দেশে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত রপ্তানিযোগ্য আমে কোনো ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না। ফলে বিদেশে পাঠানো আমের কোনো চালান ফেরত আসেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি আমের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। চলতি মৌসুমে উৎপাদন ও রপ্তানি—দুই ক্ষেত্রেই নতুন রেকর্ডের আশা করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ৩৮টি দেশে বাংলাদেশের আম রপ্তানি হচ্ছে। গত মৌসুমে নতুন দেশ হিসেবে যুক্ত হয় চীন। এবার দক্ষিণ এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়াও বাংলাদেশ থেকে আম আমদানির আগ্রহ দেখিয়েছে। দেশটির প্রতিনিধিরা শিগ্গির বাংলাদেশে এসে আমবাগান ও সংগ্রহ প্রক্রিয়া পরিদর্শন করবেন।
রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের সহকারী পরিচালক মাজহারুল হোসাইন আমার দেশকে বলেন, এবার আমের উৎপাদন ভালো। গত বছরের তুলনায় উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করছি। ঝড়ে কিছু ক্ষতি হলেও তা বাণিজ্যিক আম চাষে প্রভাব ফেলেনি। মূলত গৃহস্থালি পর্যায়ের গাছে ক্ষতি হয়েছে।
তিনি বলেন, বাণিজ্যিকভাবে আম চাষে সফলতা বাড়ায় নতুন নতুন রপ্তানি বাজার খোঁজার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইংয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (ফল ও ফুল) ড. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ আমার দেশকে জানান, গত অর্থবছরে পাকা আম কেজিপ্রতি ৫০ টাকা এবং কাঁচা আম ২৫ টাকায় বিক্রি হয়। আগামী অর্থবছরেও একই মূল্য নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই লাখ পাঁচ হাজার ২০৫ হেক্টর জমিতে ২৬ লাখ ৬২ হাজার ৫৮৩ টন আম উৎপাদন হয়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই লাখ সাত হাজার ২৪৭ হেক্টর জমি থেকে ২৭ লাখ ৯৫ হাজার ৭১৩ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মৌসুমে দুই লাখ সাত হাজার ২৪৭ টন আম রপ্তানি করা হয়। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৮৬ দশমিক ২৭৩ টন আম গেছে। এছাড়া সৌদি আরব, ইতালি, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জার্মানি, কানাডা এবং সিঙ্গাপুরেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আম রপ্তানি করা হয়। এবার আম রপ্তানির টার্গেট রয়েছে দুই লাখ ৭৯ হাজার টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যানতত্ত্ববিদ ময়নুল হক আমার দেশকে বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাত লাখ ৭৯ হাজার ৩৭০ হেক্টর জমি থেকে এক কোটি ৫১ লাখ ৫২ হাজার ২৪২ টন ফল উৎপাদন হয়েছিল। এর মধ্যে দুই লাখ পাঁচ হাজার ২০৫ হেক্টর জমিতে আম উৎপাদন হয় ২৬ লাখ ৬২ হাজার ৫৮৩ টন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাত লাখ ৮৭ হাজার ১৬২ হেক্টর জমি থেকে এক কোটি ৫৯ লাখ ৯ হাজার ৮৮৩ টন ফল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই লাখ সাত হাজার ২৪৭ হাজার হেক্টর জমিতে ২৭ লাখ ৯৫ হাজার ৭১৩ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বাণিজ্যিক আম চাষে লোকসানের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ কম হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে থাকে। এছাড়া পরিবহন সংকট না থাকায় বাজারজাতেও বড় সমস্যা হয় না। বর্তমানে দেশে ১৪টি জেলায় বাণিজ্যিকভাবে আমের ব্যাপক চাষ হচ্ছে। গোপালভোগ, হিমসাগর-খিরসাপাত, ল্যাংড়া, আম্রপালি, ফজলি, হাঁড়িভাঙ্গা, গৌড়মতিসহ বিভিন্ন জাতের আম ১৫ জুন থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ধাপে ধাপে বাজারে আসে। কিন্তু এবার আবহাওয়ার কারণে আগামী ১২ মে থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন জাতের আম রপ্তানি হবে। স্থানীয়ভাবে সবার আগে সাতক্ষীরার আম বাজারে এসেছে। গত মঙ্গলবার থেকে গোপালভোগ আম বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, বাণিজ্যিকভাবে দেশের বিস্তৃত এলাকায় আম চাষ হচ্ছে। কিন্তু চাষিদের নগদ কোনো সহায়তা দেওয়া হয় না। তবে প্রদর্শনীর মাধ্যমে আমচাষিদের কীটনাশক, সার এবং উন্নতজাতের চারা বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া কৃষিজ উপকরণের মধ্যে উত্তম কৃষিচর্চা, ফুড ব্যাগিং এবং রিজুবেশন আমবাগান সৃজনে সহায়তা করে থাকে কৃষি বিভাগ।
নওগাঁর আমচাষি ও অ্যাগ্রো পার্কের মালিক সোহেল রানা আমার দেশকে বলেন, এ বছর আমার বাগানের ফলন গত বছরের চেয়ে ভালো। কিন্তু গৌড়মতি জাতের আম ব্যাগিং ছাড়া করা যায় না। ব্যাকটেরিয়াল ব্ল্যাক স্পট নামে একটি রোগ আছে। এখন ব্যাগের সংকট চলছে। অনেক কোম্পানি ব্যাগ আমদানি কম করেছে, আবার কেউ কেউ আনেইনি। ফলে বাজারে ব্যাগ পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি জানান, আমে ব্যাগিং না করলে ফলের গুণগতমান নষ্ট হয় এবং রপ্তানিযোগ্য মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যাগিং না করলে আমের কোয়ালিটি খারাপ হয়। বিশেষ করে রপ্তানির ক্ষেত্রে এটি বড় সমস্যা বলে জানান তিনি।
রপ্তানিকারকদের মতে, আন্তর্জাতিক রুটে বিমান ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় আম বিদেশে পাঠানোর খরচ অনেক বৃদ্ধি পাবে। এতে ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকরা ঝুঁকিতে পড়বেন। রপ্তানি কমে গেলে স্থানীয় বাজারে আমের সরবরাহ বেড়ে যেতে পারে, যা দামেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে স্থানীয় বাজার স্বাভাবিক থাকলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখছেন না চাষিরা। তারা বলেন, রপ্তানি না হলেও যদি লোকাল মার্কেট মোটামুটি ভালো থাকে, তাহলে হয়তো ক্ষতি কিছুটা সামাল দেওয়া যাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা জানান, জেলা ও জাতভিত্তিক রপ্তানিযোগ্য আম সংগ্রহের ক্যালেন্ডার সংশোধন, পরিমার্জন ও হালনাগাদ করতে ৩ মে খামারবাড়িতে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে সভা হয়।
সভায় চলতি অর্থবছরের আম বাজারজাতকরণের সময়সূচি চূড়ান্ত করে আম ক্যালেন্ডার চূড়ান্ত করা হয়।
৭ মে ২ ০ ২ ৬
এ জি
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur