আশিক বিন রহিম…….
সেদিন ফেসবুকে স্ক্রল করতে গিয়ে দুষ্প্রাপ্য একটি ছবি সামনে এলো। ছবিতেই শিরোনামল লেখা ছিল ‘এক ফ্রেমে বাংলাদেশের তিন রাষ্ট্র নায়ক’। তারা হলেন, বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর সহধর্মিণী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তাদের পুত্র বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান। তাদের একজন মহান মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সেনানায়ক ও রাষ্ট্রপতি, একজন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, আরেকজন দীর্ঘ রাজপথের সংগ্রাম অতিক্রম করে দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু পরিবার নেতৃত্বের উত্থান-পতনের হয়েছে। কিন্তু এমন পরিবার খুব কমই আছে, যাদের সুদীর্ঘ রাজনীতিক জীবনাখ্যানে একইসঙ্গে জড়িয়ে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র পুনর্গঠন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন, দীর্ঘ কারাবরণ, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং প্রজন্মান্তরে রাষ্ট্রনেতৃত্বের ধারাবাহিকতা। যেন রবীন্দ্রনাথের সেই অমর উচ্চারণ—’বিপদে আমি না যেন করি ভয়।”
বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত একমাত্র জিয়া পরিবারের তিনজন সদস্যই রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। এই পরিবারের প্রথম অধ্যায়ের নাম জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে তিনি ছিলেন একজন সাহসী সেনা কর্মকর্তা। ছিলেন সেক্টর কমান্ডার। ১৯৭১ সালের সেই ভয়াল সময়ে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধকে নতুন এক গতি দেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তার পরিচয় ছিল দৃঢ়চেতা কমান্ডার হিসেবে, আর স্বাধীনতার অনেক পর তিনি হয়ে ওঠেন রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলায় বিপর্যস্ত, তখন জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে নতুন এক রাজনৈতিক দর্শনের সূচনা করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, গ্রামমুখী উন্নয়ন, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশের স্বপ্নকে তিনি নতুনভাবে সামনে আনেন। তার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”। দেশের স্বাধীন ভূখণ্ড, সংস্কৃতি ও জনগণের স্বাতন্ত্র্যকে তিনি রাজনৈতিকভাবে নতুন ভাষা দিয়েছিলেন। মাঠপর্যায়ে প্রশাসনকে সক্রিয় করা, কৃষক ও সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়া এবং কর্মমুখী রাষ্ট্র পরিচালনার কারণে তিনি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
কিন্তু তার পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, সামরিক অস্থিরতা এবং ক্ষমতার সংঘাতের মধ্য দিয়েই তাকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। অবশেষে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি শহীদ হন। তার মৃত্যু শুধু একজন রাষ্ট্রপতির মৃত্যু ছিল না, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গভীর ও নাটকীয় মোড় ছিলো। আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল লিখেছিলেন– ‘বল বীর চির উন্নত মম শির” জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবন ছিল যেন সেই অমর উচ্চারণেরই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
এরপর শুরু হয় জিয়া পরিবারের দ্বিতীয় অধ্যায়। যে নারী একসময় ছিলেন নিভৃতচারী গৃহিণী, তিনিই পরে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেত্রীদের একজন হয়ে ওঠেন। তিনি মরহুম বেগম খালেদা জিয়া।স্বামীর মৃত্যুর পর এক অনিশ্চিত সময়ে রাজনীতিতে এসে তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে কঠিন বাস্তবতা। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, রাজপথের সংগ্রাম, কারাবরণ, গৃহবন্দিত্ব এবং অবিরাম রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি হয়ে ওঠেন বিরোধী রাজনীতির প্রধান মুখ। তার নেতৃত্বে গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। পরবর্তীতে তিনি তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল দৃঢ়তা। দীর্ঘ আন্দোলন, রাজনৈতিক সংকট এবং দমন-পীড়নের মধ্যেও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং নেতাকর্মীদের অনুপ্রাণিত করার বিরল সক্ষমতা তাকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যায়। সমর্থকদের কাছে তিনি পরিচিত হন “আপসহীন নেত্রী” হিসেবে। বিশ্ববিখ্যাত নেতা উইনস্টন চার্চিল একবার বলেছিলেন– “Success is not final, failure is not fatal: it is the courage to continue that counts.”। বার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় “সাফল্যই শেষ নয়, ব্যর্থতা মানেই মৃত্যু নয়; আসল হলো এগিয়ে যাওয়ার সাহস ধরে রাখা।”
বাংলাদেশের নারী নেতৃত্বের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থান অত্যন্ত উজ্জল এবং গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় একজন নারী হিসেবে দীর্ঘদিন ক্ষমতা ও বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা অতটা সহজ ছিল না। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া সেই কঠিন বাস্তবতাকে অতিক্রম করেই নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করেন।
এই পরিবারের তৃতীয় অধ্যায়ের নাম তারেক রহমান।
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও তার রাজনৈতিক পথ কখনোই সহজ ছিল না। তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে মামলা, কারাবরণ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন এবং অব্যাহত সংকট।২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করেও তিনি দলীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। সংগঠন পুনর্গঠন, নতুন প্রজন্মকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করা এবং ডিজিটাল রাজনৈতিক যোগাযোগকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জনাব তারেক রহমান বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে রাজপথের আন্দোলন থেকে জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে তিনি পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ যেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিরল ইতিহাস।
এ প্রসঙ্গে নেলসন ম্যান্ডেলা-এর একটি বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে “It always seems impossible until it’s done.”। যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ”কাজটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা সবসময় অসম্ভবই মনে হয়।”।
একটি পরিবার, যেখানে একজন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন,একজন স্বামীর মৃত্যুর পর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, আরেকজন দীর্ঘ দমন-পীড়ন, নির্বাসন ও রাজপথের সংগ্রাম পেরিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মতভেদ আছে, বিতর্ক আছে, তীব্র বিরোধিতা আছে। কিন্তু ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠে এটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এই পরিবারটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ও স্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে।তাদের জীবনের পথ কখনো মসৃণ ছিল না। ছিল রক্ত, অশ্রু, ষড়যন্ত্র, কারাবরণ এবং সীমাহীন প্রতিকূলতা। তবু সেই কঠিন পথেই তারা নির্মাণ করেছেন এক শক্তিশালী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। সময় বদলায়, ক্ষমতা বদলায়, প্রজন্ম বদলায়। কিন্তু কিছু পরিবার ইতিহাসের ভেতর নিজেদের স্থায়ী আসন তৈরি করে নেয় সংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়া পরিবার তেমনই এক অনিবার্য অধ্যায়।
- লেখক : সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী, পরিচালক : চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমি।
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur