতে আটটি জনপ্রিয় খেলাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। খেলাগুলো হলো— ফুটবল,ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি, দাবা, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার এবং মার্শাল আর্ট।
বিশেষজ্ঞ শিক্ষকরা জানিয়েছেন, এ নতুন চারটি বইকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও বোধগম্য করে তুলতে‘ইলাস্ট্রেশন’বা চিত্র-অলংকরণের ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। চারুকলা ও বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে প্রস্তুতকৃত এ বইগুলোতে ৭১০টি আকর্ষণীয় ছবি বা ইলাস্ট্রেশন থাকছে। এর মধ্যে কেবল‘খেলাধুলা’ বইটিতেই তিন শতাধিক ছবি রাখা হয়েছে,যাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ছবি দেখে খুব সহজেই নিয়মকানুন ও কৌশল আয়ত্ত করতে পারে।
আগামি শিক্ষাবর্ষে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর জন্য ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ চলছে। এর মধ্যে শুধু মাধ্যমিক স্তরেই ২২ কোটির বেশি এবং প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ বই মুদ্রণ করা হচ্ছে। প্রাক্-প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও বিশেষ ব্রেইল ও মাতৃভাষার বই ছাপানো হচ্ছে। এবারের পুরো পাঠ্যবই মুদ্রণের সম্ভাব্য বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা।
এনসিটিবির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন,মাঠপর্যায়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই পৌঁছে দিতে মুদ্রণ কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাথমিকের ২১% ছাপানো বইয়ের প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে এবং এর মধ্যে ১৮% র বেশি বই ইতিমধ্যেই মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। আগামি ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মূল ছাপার কাজ শতভাগ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নতুন সংযুক্ত হওয়া চারটি বইয়ের ক্ষেত্রে ছাপার কাজ শেষ করতে সামান্য বেশি সময় লাগতে পারে বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এ জি
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur